“মানুষ কী কোনোভাবে তার ফুসফুস ব্যবহার না করে নিশ্বাস নিতে পারে?”
“না। পারে না।”
“শরীরের চামড়া দিয়ে?” ও
“মানুষের চামড়া হচ্ছে, তার শরীরের সবচেয়ে বড় অর্গান। প্রায় তিন কেজি ওজন। প্রায় দুই মিলিওন লোমকুপ। এক বর্গ ইঞ্চিতে চার মিটার রক্তনালী। চামড়ার মৃত কোষ প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে, নূতন কোষের জন্ম নিচ্ছে। এক জীবনে এক মানুষ প্রায় হাজার বার নূতন চামড়ার জন্ম দেয় কিন্তু যত কিছুই করুক এই চামড়া দিয়ে নিশ্বাস নেয়া যায় না। সরি শামীম।”
“কিন্তু কোনো কোনো প্রাণী তো নিতে পারে।”
“হ্যাঁ। পারে। উভচরেরা পারে। কোনো কোনো ব্যাঙ পারে। সালমান্ডার পারে। কোনো কোনো সালমান্ডার আছে যাদের ফুসফুস নেই। তারা তাদের চামড়া দিয়ে নিশ্বাস নেয়। কিন্তু মানুষ তো সালমান্ডার না।”
“কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী পারে না?”
আলেক্স কয়েক সেকেন্ড চিন্তা করে বলল, “অস্ট্রেলিয়াতে ইঁদুরের মতো এক ধরনের মার্সুপিয়াল আছে তার নামটা খুবই ফ্যান্সী, জুলিয়া ক্রিক ডুনার্ট! এই ইঁদুরগুলো চামড়ার ভিতর দিয়ে নিশ্বাস নিতে পারে। আমার জানামতে আর কোনো স্তন্যপায়ী প্রাণী পারে না।” আলেক্স এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে বলল, “তুমি কেন আমাকে এটা জিজ্ঞেস করছ? তুমি কী কাউকে পেয়েছ যে ফুসফুস ব্যবহার না করে চামড়া দিয়ে নিশ্বাস নিতে পারে?”
শামীম হাসার চেষ্টা করে বলল, “না সেভাবে পাই নি, কিন্তু এটা ছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা পাচ্ছি না।”
আলেক্স হঠাৎ করে গম্ভীর গলায় বলল, “দেখ শামীম। মানুষের প্রতি মুহূর্তে বিবর্তন হচ্ছে, মিউটেশান হচ্ছে। তাই ঘটনাক্রমে খুব বিচিত্র কিছু হওয়া অসম্ভব কিছু না। এই মিউটেশানগুলো টিকে থাকে না বলে আমরা এই বিচিত্র উদাহরণগুলো দেখি না। মানুষের চামড়ার প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে চার মিটার রক্তনালী, সেগুলো যদি কোনোভাবে চামড়ার কোষের ভেতর দিয়ে অক্সিজেন এক্সচেঞ্জ করতে পারে সে হয়তো চামড়া দিয়ে নিশ্বাস নিতেও পারে। মাছ তার ফুলকা দিয়ে জানি থেকে অক্সিজেন নেয়—“
শামীম কিছু বলল না। আলেক্স বলল, “চামড়া দিয়ে নিশ্বাস নেবার জন্যে সালমান্ডারের চামড়া ভিজা থাকতে হয়। তুমি তোমার কেসে চামড়া ভিজিয়ে দেখ। দরকার হলে পানিতে ডুবিয়ে দেখ। তুমি বিজ্ঞানী মানুষ তোমার কারো কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই। তুমি এক্সপেরিমেন্ট করো, করে দেখো কী হয়।”
শামীম বলল, “দেখব।”
.
কিছুক্ষণের মাঝেই শামীম তার এক্সপেরিমেন্ট শুরু করল।
শামীম টেবিলে একটা গামলায় পানি রেখে সেখানে খানিকটা গরম পানি ঢেলে কুসুম কুসুম তাপমাত্রায় নিয়ে এল। হাত দিয়ে যখন মনে হল তাপমাত্রাটা আরামদায়ক একটা উষ্ণতায় পৌঁছেছে তখন সে শিশুটিকে কম্বলের ভেতর থেকে বের করে খুব সাবধানে গামলার পানিতে নামাল, শিশুটির মাথার পিছনে সাবধানে ধরে রাখল হঠাৎ যেন গড়িয়ে পানিতে পড়ে না যায়। পানিতে নামানো পর শিশুটির শরীর এক দুইবার ঝাঁকুনী দেয়, তারপর শান্ত হয়ে যায়।
শামীম তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, শিশুটি খুব ধীরে ধীরে তার হাত পা নাড়ছে। মনে হয় পানির ভেতরে এই শিশুটি একটু বেশী স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করে। শিশুটির বুক খুব দ্রুত ওঠানামা করছিল, নিমোনিয়া হলে বাচ্চাদের যা হয়, শামীম অবাক হয়ে দেখল তার বুকের ওঠা নামা কমে আসছে। শুধু তাই না, তার সারা শরীরে ছোট ছোট বাতাসের বুদবুদ জমা হচ্ছে। চামড়া দিয়ে শরীরে অক্সিজেন নিয়ে আবার চামড়া দিয়েই কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দিচ্ছে। কার্বন ডাই অক্সাইড বুদবুদগুলো বড় হওয়ার আগে শরীরে লেগে থাকছে। শামীম হতবাক হয়ে শিশুটির দিকে তাকিয়ে থাকে। স্টেথিস্কোপ দিয়ে তার হৃদস্পন্দন মেপে দেখে, ছোট শিশুর একটা শক্তিশালী হার্ট ধুকপুক ধুকপুক করে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন করছে।
শামীম চাপা গলায় বলল, “রিতু! তুই দেখছিস কী হচ্ছে? দেখছিস তুই?” দেয়ালে রিতুর ছবি কোনো উত্তর দিল না কিন্তু তাতে শামীমের কোনো সমস্যা হলো না, সে ফিসফিস করে বলল, “বুঝলি রিতু আমি এখন কী করব? আমি এখন খুব সাবধানে এই বাচ্চাটির মাথাটা ছেড়ে দেব যেন তার মাথাটাও পানির ভেতর ঢুকে যায়। তার পুরো শরীর যেন পানির ভেতর থাকে। আমার কী মনে হয় জানিস?” শামীম রিতুকে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার একটু সময় দিল, তারপর বলল, “আমার মনে হয় এই ছোট শিশুটা তখন আরো ভালো করে নিশ্বাস নিতে পারবে।”
শামীম তখন সাবধানে বাচ্চাটার মাথা ছেড়ে দিল, সাথে সাথে বাচ্চাটা পানির নিচে তলিয়ে যায়, বাচ্চাটার চোখে মুখে বিন্দুমাত্র অস্বস্তির চিহ্ন নেই বরং খুবই স্বাভাবিক ভাবে সে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। তার মুখ থেকে বড় বড় কয়েকটা বাতাসের বুদবুদ বের আসে। শামীম নিশ্বাস বন্ধ করে শিশুটির হৃৎস্পন্দন মাপে, একটা সতেজ কচি হৃৎপিণ্ড বুকের ভেতর ধ্বক ধ্বক করছে। কী বিচিত্র একটা দৃশ্য!
শামীম হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, তারপর রিতুর ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, “বুঝলি রিতু, আমার কি মনে হয় জানিস? আমার মনে হয় এইবারে আমি এই বাচ্চাকে বাঁচিয়ে তুলতে পারব। ফুসফুস দিয়ে নিশ্বাস নিতে হচ্ছে না বলে ফুসফুসটা বিশ্রাম পাচ্ছে, এখন নূতন এন্টিবায়োটিক চেষ্টা করতে পারব। তোর কি বিশ্বাস হচ্ছে রিতু? আমার একটুও বিশ্বাস হচ্ছে না।”
