কেউ লক্ষ করেছে কি না জানি না ব্ল্যাক হোলের দিগন্ত দিয়ে তৈরি গোলকটির কথা বলার সময় তার পরিধির কথা বলা হয়েছে। তার ব্যাসার্ধের কথা বলা হয় নি। আমরা একটা গোলককে বোঝাতে সব সময়েই তার ব্যাস কিংবা ব্যাসার্ধ দিয়ে প্রকাশ করি, কখনোই তার পরিধি দিয়ে প্রকাশ করি না! কিন্তু ব্ল্যাক হোলের দিগন্তের বেলায় তার পরিধির কথা বলা হয়েছে ব্যাসার্ধের কথা বলা হয় নি –এটি কোনো ত্রুটি নয়, আসলে ইচ্ছে করে করা হয়েছে। তার কারণ ব্ল্যাক হোলের দিগন্তের গোলকটির পরিধি কত সেটা আমরা জানি কিন্তু সেই গোলকের ব্যাসার্ধ কত সেটা আমরা জানি না।
আমি নিশ্চিত অনেকেই তার ভুরু কুঞ্চিত করে ফেলেছেন। সেই স্কুলে শেখানো হয়েছে একটা গোলকের ব্যাসার্ধ যদি হয় R তাহলে পরিধি হচ্ছে 2πR। কাজেই ব্ল্যাক হোলের দিগন্তের গোলকটির পরিধিকে 2π (6.28 এর কাছাকাছি) দিয়ে ভাগ করলেই পেয়ে যাব। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে এটি সত্যি নয়। যে গোলকটির পরিধি মাত্র 185 কিলোমিটার তার কেন্দ্রটি কিন্তু গোলকের পৃষ্ঠে থেকে লক্ষ কোটি মাইল দূরে হতে পারে। ব্ল্যাক হোলের বিশাল ভরের কারণে তার চারপাশের এলাকাটুকুও (Space) ভয়াবহভাবে সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। কাজেই দূরত্ব বলতে আমাদের যে পরিচিত ধারণা আছে তার কোনোটিই এখানে খাটবে না।
বিষয়টা কীভাবে ঘটে সেটা একটা অন্য উদাহরণ দিয়ে বোঝানো সম্ভব। মনে করা যাক, একটা বৃত্তাকার রবারের পাতলা পর্দাকে টানটান করে রাখা হয়েছে। তার ঠিক কেন্দ্রে আমরা একটা বিন্দু একেছি। এই বিন্দু থেকে বৃত্তের পরিসীমা পর্যন্ত দূরত্ব হচ্ছে R1 এবং বৃত্তের পরিসীমা হচ্ছে 2πR1 আমরা সেই স্কুলে এটা শিখেছি।
এবারে ছোট একটা পাথর এনে আমরা রবারের তৈরি বৃত্তের কেন্দ্রে রাখতে পারি । পাথরের ভরের কারণে রবারের এই পৃষ্ঠটির কেন্দ্রটি খানিকটা ঝুলে যাবে। এবারে কেন্দ্র থেকে বৃত্তের পরিসীমা পর্যন্ত দূরত্ব হচ্ছে R, এবং দেখাই যাচ্ছে R2 হচ্ছে R1 থেকে বেশি। বৃত্তের পরিসীমা হচ্ছে 2πR1কিন্তু “ব্যাসার্ধ” R1নয়, ব্যাসার্ধ 1R থেকে বেশি R2।
যদি আরো ভারী একটা পাথর রাখা হয় তাহলে কেন্দ্রটি আরো নিচে নেমে আসবে এবং যদিও পরিধির কোনো পরিবর্তন হয়নি, “ব্যাসার্ধ R; হবে আরও অনেক বেশি। আমরা প্রচলিতভাবে ব্যাসার্ধ বলতে যা বোঝাই এখানে সেটি আর ব্যবহার করা হচ্ছে না । কিন্তু ব্যবহার করার উপায়ও নেই! ব্ল্যাক হোলের বেলাতেও তাই হয়। পাথরের ভরের কারণে যে রকম রবারের পাতলা পর্দা ঝুলে পড়ে ব্ল্যাক হোলের ভরের কারণেও ঠিক সেরকম চারপাশের এলাকা বা ক্ষেত্র ঝুলে পড়ে। রবারের পদার্থ ছিল দ্বিমাত্রিক । ব্ল্যাক হোলের বেলায় সেটা হবে ত্রিমাত্রিক, এটাই পার্থক্য।
শৈশবে রূপকথার গল্পে আমরা পড়েছিলাম বারো হাত কাকুড়ের তেরো হাত বিচি। সেটা সম্ভব হবে কেউ কখনো কল্পনা করে নি–কিন্তু ব্ল্যাক হোলের বেলায় সেটা সত্যি। গোলকের পরিধি ছোট কিন্তু তার ব্যাসার্ধ বিশাল।
ব্ল্যাক হোলের প্রকৃত ব্যাসার্ধ কত সেটা বের করা সহজ নয়। কারণ, এক ক্ষুদ্র বিন্দুতে সীমাবদ্ধ বিশাল ভর কিন্তু শান্ত হয়ে বসে নেই, সেখানে ক্রমাগত প্রলয়কাণ্ড চলছে। তার কারণে তার চারপাশের ক্ষেত্রে এক বিশাল আলোড়ন সঠিকভাবে পরিধি থেকে কেন্দ্রের দূরত্ব বের করার কোনো উপায় নেই। কেউ একজন যে কখনো সেখানে ঢুকে কী হচ্ছে দেখে আসবে তারও কোনো উপায় নেই। প্রকৃতি অনেক আগেই সেটাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রেখেছে।
ব্ল্যাক হোলের ভেতরে কী হচ্ছে সেটা কেউ কখনো জানবে না। কিন্তু কল্পনা করতে পারবে না সেটা তো কেউ বলে নি–এই হিসেবে মানুষের ভাবনার জগৎ থেকে বড় কিছু আর নেই–সেটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় কথা।
.
29. মহাজাগতিক সংঘর্ষ
কোনো জিনিস আকারে খুব বড় হলে সেটা সাধারণত আমাদের ভেতরে এক ধরনের মুগ্ধ। বিস্ময়ের জন্ম দেয়। মাঝে মাঝে অবশ্য আমরা তার ব্যতিক্রম খুঁজে পাই, এমন কোনো জিনিস আমাদের চোখে পড়ে যার আকারটি অপ্রয়োজনীয়ভাবে বিশাল এবং তার বিশালত্ব নিজের কাছে ক্ষতিকর, অনেক সময় দৃষ্টিকটু এবং এ-রকম জিনিসকে আমরা ডাইনোসর বলে উপহাস করি। তার কারণ পৃথিবীতে একসময় ডাইনোসর বলে এক ধরনের বিশাল সরীসৃপ রাজত্ব করত এবং আজ থেকে পঁয়ষট্টি মিলিয়ন বৎসর আগে পৃথিবীতে টিকে থাকতে না পেরে তারা পুরাপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কোনো প্রাণী যদি পৃথিবীতে টিকে থাকতে না পারে তাহলে আমরা সেটাকে তার সীমাবদ্ধতা মনে করে উপহাস করতেই পারি, আমাদের কারো কাছে সেটা মোটেও বিচিত্র মনে হয় না।
তবে যে জিনিসটা আমরা একবারও চিন্তা করি না সেটা হচ্ছে–ধ্বংস হয়ে যাবার আগে ডাইনোসর পৃথিবীর বুকে একশ ত্রিশ মিলিয়ন বৎসর বেঁচেছিল। একশ ত্রিশ মিলিয়ন বৎসর সুদীর্ঘ সময় তুলনা করার জন্যে বলা যায় পৃথিবীতে আমরা (হোমোস্যাপিয়েন) এসেছি মাত্র চল্লিশ হাজার বৎসর আগে। এই চল্লিশ হাজার বৎসরেই পৃথিবীটাকে আমরা এমন একটা পর্যায়ে নিয়ে গেছি যে আমাদের সন্তানদের কাছে এটা বাসযোগ্য রেখে যেতে পারব কী না সেটা নিয়ে আমাদের নিজেদের ভেতরেই সন্দেহের জন্ম হয়েছে। যদি পরিবেশ পুরাপুরি ধ্বংস না করেও কোনোভাবে টিকে যেতে পারি তারপরেও পৃথিবীর যুদ্ধবাজ রাষ্ট্রপতিরা লোভ এবং গোয়ার্তুমি করে পুরো পৃথিবীটা ধ্বংস করে দিতে পারে। পৃথিবীতে মানুষ এক লক্ষ বছর বেঁচে থাকবে কিনা আমরা জানি না, ডাইনোসর একশ ত্রিশ মিলিয়ন। বৎসর বেঁচেছিল। যেটা এক লক্ষ থেকে একশ ত্রিশ হাজার গুণ বেশি। কাজেই কেউ যদি সাইনোসরকে পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকার অযোগ্য একটা প্রাণী ভেবে থাকে সে খুব বড় ভুল করবে।
