ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে তৈরি তার দ্বিতীয় দলের মানুষদের বলা যায় বৈচিত্র্যবাদী! তারা মনে করেন বিশাল এই ডার্ক ম্যাটারের জগৎ আসলে আমাদের পরিচিত বেরিওন দিয়ে তৈরি নয়, সেগুলো তৈরি হয়েছে এমন কোন বিচিত্র পদার্থ দিয়ে আমরা এখনো যার খোঁজ পাই নি। তারা সেটার একটা গালভরা নাম দিয়েছেন (Weackly Interacting Massive Particles) WIMP এবং অনুমান করছেন আমাদের চারপাশে এগুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কিন্তু যেহেতু এগুলো আমাদের পরিচিত কিছু নয় তাই আমরা সেগুলো দেখতে পাচ্ছি না। সেগুলো খোঁজার জন্যে বিশেষ ধরনের ডিটেক্টর তৈরি করা হয়েছে। চরম শূন্যের কাছাকাছি তাপমাত্রায় রাখা সিলিকনের সেই ডিটেক্টর এ ধরনের বিচিত্র বস্তুর অস্তিত্ব নিয়ে পরীক্ষা করে যাচ্ছে। যদি সত্যি সেরকম কিছু খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে পদার্থবিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নূতন একটি অধ্যায়ের সূচনা হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
নূতন অধ্যায়ের সূচনা হোক আর পুরাতন অধ্যায় দিয়েই ব্যাখ্যা করা হোক মহাজগতের অদৃশ্য এই বিশাল ভর কোথা থেকে এসেছে সেটি জানার জন্যে বিজ্ঞানীরা নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে কাজ করে যাচ্ছেন। বিশাল এই জগতের কত ক্ষুদ্র অংশই না আমরা জানি এবং ভবিষ্যতের জন্যে আমাদের না জানি কত বিস্ময় লুকিয়ে আছে।
.
27. ব্ল্যাক হোল
ব্ল্যাক হোল (Black Hole) শব্দটা তুলনামূলকভাবে বেশ নূতন। 1969 সালে জন হুইলার প্রথম এটা ব্যবহার করেছিলেন। যদিও ব্ল্যাক হোল বিষয়টি মাত্র কিছুদিন থেকে পদার্থবিজ্ঞানীদের চিন্তাভাবনায় অনেকখানি জায়গা জুড়ে বসেছে কিন্তু মজার ব্যাপার হলো দুশ বছরেরও আগে ক্যামব্রিজের একজন বিজ্ঞানী, জন মিসেল প্রথম এর একটি ধারণা দিয়েছিলেন।
একটা সময় ছিল যখন কোনো কোনো বিজ্ঞানী ভাবতেন আলো হচ্ছে এক ধরনের কণা, অন্যেরা ভাবতেন এটা হচ্ছে তরঙ্গ। (মজার ব্যাপার হচ্ছে এখন দেখা গেছে দুটিই সত্যি, আলোকে কণা হিসেবে দেখা যায় আবার তরঙ্গ হিসেবেও দেখা যায়!) আলোকে তরঙ্গ হিসেবে দেখা হলে মহাকর্ষ বল কীভাবে এর উপর কাজ করবে সেটা অনুমান করা যায় না। কিন্তু এটাকে কণা হিসেবে দেখলে বিষয়টা খুব সহজ হয়ে যায়। একটা টেনিস বল উপরে ছুঁড়ে দিলে মধ্যাকর্ষণের কারণে এটা যে-রকম নিচে ফিরে আসে ব্যাপারটা অনেকটা সে রকম হয়ে যায়। জন মিশেল সেটাই করলেন–হিসেব করে দেখালেন, একটা নক্ষত্র যদি যথেষ্ট বড় হয়, তার ঘনত্ব যদি নির্দিষ্ট ঘনত্ব থেকে বেশি হয় তাহলে তার থেকে যে আলোটা বের হবে (যে আলোর কণা বের হবে। সেটা নক্ষত্র ছেড়ে চলে যেতে পারবে না। নক্ষত্রের প্রবল আকর্ষণে আলোর কণা ঠিক উপরে ছুঁড়ে দেওয়া টেনিস বলের মতো নিচে ফিরে আসবে। এ-রকম কোনো নক্ষত্র যদি থাকে সেটাকে কেউ দেখতে পাবে না, কারণ সেখান থেকে কোনো আলো বের হবে না, উল্টো মনে হবে সব আলো বুঝি শুষে নিচ্ছে, মনে হবে অন্ধকারের গোলক বা ব্ল্যাক হোল।
জন মিশেলের ব্ল্যাক হোলের অবশ্যি একটা বড় সমস্যা রয়েছে, সেটা তখন কেউ জানত না। আলোর গতিবেগ সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশী হাজার মাইল এবং সেটা কখনোই কমে না। বা বাড়ে না! সব সময়েই এটা সমান–কাজেই নক্ষত্রের প্রবল আকর্ষণে আলোর কণার গতিবেগ কমে একসময় থেমে যাবে তারপর আবার নক্ষত্রের প্রবল আকর্ষণে আবার নক্ষত্রের বুকে ফিরে আসবে, সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। মহাকর্ষ বল কীভাবে আলোর কণার উপর কাজ করে সেটা পুরাপুরি বোঝার জন্যে পৃথিবীর মানুষকে 1915 সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে, যখন অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তার জেনারেল থিউরি অব রিলেটিভিটি দিয়ে প্রথমবার সেটা ব্যাখ্যা করলেন। সত্যি কথা বলতে কি বিশাল নক্ষত্র কীভাবে তার মহাকর্ষ বল দিয়ে পরিবর্তিত হয়, কীভাবে আলোর কণার উপর কাজ করে সেটা পুরাপুরি বুঝতে বুঝতে আরো কয়েক দশক কেটে গেছে।
ব্ল্যাক হোল কীভাবে তৈরি হয় সেটা বোঝার জন্যে আগে একটা নক্ষত্র কীভাবে কাজ করে সেটা বুঝতে হবে। একটা নক্ষত্র তৈরি হয় যখন মহাকাশের কোথাও হাইড্রোজেন গ্যাসের বিশাল একটা ভাণ্ডার একত্র হয়। মহাকর্ষের কারণে হাইড্রোজেন গ্যাস সংকুচিত হতে শুরু করে, যতই এটা সংকুচিত হয় ততই এর তাপমাত্রা বাড়তে থাকে। (গ্যাসকে সংকুচিত করা হলে তার তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়াই খুবই পরিচিত ব্যাপার, এর উল্টোটাও সত্যি, সংকুচিত বাতাসকে যুক্ত করে দেওয়া হলে সেটা শীতল হয়ে যায়। রেফ্রিজিরেটর বা এয়ার কন্ডিশনারে এই প্রক্রিয়াটা ব্যবহার করা হয়। বাতাসকে সংকুচিত করার সময় সেটা যে বেশ গরম হয়ে যায় সেটা রেফ্রিজিরেটরের বা এয়ার কন্ডিশনারের পিছনে গেলেই আমরা টের পাই।) সংকুচিত হাইড্রোজেন গ্যাসের তাপমাত্রা বাড়তে বাড়তে যখন একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় পৌঁছায় তখন একটা বিচিত্র ব্যাপার ঘটে। তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে পরমাণুর গতিবেগ বেড়ে যাওয়া কাজেই নক্ষত্রের ভেতরের হাইড্রোজেন পরমাণু প্রবল বেগে একটা আরেকটাকে ধাক্কা দিতে শুরু করে। গতিবেগ যদি খুব বেশি হয় তখন একটা হাইড্রোজেন পরমাণু অন্য পরমাণুকে ভেঙেচুড়ে একেবারে তার নিউক্লিয়াসে আঘাত করে। হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াসগুলো একত্র হয়ে যখন হিলিয়ামের নিউক্লিয়াস হয়ে মোট ভর কমে যায় তখন সেই বাড়তি ভরটুকু আইনস্টাইনের বিখ্যাত সূত্র E = mc^2 অনুযায়ী শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। (সত্যি কথা বলতে কী হাইড্রোজেন বোমাটি আসলে এই একই ব্যাপার। পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা এখনো এটাকে নিয়ন্ত্রণ করা শিখেন নি –নক্ষত্রে সেটা নিয়ন্ত্রিতভাবে হয়!) একটা নক্ষত্রে যখন হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম তৈরি শুরু হয় তখন সেটা শক্তি বিচ্ছুরণ করতে থাকে, আমরা তার আলোকে দেখতে পাই। নক্ষত্র যখন শক্তি দিতে শুরু করে তখন প্রথমবার সেই তাপশক্তি মহাকর্ষের প্রবল আকর্ষণকে ঠেকিয়ে রাখতে সম্ভব হয়। নক্ষত্রের সংকুচিত হওয়া হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায়।
