সুপারনোভা বিষয়টি বোঝা খুব কঠিন নয়। মানুষের যেরকম জন্ম মৃত্যু হয় নক্ষত্রের সেরকম জন্ম মৃত্যু হয়। অপঘাতে মৃত্যু বা খুন জখমকে যদি বাদ দিই তাহলে মানুষের জন্ম মৃত্যুর একটা সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। নক্ষত্রের সেই প্রক্রিয়াটি নির্ভর করে তার ভরের উপর। নক্ষত্রের ভর যদি সূর্যের ভরের কাছাকাছি হয় তাহলে তার মৃত্যু হয় মোটামুটি বৈচিত্র্যহীন। নক্ষত্র তার জ্বালানী নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া করে শেষ করে ফেলে, মহাকর্ষের আকর্ষণে গ্রহটা সংকুচিত হয়ে ছোট হয়ে পৃথিবীর আকারের কাছাকাছি হয়ে থাকে। কিন্তু নক্ষত্রের ভর যদি সুর্যের ভর থেকে 1.4 গুণ বা তার বেশি হয় তাহলে তার মৃত্যুটি হয় চমকপ্রদ! নক্ষত্রটি তার জ্বালানী শেষ করে ফেলতে থাকে এবং নক্ষত্রের কেন্দ্রটি সংকুচিত হতে থাকে। জ্বালানী যেহেতু শেষ হয়ে আসছে নক্ষত্রকে ধরে রাখার কিছু নেই। কেন্দ্রটি হঠাৎ করে তখন সংকুচিত হয়ে অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকার নিয়ে নেয়। বলা যেতে পারে।
পরমাণুগুলো ভেঙে তার নিউক্লিয়াসটিতে সমস্ত ভর এসে জমা হয়। কেন্দ্রে যেটি তৈরি হয়। তার নাম নিউট্রন স্টার। পুরো ব্যাপারটি ঘটে মাত্র সেকেন্ড দশেকের মাঝে। নিউক্লিয়াসটির ভরের শতকরা দশ ভাগ তখন শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে ভয়ংকর একটা বিস্ফোরণের জন্ম। দেয়, সেই বিস্ফোরণে পুরো নক্ষত্রটি ছিন্ন ভিন্ন হয়ে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ে। (ছবি নং 1) 1987 সালের 24 ফেব্রুয়ারি ঠিক এ-রকম একটি সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটতে দেখেছিল পৃথিবীর মানুষ।
এই বিস্ফোরণে নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হওয়া জটিল পরমাণুগুলো মহাবিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। সেগুলো লক্ষ কোটি বছর পর মহাজাগতিক ধূলিকণা এবং অন্য সবকিছুর সাথে মিলে হয়তো কোথাও সৌরজগতের জন্ম দেয়। সেই সৌরজগতে সূর্য থাকে, থাকে পৃথিবীর মতো গ্রহ। পৃথিবীতে থাকে মানুষ জন্ম দেয়ার প্রয়োজনীয় অনু-পরমাণু যার জন্ম হয়েছে নক্ষত্রে এবং সুপারনোভা বিস্ফোরণে ছড়িয়ে পড়েছিল মহাবিশ্বে।
তাই পৃথিবীর মানুষ যখন কখনো নিজের দিকে তাকায় তার বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে থাকার কথা। তার রক্তের ভেতরকার লৌহ পরমাণু, দাঁতের ক্যালসিয়াম, মস্তিষ্কের পটাশিয়াম সবগুলোর জন্ম হয়েছিল মহাজগতের কোনো এক নক্ষত্রে। অলৌকিক উজ্জ্বল আলোর ছটা ছড়িয়ে সেগুলো ছড়িয়ে পড়েছিল মহাজগতে। সেই হিসেবে আমরা সবাই কোনো না কোনো নক্ষত্রের অংশ।
যে মানুষ নক্ষত্রের অংশ সে কি কখনও কোনো ছোট কাজ করতে পারে? করা কি উচিৎ?
.
26. অদৃশ্য জগতের সন্ধানে
আকাশের দিকে তাকানোর ব্যাপারটি আমরা প্রায় ভুলেই গিয়েছি। নগরজীবনে ‘আকাশ’ শব্দটি ধীরে ধীরে অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে। অল্প জায়গায় অনেক মানুষকে জায়গা দেবার জন্যে উঁচু উঁচু বিল্ডিং মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। সেগুলো ধীরে ধীরে আকাশকে আড়াল করে দিচ্ছে । তারপরও কেউ যদি আকাশের দিকে তাকায় দেখবে সেটি সৌন্দৰ্য্যহীন বিবর্ণ। শহরের ধুলোবালিতে ধূসর। রাতের বেলা সেই আকাশ আমাদের চোখে পড়ে না, শহরের লক্ষ লক্ষ আলোর বিচ্ছুরণে আকাশ ঢাকা পড়ে থাকে। আকাশে গোপনে প্রায় অপরাধীর মতো চাঁদ ওঠে একসময় বড় হতে হতে পূর্ণিমা হয় আবার ছোট হতে হতে অমাবস্যার অন্ধকারে ঢেকে যায়। শহরের মানুষ কি কখনো সেটা দেখেছে? অনুভব করেছে?
আকাশের মতো এত চমৎকার একটি জিনিস আমাদের কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছে তার থেকে দুঃখের ব্যাপার আর কী হতে পারে? আমাদের কৃত্রিম জীবনে আকাশকে নির্বাসন দিয়েছি কিন্তু তবু সেটা আছে। কেউ যদি কখনো শহর থেকে দূরে প্রকৃতির কাছাকাছি কোনো গ্রামে, বিদ্যুহীন কোনো বনবাদাড়ে, নদীতে, খোলা প্রান্তরে রাতের বেলা এসে হাজির হয় এখনো সেই আকাশকে দেখতে পাবে। যদি আকাশে চাঁদ থাকে সেটা আমাদের দৃষ্টির অনেকখানি দখল করে রাখবে। যদি চাঁদ না থাকে তাহলে আমরা আকাশের নক্ষত্র দেখে মুগ্ধ হব। পরিষ্কার আকাশে ঝকঝকে নক্ষত্রের মতো অপূর্ব দৃশ্য আর কী আছে? কোন নক্ষত্র উজ্জ্বল, কোন নক্ষত্র অনুজ্জল, কোনটি মিটমিট করে জ্বলছে কোনটি স্থির । কোন কোন নক্ষত্রের আলোতে হালকা কোন একটি রংয়ের স্পর্শ। বছরের কোন সময় দেখছি তার উপর নির্ভর করে আমরা আবিষ্কার করতে পারি আকাশ-জোড়া ছায়াপথ! সেই সৃষ্টির আদিকাল থেকে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে এই নক্ষত্ররাজিকে দেখে আসছে, দৃশ্যটির খুব পরিবর্তন হয় নি। আকাশের সেই নক্ষত্রকে দেখে প্রাচীনকালের গুহাবাসী মানুষের মনে যে অনুভুতি হতো এতকাল পর এখনও আমাদের সেই অনুভূতি হয়। পার্থক্য শুধু এক জায়গায়, এখন আমরা এই রহস্যের খানিকটা বুঝতে পারি। হ্যাঁ, খানিকটা।
রাতের বেলা পরিষ্কার আকাশে আমরা কয়েক হাজার নক্ষত্র দেখতে পারি। মোটামুটি একটা বাইনোকুলার চোখে দিলে তার সংখ্যা আরো কয়েকগুণ বেড়ে যায়। আবছা ধোয়ার মতো নক্ষত্ররাজি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বছরের ঠিক সময় ঠিক জায়গায় তাকাতে পারলে এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সিটিও দেখা যায়। বাইনোকুলার ব্যবহার না করে ভালো টেলিস্কোপ ব্যবহার করলে হঠাৎ চোখের সামনে অসংখ্য নূতন নক্ষত্রের সাথে সাথে নূতন নূতন গ্যালাক্সি স্পষ্ট হয়ে উঠে। এরপর কোনো শেষ নেই মহাকাশের যত গভীরে দৃষ্টি দেয়া যায় সেখানে তত নূতন নূতন গ্যালাক্সি, তত নক্ষত্রপুঞ্জ, নেবুলা, কোয়াজার।
