খুব স্বাভাবিকভাবেই এর পরের প্রশ্নটি এসে যায়, সেটি হচ্ছে যখন নক্ষত্রের সব হাইড্রোজেন এবং অন্যান্য নিউক্লিয়ার জ্বালানী শেষ হয়ে যাবে তখন কী হবে? যতক্ষণ ভেতর থেকে শক্তি তৈরি হচ্ছিল ততক্ষণ মহাকর্ষের প্রবল আকর্ষণকে ঠেকিয়ে রাখা গিয়েছিল, যখন সেই শক্তি শেষ হয়ে যাবে এক অর্থে নক্ষত্রের মৃত্যু ঘটবে, তখন মহাকর্ষ বলকে ঠেকিয়ে রাখার কেউ নেই সেটা আবার সংকুচিত হতে শুরু করবে। আমাদের সূর্য এ-রকম একটা নক্ষত্র তার সব জ্বালানী শেষ হতে এখনো পাঁচ বিলিয়ন বছর বাকী, যে সব নক্ষত্র আকারে বড় হয় তাদের জ্বালানী কিন্তু শেষ হয় তাড়াতাড়ি। তার কারণ বড় নক্ষত্রের তাপমাত্রা হয় বেশি তাই জ্বালানী খরচও হয় অনেক বেশি।
একটা নক্ষত্রের মৃত্যুর পর অর্থাৎ, ভেতরের জ্বালানী শেষ হবার পর যখন ভেতর থেকে আর তাপ সৃষ্টি হয় না, তখন মহাকর্ষের প্রচণ্ড আকর্ষণে নক্ষত্রের কী অবস্থা হয় সেটা প্রথম বের করেছিলেন ভারতবর্ষের বিজ্ঞানী সুব্রামানিয়ান চন্দ্রশেখর। তিনি তখন ছাত্র, 1928 সালে জাহাজে করে যাচ্ছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্যে। জাহাজে যেতে-যেতে বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেবে বের করলেন একটা নক্ষত্র সবচেয়ে বেশি কতটুকু বড় হতে পারে যেন নিউক্লিয়ার জ্বালানী শেষ হবার পরেও সেটা সংকুচিত হতে হতে এক জায়গায় এসে থেমে যায়! নক্ষত্র সংকুচিত হতে হতে একসময় এমন একটা পরিস্থিতি হবে যখন পরমাণুগুলো একেবারে গায়ে গায়ে লেগে যাবে। তখন সেটা আর ছোট হতে পারবে না । (পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই প্রক্রিয়াটির একটা গালভরা নাম আছে সেটা হচ্ছে পলির এক্সক্লশান প্রিন্সিপাল)। একটা নক্ষত্র যখন এভাবে “মৃত্যুবরণ করে সেটাকে বলা হয় হোয়াইট ডোয়ারফ (White Dwarf) বা শ্বেত বামন। আজ থেকে পাঁচ বিলিয়ন বৎসর পরে আমাদের সূর্য হোয়াইট ডোয়ারফ হিসেবে মৃত্যুবরণ করবে। চন্দ্রশেখর হিসেব করে দেখালেন কোনো নক্ষত্র যদি সূর্য থেকে প্রায় দেড় গুণ পর্যন্ত বড় হয় সেটি শান্তিতে এবং নিরাপদ হোয়াইট ডোয়ারফের মৃত্যুবরণ করতে পারে এবং এটাকে বলা হয় চন্দ্রশেখর লিমিট বা চন্দ্রশেখর সীমা।
কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে সব নক্ষত্রই যে চন্দ্রশেখরের দেয়া সীমার ভেতরে থাকবে সেটা কে বলেছে? এটা তো বড়ও হতে পারে, যদি এটা এই বড় হয় তখন কী হবে? চন্দ্রশেখর দেখালেন তখন এই নক্ষত্রের মৃত্যু আর শান্তিময় নিরাপদ মৃত্যু নয়–এর মৃত্যু তখন ভয়ংকর একটি মৃত্যু। নক্ষত্রটি মহাকর্ষের প্রবল আকর্ষণে ছোট হতে হতে এত ছোট হতে শুরু করবে যে, কেউ তার সেই ভয়ংকর সংকোচন থামাতে পারবে না। সে রকম সংকোচনের কথা কেউ কল্পনাও করতে পারে না, শেষ পর্যন্ত কী হবে কারো কোনো ধারণা নেই। অল্প বয়েসী চন্দ্রশেখর যেদিন রয়াল এস্ট্রনমিক্যাল সোসাইটির সভায় তার এই যুগান্ত কারী আবিষ্কারের কথা ঘোষণা করেছিলেন সেদিন বিজ্ঞানের ইতিহাসের একটি অত্যন্ত নৃশংস ঘটনা ঘটেছিল। তার ঘোষণার পরপরই চন্দ্রশেখরের শিক্ষক পৃথিবীর বিখ্যাত বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন উঠে দাঁড়িয়ে নিজের ছাত্রকে সকলের সামনে তুলোধূনো করতে শুরু করলেন। এডিংটন তখন ডাকসাইটে বিজ্ঞানী, চন্দ্রশেখর অল্পবয়সী তরুণ বিজ্ঞানী, কাজেই এডিংটনের সেই ভয়ংকর বক্তৃতার ফলাফল হলো ভয়ানক। এডিংটন প্রমাণ করার চেষ্টা করলেন চন্দ্রশেখরের গবেষণার ফলাফল ভুল এবং অর্থহীন। একটা নক্ষত্র লাগামছাড়া ভাবে ছোট হতে হতে বিলীন হয়ে যাবে এটা এক ধরনের পাগলামো, বাতুলতা।
এডিংটনের সেই ভাষণের পর চন্দ্রশেখর মনের দুঃখে নক্ষত্রের মৃত্যু ‘হোয়াইট ডোয়ার্ফ’ এই ধরনের গবেষণা থেকেই সরে এলেন। শুধু তাই নয়, তিনি কেমব্রিজ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্র চলে গেলেন। মজার কথা হচ্ছে 1983 সালে তাকে যখন নোবেল পুরস্কার দেয়া হয় সেটা ছিল মূলত তার অভিমান ভরে ছেড়ে দেয়া নক্ষত্রের মৃত্যুর উপর গবেষণার জন্যে ।
চন্দ্রশেখর দেখিয়েছিলেন কোনো নক্ষত্র যদি চন্দ্রশেখর লিমিট থেকে বড় হয় সেটা অনিয়ন্ত্রিতভাবে সংকুচিত হতে শুরু করে। প্রকৃত অর্থে কী হয় সেটা নিয়ে অভিমান করে তখন তিনি আর গবেষণা করেন নি। সেটা নিয়ে গবেষণা করে আইনস্টাইনের জেনারেল রিলেটিভিটি ব্যবহার করে 1939 সালে প্রথম যিনি একটা সমাধান দিলেন তিনি হচ্ছেন তরুণ মার্কিন বিজ্ঞানী রবার্ট ওপেনহাইমার। ঠিক তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়েছে। ওপেনহাইমার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে নিউক্লিয়ার বোমা বানানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। যুদ্ধের ডামাডোলে মানুষ নক্ষত্রের সংকোচন বা এই ধরনের বিষয় প্রায় ভুলেই গেল । নিউক্লিয়ার বোমা আবিষ্কারের পর সবার কৌতূহল দানা বাঁধল পরমাণু আর নিউক্লিয়াসের গঠনের উপর। 1960 সালের দিকে পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা আবার প্রায় ভুলে যাওয়া এই বিষয়টাতে ফিরে এলেন এবং অনেকেই নূতন করে ওপেনহাইমারের সমাধানটি নূতন করে আবিষ্কার করলেন।
ওপেনহাইমারের সমাধান থেকে আমরা একটা নক্ষত্রের সংকুচিত হয়ে ব্ল্যাক হোলে পরিবর্তিত হবার বিষয়টা কল্পনা করতে পারি। ধরা যাক একটা নক্ষত্র সংকুচিত হতে শুরু করেছে। এটা যতই সংকুচিত হচ্ছে ততই আরো ছোট জায়গার ভেতরে নক্ষত্রের পুরো ভরটুকু আঁটানো হচ্ছে। কাজেই মহাকর্ষ বল ততই বেড়ে যাচ্ছে। সূর্যগ্রহণের সময় দেখা যায় দূর নক্ষত্রের আলো মহাকর্ষের কারণে বেঁকে যায় ।
