কাজেই নক্ষত্রের প্রবল মহাকর্ষের কারণে তার থেকে বের হওয়া আলোটুকুও ধীরে ধীরে ম্রিয়মান হতে শুরু করে। বাইরে থেকে কেউ যদি দেখে তাহলে দেখবে নক্ষত্রের আলো কমেছে এবং ধীরে ধীরে তার শক্তি, কমে আসছে। নক্ষত্র সংকুচিত হতে হতে যখন একটা বিশেষ আকারে সংকুচিত হয়ে যাবে তখন তার থেকে আলো বের হওয়াই বন্ধ হয়ে যাবে। জেনারেল রিলেটিভিটির সূত্র অনুযায়ী কোনো কিছুই আলোর গতিবেগ থেকে বেশি হতে পারে না, তাই নক্ষত্র থেকে যখন আর আলো বের হতে পারে না তখন তার থেকে আর কোনো কিছুই বের হতে পারে না। বাইরের জগতের সাথে তার আর কোনো যোগাযোগই থাকে না।
এ-রকম একটা অবস্থা যখন হয় সেটাকেই বলে ব্ল্যাক হোল। বিজ্ঞানের জগতে এর চাইতে চমকপ্রদ আর কিছু আছে বলে আমার জানা নেই!
.
28. বারো হাত কাকুড়ের তেরো হাত বিচি
একটা বিশাল নক্ষত্রের সকল জ্বালানী যখন শেষ হয়ে যায় তখন তার প্রবল মহাকর্ষ বলকে ঠেকিয়ে রাখার কিছু থাকে না। সেই মহাকর্ষ বল তখন পুরো নক্ষত্রটিকে একটা বিন্দুতে সংকুচিত করে আনে, আর এভাবেই ব্ল্যাক হোলের জন্ম হয়। যদিও কাগজে-কলমে পদার্থবিজ্ঞানীরা ব্ল্যাক হোলের অস্তিত্বের কথা অনেক আগেই প্রমাণ করেছেন কিন্তু মহাকাশে তাকিয়ে সত্যিকার ব্ল্যাক হোল খুঁজে পাওয়া খুব সহজ হয় নি। কারণটি সহজ–ব্ল্যাক হোল সত্যি আছে তার একেবারে একশভাগ বিশ্বাসযোগ্য সিগন্যালের খুব অভাব। অন্য অনেক মহাজাগতিক বস্তু আছে (যেমন নিউট্রন স্টার) যাদের সিগন্যালটি এত চমকপ্রদ যে সেটা অবিশ্বাস করার কোনো উপায় নেই-–ব্ল্যাক হোলের বেলায় সে-রকম কিছু নেই।
ব্ল্যাক হোল আমাদের সব রকম কল্পনাকে হার মানায় সত্যি, কিন্তু একটা ব্ল্যাক হোলকে বর্ণনা করতে মাত্র তিনটি বিষয়ের প্রয়োজন। প্রথমটি হচ্ছে তার ভর, দ্বিতীয়টি হচ্ছে তার ঘূর্ণনের পরিমাণ (বিজ্ঞানের ভাষায় কৌণিক ভরবেগ) এবং তৃতীয়টি তার বৈদ্যুতিক চার্জ। ব্ল্যাক হোলের ভর থাকতেই হবে–সত্যি কথা বলতে কি বিশাল একটা ভরের কারণেই ব্ল্যাক হোলের জন্ম হয় কিন্তু অন্য দুটো বিষয়, ঘূর্ণন বা বৈদ্যুতিক চার্জ, থাকতেই হবে তেমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই, নাও থাকতে পারে। কাজেই আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটির ভয়ংকর জটিল হিসেব করে যে ব্ল্যাক হোল পাওয়া যায় সেটাকে বর্ণনা করতে হলে শুধু তার ভরটুকু বলে দিলেই হয়। আর কিছু বলতে হয় না–এটা একটা অসাধারণ ব্যাপার।
কোথাও যদি একটা ব্ল্যাক হোল থাকে তাহলে তার আশপাশের যত গ্যাস ধূলিকণা অনু পরমাণু সবকিছু ব্ল্যাক হোলের আকর্ষণে সেদিকে ছুটে যেতে থাকবে। সেগুলো যতই ব্ল্যাক হোলের কাছে যেতে থাকবে ততই নিজেদের ভেতরে ধাক্কাধাক্কি হতে থাকবে। যার ফলে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করবে। তাপমাত্রা বাড়লে যে সেখান থেকে আলো বের হয় সেটা আমরা সবাই জানি মোমবাতির আলো থেকে লাইট বাল্বের ফিলামেন্ট সবকিছুতেই সেটা আমরা দেখেছি। কাজেই ব্ল্যাক হোলের আশপাশেও সেটা আমরা দেখব। ব্ল্যাক হোলের দিকে দ্রুত ধাবমান গ্যাস থেকে তীব্র উজ্জ্বল আলো বের হতে শুরু করছে। গ্যাস যত ব্ল্যাক হোলের কাছে যাবে সেটা তত বেশি উত্তপ্ত হবে আর সেখান থেকে তত বেশি শক্তিশালী আলো বের হবে। আলো এক ধরনের তরঙ্গ সেটা যত শক্তিশালী হয় তার তরঙ্গ-দৈর্ঘ্য তত ছোট হতে থাকে, কাজেই ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি অনু, পরমাণুর তাপমাত্রা যখন কয়েক মিলিয়ন ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়ে যাবে সেখান থেকে খুব ছোট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যের প্রচণ্ড শক্তিশালী এক ধরনের আলো বের হবে। ছোট তরল দৈর্ঘ্যে এই আলোকে আমরা খালি চোখে দেখি না। তবে এর নামটা সবাই জানি, এটাকে বলে এক্স-রে। ব্ল্যাক হোলের কাছে থেকে বের হয়ে আসা এক্স-রে দেখে বিজ্ঞানীরা মহাকাশে প্রথম একটা ব্ল্যাক হোলকে খুঁজে পেয়েছিলেন। পৃথিবী থেকে ছয় হাজার আলোকবর্ষ দূরে সেই ব্ল্যাক হোলটি সিগনাস এক্স ওয়ান (Cygnus X-1) নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীরা প্রায় শতকরা পঁচানব্বই ভাগ নিশ্চিত যে এটা সত্যিই একটা ব্ল্যাক হোল, শতকরা একশ ভাগ নিশ্চিত নন। অনেকের ধারণা ব্ল্যাক হোলের ব্যাপারে কেউই কখনো শতকরা একশ ভাগ নিশ্চিত হতে পারবে না। যে জিনিসটি শুধু যে চোখে দেখা যায় না তা নয়, তার ভেতর থেকে কোনো কিছু বের হতে পারে না। সেটার অস্তিত্ব সম্পর্কে শতকরা একশ ভাগ নিশ্চিত হওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়।
কেউ যদি কখনো কোনো একটা ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি যায় তাহলে তারা যেটা দেখবে সেটা হচ্ছে একেবারে মিশমিশে কালো রংয়ের একটা গোলক। এই কালো গোলকটিকে বলে ব্ল্যাক হোলের দিগন্ত। আমরা পৃথিবীতে যখন দাঁড়াই তখন বহুদূরে দিগন্ত রেখা দেখতে পাই। দিগন্ত রেখার অন্য পাশে কিছু আমরা দেখতে পাই না। ব্ল্যাক হোলের দিগন্তের বেলাতেও সেটা সত্যি। দিগন্তের বাইরের অংশটুকু থেকে আলো বের হতে পারে কিন্তু দিগন্তের ভেতরে মহাকর্ষ বলের আকর্ষণ এত তীব্র সেখান থেকে আলো পর্যন্ত বের হতে পারে না। ব্ল্যাক হোলের দিগন্তের ভেতরে কী আছে সেটি কেউ কখনো দেখতে পাবে না!
ব্ল্যাক হোলের দিগন্তের আকার কত হবে সেটা বের করার খুব সহজ একটা সূত্র রয়েছে। একটা ব্ল্যাক হোলের ভর সূর্য থেকে যত গুণ বেশি তার দিগন্তের পরিধিটি হবে 18.5 কিলোমিটার থেকে ততগুণ বেশি। অর্থাৎ, যদি একটি ব্ল্যাক হোলের ভর হয় সূর্যের ভরের দশ গুণ তাহলে তার দিগন্তটি দিয়ে যে মিশমিশে কালো গোলক তৈরি হবে তার পরিধি হবে মাত্র 185 কিলোমিটার, ঢাকা থেকে ময়মনসিংহের দূরত্ব থেকেও কম! যদি ব্ল্যাক হোলের পুরো ভরটুকু এই ব্ল্যাক হোলের দিগন্ত দিয়ে তৈরি করা গোলকের মাঝে থাকত তাহলে এর ঘনত্ব হতো প্রতি এক সিসিতে 200 মিলিয়ন টন! সেটা কত বড় সেটা নিয়ে আর আলোচনার দরকার নেই। তবে সবচেয়ে যে বিস্ময়ের ব্যাপার সেটা হচ্ছে ব্ল্যাক হোলের বিশাল ভরটুকু কিন্তু দিগন্তের গোলকের মাঝে ছড়িয়ে থাকে না। সেটা একেবারে আক্ষরিক অর্থেই একটা বিন্দুর মাঝে সংকুচিত হয়ে থাকে। এই বিন্দুটিকে বলে ‘সিংগুলারিটি’ (Singularity) আর এর আকার হচ্ছে 10-33 সেন্টিমিটারের কাছাকাছি। এটি কত ছোট সেটা অনুভব করাও কঠিন। তুলনা করার জন্যে বলা যায় একটা পরমাণুর আকার থেকে একশত বিলিয়ন বিলিয়ন ভাগ ছোট। (যাদের মনে নেই তাদের স্মরণ করিয়ে দেয়া যায় এক বিলিয়ন হচ্ছে একশ কোটি!) দশটি সূর্যের সমান ভর কেমন করে এত ছোট একটি বিন্দুর মাঝে সংকুচিত হয়ে থাকে সেটি সম্ভবত এই জগতের সবচেয়ে বড় বিস্ময়গুলোর একটি।
