আমরা এই নক্ষত্ররাজির কথা জানি, গ্যালাক্সির কথা জানি কারণ আমরা সেগুলো দেখতে পাই। মানুষের চোখ নামে অপূর্ব এক জোড়া সম্পদ রয়েছে, দেখা নামক অভূতপূর্ব এক ধরনের প্রক্রিয়া রয়েছে। সেই চোখ আলোকে দেখতে পায় আর সেই আলো থেকে আমরা এই নক্ষত্ররাজি এই গ্যালাক্সির কথা জানি। যদি নক্ষত্র থেকে আলো বের না হতো তাহলে আমরা এই নক্ষত্রদের দেখতে পেতাম না, হয়তো তাদের কথা এত সহজে জানতে পারতাম না।
বিজ্ঞানীরা এই নক্ষত্ররাজি এবং গ্যালাক্সিমণ্ডলীকে দেখে অনুমান করার চেষ্টা করেছেন এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আকার কত বড়। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সকল গ্রহ নক্ষত্র গ্যালাক্সি সবকিছু মিলিয়ে তার ভর কত। সেটা করতে গিয়েই তারা আবিষ্কার করলেন যে, তাদের হিসেব মিলছে না। আমরা আমাদের চোখে যে নক্ষত্ররাজি যে গ্যালাক্সি দেখছি সেটুকু যথেষ্ট নয়। তার বাইরেও আরও বিশাল কিছু থাকতে হবে, যেগুলো আমরা দেখতে পাই না। যেটা দেখতে পাই না সেটা আছে কিংবা নেই সেই প্রশ্নটাই আমরা করি কী করে?
একটা সহজ উদাহরণ দিয়ে আমরা বোঝাতে পারি, আমরা চাঁদের কথা ধরি। ধরা যাক কোনো একটা কারণে চাঁদ আমাদের কাছ অদৃশ্য, আমরা চাঁদকে দেখতে পাই না। তাহলে পৃথিবীর মানুষ কি চাঁদের কথা জানতে পারত না? নিশ্চয়ই পারত এবং সেটা জানতে পারত নদী এবং সমুদ্রের পানিতে জোয়ার-ভাটা দেখে। একটা নির্দিষ্ট সময় পরে পরে কেন সমুদ্রের পানিতে জোয়ার এবং ভাটা হয় তার ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে, বিজ্ঞানীরা সুনমান করতেন পৃথিবীর কাছাকাছি নিশ্চয়ই কোনো একটা উপগ্রহ রয়েছে সেই উপগ্রহের আকর্ষণে সমুদ্রের পানি ফুলে-ফেপে ওঠে জোয়ারভাটার জন্ম দিচ্ছে। হিসেবপত্র করে তারা এই উপগ্রহের আকার আকৃতি বের করে ফেলতে পারবেন, পৃথিবীটাকে কতদিন পরপর প্রদক্ষিণ করছে। সেটাও অনুমান করে ফেলতে পারতেন।
ঠিক সেরকম মহাজগতে নানা নক্ষত্র, নক্ষত্রপুঞ্জের গতি দেখে তারা অনুমান করার চেষ্টা করেন তাদের আশপাশে যে সব মহাজাগতিক বস্তু আছে তাদের ভর কত। গত কয়েক দশকে তারা আবিষ্কার করছেন যে, তাদের অনুমান মিলছে না। নক্ষত্র বা নক্ষত্রপুঞ্জ বা মহাজাগতিক গ্যাসের গতিবিধি দেখে আশপাশে যে ভর থাকা উচিত বলে অনুমান করা হচ্ছে প্রকৃত ভর তার থেকে অনেক কম। তাদের মনে হচ্ছে অদৃশ্য কোনো ভর লুকিয়ে আছে যেটা তারা দেখতে পাচ্ছেন না।
আমাদের চোখ যে আলোকে দেখতে পায় তার বাইরেও কিন্তু আলো রয়েছে। আলো হচ্ছে বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ। এই তরঙ্গের দৈর্ঘ্য যখন একটা নির্দিষ্ট সীমার ভেতর থাকে শুধুমাত্র তখন সেটা আমরা দেখতে পাই, তার বাইরে চলে গেলে আমরা সেটা দেখতে পাই না। বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গের বিশাল ব্যাপ্তির মাঝে আমরা যেটুকু দেখতে পাই সেটা খুবই ছোট, ধর্তব্যের মাঝেই আনার কথা নয়! কাজেই আমরা যেটাকে দৃশ্যমান আলো বলছি তার বাইরেও অদৃশ্য আলোর একটা বিশাল জগৎ রয়েছে। অতি বেগুনি রশ্মি বা আন্ট্রাভায়োলেট রে সেরকম আলো, এক্স-রে সে রকম আলো। এই অদৃশ্য আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থেকে ছোট। ফাইবার অপটিক্সে তথ্য পাঠানোর জন্যে যে আলো ব্যবহার করা হয় সেটিও অদৃশ্য আলো, আমরা তাকে বলি ইনফ্রারেড বা অবলাল আলো। এর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থেকে বেশি। মাইক্রোওয়েভ বা রেডিও, টেলিভিশন কিংবা মোবাইল টেলিফোনে তথ্য আদান প্রদান করার জন্যে আমরা যে বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ ব্যবহার করি সেগুলোর তরঙ্গ দৈঘ্যও দৃশ্যমান আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য থেকে অনেক বেশি।
আমরা যে আলোকে দেখতে পাই তার বাইরেও বিশাল অদৃশ্য আলোর জগৎ জানার পর স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে সেই জগৎটা কেমন? আকাশের যে অংশ আমরা খালি চোখে দেখতে পাই না সেটা দেখার জন্যে বিজ্ঞানীরা নতুন ধরনের টেলিস্কোপ তৈরি করেছেন, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অনেক আলো শোষিত হয়ে যায় বলে মহাকাশে টেলিস্কোপ পাঠিয়েছেন। পৃথিবীর বিশাল এলাকা নিয়ে অতিকায় রেডিও টেলিস্কোপ তৈরি করেছেন এবং মহাকাশকে তন্নতন্ন করে পর্যবেক্ষণ করেছেন। দৃশ্যমান জগতের বাইরে বিশাল অদৃশ্য জগৎ তারা খুঁজে পেয়েছেন কিন্তু আবার যখন হিসেব করতে বসেছেন তারা সবিস্ময়ে আবিষ্কার করেছেন যে, এখনো হিসাব মিলছে না। এই মহাজগতে যে পরিমাণ বস্তু থাকার কথা সেই পরিমাণ বস্তু দেখা যাচ্ছে না। তারা নিশ্চিতভাবেই বলছেন এই মহাজগতে আমাদের চোখের কাছে অদৃশ্য এক ধরনের বস্তু রয়ে গেছে। খালি চোখে বা বিশেষ টেলিস্কোপে কোনোভাবেই সেটা দেখা যায় না বলে এর নাম দিয়েছেন অন্ধকার বস্তু বা ইংরেজিতে ডার্ক ম্যাটার । বর্তমান বিজ্ঞানের যে কয়টি রহস্য রয়েছে তার মাঝে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক রহস্যের একটি হচ্ছে এই ডার্ক ম্যাটার রহস্য।
সৃষ্টিজগতের কতটুকু এই ডার্ক ম্যাটার বা অন্ধকার বস্তু? শুনলে নিশ্চয়ই চমকে যাবার কথা যে শতকরা 93 ভাগ আমাদের চোখে এখনো অদৃশ্য। আমরা যেটুকু দেখছি সেটি হচ্ছে মাত্র দশ ভাগ, বাকি অংশটুকু আমরা দেখছি না, সোজাসুজি দেখার কোনো উপায়ও নেই।
ডার্ক ম্যাটার কী দিয়ে তৈরি সেটা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দ্বিধাবিভক্ত। এক দলকে বলা যায় বেরিওনবাদী। তারা মনে করেন এই ডার্ক ম্যাটার আমাদের পরিচিত বেরিওন (নিউট্রন প্রোটন) দিয়ে তৈরি। যেহেতু তাদের থেকে আলো বের হয় না তাই আমরা তাদের দেখতে পারি না–কিন্তু তারা আছে। সোজাসুজি না দেখলেও তাদের প্রভাবটুকু অনুভব করা যায়। তাদের প্রবল মাধ্যাকর্ষণের কারণে কখনো-কখনো আলো বেঁকে যায়। কখনো বিশেষ অবস্থায় সেটা লেন্সের মতো কাজ করে। স্লান কোনো আলোকে উজ্জ্বল আলো হিসেবে দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা আমাদের ছায়াপথে পর্যবেক্ষণ করে অনুমান করছেন ডার্ক ম্যাটারের শতকরা পঞ্চাশ ভাগ এরকম। মৃত নক্ষত্র এবং আলোহীন নানা ধরনের গ্যাস বা পদার্থ দিয়ে এসব তৈরি ।
