মেয়েটা মাথা নাড়ল, বলল, “আমিও জানি। কিন্তু আমি সে রকম এলিয়েন না। আমার ভেতর কিলবিল করা কিছু নাই। আমি ঠিক তোমার মতো।”
“তুমি কেন আমার মতন হলে সত্যিকারের কিউট একটা এলিয়েনের চেহারা নাও, তাহলে তোমাকে আমি বাসায় নিয়ে যাব, স্কুলে নিয়ে যাব। তুমি যদি চাও তাহলে তোমাকে টেলিভিশনে টক শোতে নিয়ে যাব।”
“টক শোতে?”
“হ্যাঁ। সেখানে তুমি কোথা থেকে এসেছ, কেমন করে এসেছ, সেগুলো বলতে পারবে। সবাই তোমাকে দেখার জন্যে ভিড় করে আসবে। তোমার সাথে সেলফি তুলবে।”
“সেলফি?”
“হ্যাঁ। ছোট বাচ্চারা তোমার অটোগ্রাফ নিবে।”
“অটোগ্রাফ?”
“হ্যাঁ।” তিতুনি গলায় জোর দিয়ে বলল, “তুমি এখন তোমার চেহারা পাল্টে ফেলো, কিউট একটা এলিয়েন হয়ে যাও।”
তিতুনির মতো দেখতে মেয়েটা খানিকক্ষণ চিন্তা করে বলল, “নাহ! আমি কিউট এলিয়েন হতে চাই না। আমি তিতুনিই থাকতে চাই।” তারপর কথা শেষ করে উঠে দাঁড়াল, হাত দুটো উপরে তুলে আড়মোড়া ভাঙল, ঠিক তিতুনি যে রকম করে।
তিতুনি একটু ভয়ে ভয়ে বলল, “তুমি এখন কোথায় যাবে?”
“তোমাদের পৃথিবীতে এসেছি, পৃথিবীটা একটু ঘুরে দেখি।”
“ঘুরে দেখবে? পৃথিবী?”
“হ্যাঁ।”
“তুমি বাসায় যাবে না তো?”
মেয়েটা ভুরু কুঁচকে বলল, “কী হবে বাসায় গেলে?”
তিতুনি মাথা নাড়ল, বলল, “না। খবরদার তুমি বাসায় যাবে না। তুমি বাসায় গেলে অনেক ঝামেলা হবে।”
“কী ঝামেলা?”
“যখন বুঝতে পারবে তুমি এলিয়েন তখন পুলিশ-র্যাব এসে তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে। রিমান্ডে নিবে। তারপর কেটে-কুটে দেখবে।”
সবকিছু বুঝে ফেলেছে সে রকম ভাব করে মেয়েটা মাথা নাড়ল। তিতুনি একটু সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, “তুমি যখন পৃথিবীটা দেখতে চাচ্ছ একটু দেখো। দেখা শেষ হলে চলে যেও। পৃথিবীতে থাকলেই কিন্তু ঝামেলা।”
“ঠিক আছে।” মেয়েটা এবারে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করে। তিতুনি তখন একেবারে হা হা করে উঠল, বলল “সর্বনাশ! তুমি করছ কী?”
“কী হয়েছে?”
“তুমি আমার বাসার দিকে যাচ্ছ কেন? বাসার লোকজন কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।”
“তাহলে কোন দিকে যাব?”
“এই জঙ্গলের দিকে যাও। জঙ্গল পার হলে ধান ক্ষেত। ধান ক্ষেত পার হলে নদী। নদীর তীরে হাঁটলে তোমার খুব ভালো লাগবে।”
মেয়েটা মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক আছে।” তারপর জঙ্গলের দিকে হাঁটতে লাগল। তিতুনি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখে আরো একজন তিতুনি হেঁটে হেঁটে জঙ্গলের দিকে যাচ্ছে। কে জানে তার সাথে আর দেখা হবে কি না!
০৩. বাসায় ফিরে এসে তিতুনি
বাসায় ফিরে এসে তিতুনি ছটফট করতে থাকল, ব্যাপারটা কাউকে বলা দরকার, কাকে বলবে? টোটনকে বলার প্রশ্নই আসে না, প্রথমত সে এটা বিশ্বাসই করবে না, তাকে নিয়ে টিটকারি করতে করতে বারোটা বাজিয়ে দেবে। যদি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করানো যায় তাহলে সেটা হবে আরো ভয়ংকর। তাহলে খুঁজে পেতে এলিয়েন মেয়েটাকে বের করে তাকে ধরে এনে ঘরের মাঝে বন্ধ করে দুনিয়ার যত লোক আছে তাদেরকে ডেকে আনবে মজা দেখার জন্যে। দুই টাকা করে টিকিট লাগিয়ে কিছু টাকা কামাই করে ফেলবে। তিতুনির উপরে তার যত রাগ সব ঝাড়বে এই এলিয়েন মেয়েটার উপরে।
তাহলে বাকি রইল আব্বু আর আম্মু। ঠিক তিতুনির মতো দেখতে একটা এলিয়েন মেয়ে এসেছে সেটা আম্মুকে বোঝানোই যাবে না। বাসার পিছনে জঙ্গলে নিয়ে যদি সেই গর্তটা দেখানো যায় তাহলে হয়তো বিশ্বাস করবেন এখানে কিছু একটা হয়েছে, কিন্তু এখান থেকে আরেকটা তিতুনি বের হয়ে এসেছে সেটা কিছুতেই বিশ্বাস করানো যাবে না। যদি সে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে তাহলে আম্মু হয়তো তাকে ধরে ঠাণ্ডা পানিতে গোসল করিয়ে লবণ পানি খাইয়ে বিছানায় শুইয়ে রাখবেন। শুধু তা-ই না, তার হয়তো বাসার পিছনে জঙ্গলে যাওয়াটাই বন্ধ হয়ে যাবে। আব্বকে যদি বলার চেষ্টা করে তাহলে আবু হয়তো পুরোটা শুনবেন, শুনে বলবেন, “ভেরি গুড তিতুনি। খুবই চমৎকার একটা গল্প তৈরি করেছ। এখন গল্পটা প্রথমে বাংলায় লিখে ফেলো। তারপর সেটাকে ইংরেজিতে ট্রান্সলেশন করে ফেলো।”
তাদেরকে বিশ্বাস করানোর একমাত্র উপায় হচ্ছে এলিয়েন মেয়েটাকে বাসায় নিয়ে আসা-নিজের চোখে দেখলে বিশ্বাস করবেন কিন্তু সেটা হবে খুবই ভয়ংকর। আম্মু একটা টিকটিকি দেখলেই চিৎকার করতে থাকেন, একবার বাসায় একটা ঢ়োঁড়া সাপ ঢুকে গিয়েছিল, সেটা দেখে প্রায় ফিট হয়ে গিয়েছিলেন। তিতুনির পাশে আরেকটা তিতুনি দেখলে তার কী অবস্থা হবে কে জানে। নির্ঘাত দাঁতে দাঁত লেগে ফিট হয়ে যাবেন। কে জানে হার্ট অ্যাটাকও হতে পারে। আব্বুর অবস্থা আরো খারাপ-আব্বু ভাব দেখান তার সাহস বেশি মাথা ঠাণ্ডা কিন্তু আসলে সেটা সত্যি না, আব্বু আরো বেশি ভীতু। একটা-দুইটা তেলাপোকা দেখলেই আঁৎকে ওঠেন। রাতে যদি শেয়াল ডাকে আব্বু ভয় ভয় চোখে এদিক-সেদিক তাকাতে থাকেন। তিতুনির পাশে আরেকটা তিতুনি দেখলে আব্বুর খবর হয়ে যাবে। এলিয়েন তিতুনির সাথে সাথে আসল তিতুনিকেই ছেড়ে-ছুঁড়ে চলে যাবেন। তাই কাউকেই এলিয়েন তিতুনির খবর বলা যাবে না। এলিয়েন তিতুনি তার গ্যালাক্সিতে ফিরে যাবার পরও বলা যাবে–কেউ তো বিশ্বাসই করবে না, ধরে নেবে তিতুনির মাথা খারাপ হয়ে গেছে।
