কীশা এতক্ষণ পাথরের মূর্তির মতো বসে ছিল। এবারে উঠে এসে বলল, কিন্তু আমি জানি আমি রোবট নই। আমার স্বামী ছিল, দুজন সন্তান ছিল। আমি আমার সন্তানদের পেটে ধরেছিলাম, তাদের জন্ম দিয়েছিলাম। একটা দুর্ঘটনায় তাদের সবাইকে আমি হারিয়েছিলাম– আমার নিজেরও বেঁচে থাকার কথা ছিল না। কীভাবে কীভাবে জানি বেঁচে গেছি।
ইরন শীতল চোখে কীশার দিকে তাকিয়ে রইল। কীশা এক পা এগিয়ে এসে বলল, তুমি সত্যিই দেখতে চাও আমি সত্যিই মানুষ নাকি রোবট?
ইরন কোনো কথা বলল না, হঠাৎ করে দেখল কীশার হাতে একটা ধারালো ছোরা এবং কিছু বোঝার আগেই কীশা তার হাতটা টেবিলে রেখে ধারালো ছোরাটি হাতের তালুতে বসিয়ে দেয়। সাথে সাথে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে।
শুমান্তি একটা আর্তচিৎকার করে কীশাকে ধরে ফেলল। কীশা নিচু গলায় বলল, এটা সত্যিকার রক্ত। একফোঁটা নিয়ে বায়ো মডিউলে প্রবেশ করিয়ে দেখ। আমার পুরো জিনেটিক কোডও সেখানে পেয়ে যাবে।
ত্রালুস এবং শুমান্তি কীশাকে ধরে মহাকাশযানের চিকিৎসা কেন্দ্রে নিতে থাকে। কীশা তার কেটে যাওয়া হাতটি ধরে কাতর গলায় বলল, ইরন। আমি আজ তোমার ব্যবহারে খুব দুঃখ পেলাম। খুব দুঃখ পেলাম।
ইরন তবু কোনো কথা বলল না, স্থির চোখে কীশার দিকে তাকিয়ে রইল। কীশা ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর সে টেবিলের কাছে এগিয়ে যায়। টেবিল থেকে সাবধানে একফোঁটা রক্ত তুলে নেয়। সে সত্যি সত্যি এই রক্তকে বায়ো মডিউলে প্রবেশ করিয়ে দেখবে।
বায়ো মডিউলের ভিতরে একটা চাপা গুঞ্জন শোনা গেল, প্রায় সাথে সাথেই বড় স্ক্রিনে কীশার রক্তের বিশ্লেষণ শুরু হয়ে গেল, ইরন একটা নিশ্বাস ফেলে, কীশা মিথ্যে কথা বলে নি, সত্যি সত্যি এটি মানুষের রক্ত। তার ডি, এন, এ. বিশ্লেষণ করে জৈবিক গঠনের পুরো তথ্য চলে আসতে থাকে, কীশা একজন তেজস্বী এবং সাহসী মহিলা। আবেগপ্রবণ এবং স্নেহশীল। একাধিক সন্তানের মাতা। বড় দুর্ঘটনায় দীর্ঘ সময় শয্যাশায়ী। ঠিক যেরকম কীশা দাবি করেছিল। ইরন বায়ো মডিউলটি বন্ধ করতে গিয়ে থেমে গেল, রক্তের মাঝে অত্যন্ত স্বল্প পরিমাণের গ্রুপ তিনের ধাতব পদার্থ। মানুষের শরীরে স্বাভাবিক অবস্থায় এটি থাকার কথা নয়, কীশার শরীরে কেন আছে কে জানে।
ইরন খানিকক্ষণ বায়ো মডিউলের সামনে বসে থেকে অন্যমনস্কভাবে উঠে এল। নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বড় স্ক্রিনটিতে কুৎসিত গ্রহটি আরো একটু বড় হয়েছে, যার অর্থ মহাকাশযানটি আরো কাছে এগিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের মনিটরটি থেকে একটা চাপা শব্দ আসছে, নিশ্চয়ই তরঙ্গের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। ইরন একটা নিশ্বাস ফেলল, এর আগে সে কখনো এত অসহায় অনুভব করে নি। বুদ্ধিমান প্রাণীর একটা গ্রহের দিকে তাদের মহাকাশযানটি এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাদের কিছু করার নেই। তারা কেন যাচ্ছে সেটিও তারা। জানে না। প্রাণীদের বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কেও তাঁদের কোনো ধারণা নেই। বুদ্ধিমত্তায় তারা কি সেই প্রাণীদের সমান নাকি অনেক নিচে? যদি অনেক নিচে হয়ে থাকে তা হলে কী করবে? কিছু কি করার আছে?
ইরন খানিকক্ষণ স্ক্রিনটার নিচে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেদের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। কীশা তার ঘরের মাঝামাঝি বিছানায় নিশ্চল হয়ে শুয়ে আছে, হঠাৎ দেখলে মনে হয় প্রাণহীন কিন্তু ভালো করে তাকালে দেখা যায় খুব ধীরে ধীরে তার বুক ওঠানামা করছে, কীশা প্রাণহীন নয়, গভীর ঘুমে অচেতন। কীশার মুখের দিকে তাকিয়ে ইরনের নিজের ভিতরে এক ধরনের অপরাধবোধের সৃষ্টি হল। মেয়েটি খুব দুঃখী, তাকে আবার সে নতুন করে আজ দুঃখ। দিয়েছে।
ইরন একটা নিশ্বাস ফেলে শুমান্তি আর জালুসের ঘরে উঁকি দিল, তারা তাদের ঘরে নেই। নিশ্চয়ই অবজারভেটরিতে বসে আছে। নিজের অজান্তেই ইরনের মুখে হাসি ফুটে ওঠে, এই দুজন একেবারে ছোট শিশুদের মতো। একজনের কাছে আরেকজন হচ্ছে একটা খেলনা, সেই খেলনা যতই দেখছে ততই মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছে।
ইরন নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। দরজা স্পর্শ করতেই সেটা খুলে গেল। ঘরের মাঝামাঝি তার বিছানাটি ঝুলছে। ইরন পোশাক পাল্টে বিছানার মাঝে ঢুকে গেল। ঘরের আলো কমে আসে, তাপমাত্রা নেমে যেতে থাকে, মিষ্টি একটা গন্ধ ভেসে আসে ঘরে, তার সাথে হালকা এক ধরনের সঙ্গীত। ইরন দুই হাত বুকের কাছে নিয়ে এসে একসময় গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ল।
ইরনের ঘুম ভাঙল হঠাৎ করে, কেন ভাঙল সে বুঝতে পারল না, শুধু মনে হল খুব অস্বাভাবিক কিছু একটা ঘটেছে। সে ধড়মড় করে তার বিছানায় উঠে বসে। তার ঘরে কর্কশ এক ধরনের উজ্জ্বল আলো, সেই আলোয় সে স্পষ্ট দেখতে পেল ঘরের মেঝেতে হাঁটুতে মুখ রেখে কীশা বসে আছে। কীশার পাশে একটা ভয়াবহ ধরনের অস্ত্র শক্তিশালী, লেজারচালিত, বিস্ফোরকনির্ভর এবং আধুনিক। এটি ব্যবহার করে প্রয়োজনে সম্ভবত পুরো মহাকাশযানকে ধ্বংস করে দেওয়া যাবে।
ইরন অবাক হয়ে কীশার দিকে তাকাল, বলল, কীশা, তুমি এখানে কী করছ?
কীশা খুব ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাল, ইরন দেখতে পেল তার গালে চোখের পানি চিকচিক করছে। হাতের উল্টো পৃষ্ঠা দিয়ে চোখ মুছে সে নিচু গলায় বলল, তুমি ঠিকই বলেছিলে ইরন।
আমি কী ঠিক বলেছিলাম?
