সেটা অন্য ব্যাপার। এখন তার সাথে ত্রিশ পঁয়ত্রিশজন ছেলে-মেয়ে! আর যাই করুক এখন এরা অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করবে না।
নেতাগোছের মানুষটি বলল, দেরি করে লাভ নেই। রাস্তা থে পাথরগুলো সরাও। অন্যেরা কভার দাও।
হঠাৎ একজন বলল, কী ব্যাপার এখানে এত গরম কেন?
হ্যাঁ! কী ব্যাপার? মানুষগুলো অবাক হয়ে এদিক সেদিক তাকায়। উত্তাপটুকু দেখতে দেখতে সহ্যের বাইরে চলে যায় তখন তারা যন্ত্রণায় ছটফট করে এদিকে সেদিকে ছুটতে শুরু করে।
রুহান, ক্রিটিনা আর রিদি নিঃশব্দে বসে থাকে। ছেলেমেয়েগুলো একজন একজন করে করে তাদের কাচ দিয়ে সূর্যের আলোর তাপ কেন্দ্রীভুত করতে শুরু করছে আর দেখতে দেখতে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। তারা গাড়ির ইঞ্জিন থেকে কালো ধোঁয়া বের হতে দেখল এবং হঠাৎ করে একটা বিস্ফোরণ করে গাড়ির ইঞ্জিনে আগুন ধরে যায়। দাউ দাউ করে আগুন ছড়িয়ে পড়ল এবং মানুষগুলো চিৎকার করে ছুটে সরে যেতে থাকে। কীভাবে কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে কয়েকজন ইতস্তত গুলি করল কিন্তু তার কোনো প্রত্যুত্তর এলো না বলে নিজেরাই আবার অস্ত্র নামিয়ে নিল।
রুহান, ক্রিটিনা আর রিদি তাদের অস্ত্র তাক করে নিঃশপে বসে থাকে। শাইকে বলা আছে প্রথম গাড়িটা জ্বালিয়ে দিতে পারলে দ্বিতীয়টা এবং সেটা করতে পারলে তার পরেরটা জ্বালিয়ে দিতে হবে। ছেলেমেয়েগুলো সত্যি সত্যি দ্বিতীয়টাতেও আগুন ধরিয়ে দিল, তখন হঠাৎ করে পিছনের দুটো গাড়ি পিছনে সরে যেতে থাকে। অন্য মানুষগুলোকে গাড়িতে তুলে নিয়ে হঠাৎ করে গাড়িগুলো যে পথে এসেছিল সেই পথে ফিরে যেতে থাকে। পাহাড়ের আড়ালে অদৃশ্য না হয়ে যাওয়া পর্যন্ত সবাই যে যার জায়গায় লুকিয়ে রইল। গাড়িগুলোর ইঞ্জিনের শব্দ মিলিয়ে যাবার পর প্রথমে রিদি এবং তার দেখাদেখি রুহান আর ক্রিটিনা পাথরের আড়াল থেকে বের হয়ে আসে। তাদের দেখাদেখি অন্যেরাও তখন পাহাড় থেকে ছুটে নিচে নেমে আসতে থাকে। রাস্তার উপর দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা গাড়ি দুটো ঘিরে সবাই লাফালাফি করে আনন্দে চিৎকার করতে থাকে। সাধারণ একটা কাচের টুকরো দিয়ে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা এভাবে গাড়িগুলো জ্বলিয়ে সবাইকে তাড়িয়ে দিয়েছে এই বিষয়টা এখনো তারা বিশ্বাস করতে পারছে না।
ঘণ্টাদুয়েক পরে যখন আবার সবাই রওনা দিয়েছে তখন কারো ভেতরেই চাপা ভয় আর আতঙ্কটুকু নেই, নিজেদের ভেতরে তখন বিচিত্র এক ধরনের আত্মবিশ্বাস। লরির ভেতরে তারা হাততালি দিয়ে গান গাইতে থাকে। দেখতে দেখতে পাহাড়ী এলাকা পার হয়ে তারা একটা উপত্যকায় নেমে আসে, সেখান থেকে একটা নদীর তীর ধরে এগোতে থাকে। রাস্তা ভালো নয়, যেতে হচ্ছে খুব ধীরে ধীরে, যখন অন্ধকার হয়ে গেল তখন তারা রাত কাটানোর জন্যে এক জায়গায় থেমে গেল। নদীর পানিতে হাত মুখ ধুয়ে তারা কিছু শুকনো খাবার খেয়ে বিশ্রাম নেয়। এজেন্ট দ্রুচান তার লরির নিচে শুয়ে শুয়ে সেটা মেরামত করতে থাকে। রাত বিরেতে কী হয় কেউ জানে না, তাই রুহান, রিদি আর ক্রিটিনা পালা করে পাহারা দেবে বলে ঠিক করল। ভোর রাতের দিকে তার পালা শেষ করে শুতে গিয়েছে, চোখে একটু ঘুম নেমে এসেছিল হঠাৎ করে ক্রিটিনা তাকে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, রুহান!
রুহান মুহূর্তে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠে, কী হয়েছে?
একটা গাড়ি।
গাড়ি?
হ্যাঁ।
কোথায়? ক্রিটিনা অন্ধকারে হাত দিয়ে দেখায়, ঐ যে, আসছে?
রুহান আবছা অন্ধকারে গাড়িটাকে দেখতে পেল। হেড লাইট নিভিয়ে চুপি চুপি আসছে। মুহূর্তের মধ্যে ওরা প্রস্তুত হয়ে যায়। লরিটির পাশে আড়াল নিয়ে ওরা ওদের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ট্রিগারে আঙ্গুল দিয়ে বসে থাকে।
গাড়িটি রাস্তার পাশে দাঁড়া করিয়ে রাখা লরিটির কাছাকাছি এসে থেমে গেল। দরজা খুলে জনা দশেক মানুষ নেমে আসে, আবছা অন্ধকারেও দেখা যায় মানুষগুলো সশস্ত্র। কাছাকাছি আসার পর রিদি হঠাৎ উচ্চস্বরে বলল, থাম।
মানুষগুলো থেমে গেল। রুহান বলল, তোমরা আমাদের অস্ত্রের আওতার ভেতর আছ, কোনোরকম বোকামী করতে চাইলেই কিন্তু মারা পড়বে।
অন্ধকারে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর ভেতর থেকে একজন বলল, ভয় নেই। আমরা তোমাদের আক্রমণ করতে আসিনি।
তাহলে কী জন্যে এসেছ?
তোমাদের দলে যোগ দিতে এসেছি।
আমাদের দলে যোগ দিতে এসেছ?
হ্যাঁ।
রিদি আর রুহান প্রায় একই সাথে বিস্ময়ের এক ধরনের শব্দ করল। রুহান বলল, তোমরা কারা?
আমরা দক্ষিণের গ্রুজনীর দলের মানুষ।
রিদি তার হাতের আলো জ্বালায়, সেই আলোতে সামনে দাঁড়িয়ে। মানুষগুলোকে বেশ স্পষ্ট দেখা যায়। মানুষগুলোর বয়স খুব বেশি নয়, দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তি ছাড়া সেখানে চোখে পড়ার মতো কিছু নেই। কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা পাকা বাদামী চুলের একজন বলল, তোমরা দুজন নিশ্চয়ই রিদি আর রুহান?
রিদি আর রুহান মাথা নাড়ল, মানুষটি বলল, আমরা তোমাদের অনেক গল্প শুনেছি, তোমাদের দেখে খুব খুশি হলাম।
রিদি বলল, ঠিক কী গল্প শুনেছ জানি না! তবে আমরাও তোমাদের দেখে খুব খুশি হয়েছি।
রুহান বলল, এভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই। তোমরা এসে বস। হাতের অস্ত্রগুলো ঐ গাছের উপর হেলান দিয়ে রাখতে পার।
বাদামী চুলের মানুষটি অস্ত্রটা নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, পুরো এলাকায় তোমাদের কথা সবাই জানে। আমার কী মনে হয় জান? আরো অনেকেই এখন তোমাদের সাথে যোগ দিতে আসবে।।
