এবারে একটা সহজ প্রশ্ন করা যাক, আমাদের শরীরে এগুলো এসেছে কোথা থেকে? একটা ছোট শিশু মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে, সেগুলো পেয়েছে মায়ের শরীর থেকে। মা তার সারা জীবনে বড় হওয়ার সময়ে নানা রকম খাবার থেকে পেয়েছেন। কিন্তু আমরা আসলে প্রশ্নটা আরো গভীরভাবে করতে চাই। আমাদের শরীরের এই যে বিভিন্ন পরমাণুগুলো এসেছে সেগুলো তৈরি হয়েছে কোথায়?
প্রশ্নটা ঠিকভাবে অনুভব করার জন্যে আমাদের হঠাৎ করে একটু পরমাণুবিজ্ঞান জানা দরকার। সবচেয়ে সহজ পরমাণু হচ্ছে হাইড্রোজেন যার কেন্দ্রে একটা প্রোটন এবং সেই প্রোটনকে ঘিরে ঘুরছে একটা ইলেকট্রন। প্রোটনের চার্জ পজিটিভ, ইলেকট্রনের নিগেটিভ তাই দুইয়ে মিলে একটা হাইড্রোজেন পরমাণু চার্জবিহীন। হাইড্রোজেনের পরের পরমাণু
হিলিয়াম, হিলিয়াম পরমাণুতে দুটি ইলেকট্রন কাজেই আমরা অনুমান করতে পারি তার কেন্দ্রে নিউক্লিয়াসে দুটি প্রোটন থাকবে। নিউক্লিয়াস হয় খুবই ছোট, যদি একটা মানুষকে চাপ দিয়ে তার পরমাণুগুলো ভেঙে নিউক্লিয়াসের ভেতর ঠেসে রাখা যেত তাহলে মানুষটিকে মাইক্রোস্কোপ দিয়েও দেখা যেত না! এত ছোট জায়গায় পাশাপাশি দুটি প্রোটন থাকতে পারে না, একই চার্জ হওয়ার কারণে একটি আরেকটিকে ঠেলে বের করে দিতে চায়। ব্যাপারটি নিরুপদ্রব করার জন্যে সেখানে প্রোটনের সমান ভর কিন্তু চার্জহীন নিউট্রন থাকে। একটা পরমাণুকে তার ইলেকট্রন (এবং প্রোটনের) সংখ্যা দিয়ে নির্দিষ্ট করা হয় কিন্তু নিউট্রন কতগুলো হবে সেটা এ-রকম জোর দিয়ে বলা যায় না। নিউট্রনের সংখ্যা প্রোটনের সংখ্যার সমান কিংবা বেশি হতে পারে। এবং এ ধরনের নিউক্লিয়াসকে আইসোটপ বলে। নিউক্লিয়াস যত বড় হয় নিউট্রনের সংখ্যা তত বেশি হয়। মানুষের শরীরে যে সব পরমাণু পাওয়া যায় তার ইলেকট্রন এবং প্রোটনের সংখ্যা 1 নং তালিকায় দেয়া হলো। বিভিন্ন আইটেপের গড় করে পারমাণবিক ভর বের করা হয়েছে। তালিকাটি একনজর দেখে আমরা আমাদের আগের প্রশ্নে ফিরে যাই, মানুষের শরীরে পাওয়া যায় বলে যে পরমাণুগুলোর নাম লিখেছি সেগুলো কোথা থেকে এসেছে? যে পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব হয়েছে সেখানেই এই পরমাণুগুলো ছিল কিন্তু পৃথিবীতে এগুলো কোথা থেকে এসেছে? প্রশ্নটি সহজ কিন্তু উত্তরটি সহজ নয়!
| পরমাণুর নাম | ইলেকট্রন বা প্রোটন সংখ্যা | পারমানবিক ভর |
| হাইড্রোজেন | 1 | 1.00 |
| কার্বন | 6 | 12.01 |
| নাইট্রোজেন | 7 | 14.01 |
| অক্সিজেন | 8 | 16.00 |
| ফ্লোরিন | 9 | 19.00 |
| সোডিয়াম | 11 | 22.99 |
| ম্যাগনেসিয়াম | 12 | 24.31 |
| ফসফরাস | 15 | 30.98 |
| ক্লোরিন | 17 | 35.46 |
| পটাশিয়াম | 19 | 39.10 |
| ক্যালসিয়াম | 20 | 40.08 |
| লোহা | 26 | 55.85 |
সৃষ্টিজগতে এই পৃথিবী বা সৌরজগৎ আসার অনেক আগে নক্ষত্রগুলোর জন্ম হতে শুরু করে। বিজ্ঞানীরা হিসেব করে বের করেছেন সৃষ্টি জগতে প্রথম নক্ষত্রগুলোর জন্ম হয়েছিল 13 থেকে 14 বিলিওন (13 থেকে 14 শতকোটি) বৎসর আগে। সৃষ্টির আদিমুহূর্তে সবকিছু ছিল সহজ-সরল তাই শুরু হয়েছিল সবচেয়ে সহজ পরমাণু হাইড্রোজেন দিয়ে। মানুষ হত্যা করার জন্যে এখন যে হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করা হয় নক্ষত্রের শক্তি তৈরি করার প্রক্রিয়াটি আসলে সেই একই প্রক্রিয়া। নক্ষত্রের ভেতরে হাইড্রোজেন অন্য হাইড্রোজেনের সাথে যুক্ত হয়ে হিলিয়াম তৈরি করে এবং সেই হিলিয়াম তৈরি করার প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপন্ন করে। সেই শক্তি নক্ষত্রকে ঔজ্জ্বল্য দেয়, তাপ দেয়। একটা নক্ষত্র যে কী পরিমাণ তাপ, আলো বা অন্য শক্তি দিতে পারে সেটি বোঝার জন্যে আমাদের সূর্যকে একনজর দেখলেই হয়, এত ঘরের কাছে এ-রকম একটা নক্ষত্র আছে বলেই পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা এত সহজে নক্ষত্র সম্পর্কে এত কিছু জানতে পেরেছেন।
নক্ষত্রের ভেতরে হাইড্রোজেন এক ধরনের জ্বালানী হিসেবে কাজ করে। হাইড্রোজেন ফুরিয়ে হিলিয়াম তৈরি হয় (হিলিয়ামের ইলেকট্রন বা প্রোটন সংখ্যা 2, পারমাণবিক ভর 4), সেই হিলিয়াম থেকে তৈরি হয় কার্বন আর এভাবে নক্ষত্রের ভেতরে বিভিন্ন নিউক্লিয়াসগুলো তৈরি হতে থাকে। আমাদের পৃথিবীতে আমরা এখন যে পরমাণুগুলো দেখি তার সবগুলো এভাবে কোনো না কোনো নক্ষত্রের ভেতরে তৈরি হয়েছে। আজকাল বিজ্ঞানীরা বিশাল কোনো গবেষণাগারে এক্সেলেরেটর ব্যবহার করে এক দুটি নিউক্লিয়াস তৈরি করতে পারেন, কিন্তু আমাদের পৃথিবীর বা সৌরজগতের জটিল পরমাণুর সবগুলোই তৈরি হয়েছে কোনো না কোনো নক্ষত্রের ভেতরে । শুনে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে কিন্তু আমরা সবাই আসলে কোনো না কোনো নক্ষত্রের অংশ। স্বাভাবিকভাবেই পরের প্রশ্নটি চলে আসে, যদি সত্যি সত্যি আমাদের শরীরের জটিল পরমাণুগুলো কোনো না কোনো নক্ষত্রের ভেতর তৈরি হয়ে থাকে তাহলে সেগুলো সেখান থেকে এই পৃথিবীতে এলো কেমন করে?
1987 সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমি যুক্তরাষ্ট্রের উহসকনসিন স্টেটে একটা কনফারেন্স গিয়েছি–সারা পৃথিবী থেকে ছোট-বড় অনেক পদার্থবিজ্ঞানীরা এসেছেন, তাদেরকে আনন্দ দেবার জন্যেই কিনা জানি না ঠিক তখন সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাটি ঘটে গেল। সকালে কনফারেন্সে এসে শুনতে পেলাম আগেরদিন একটা সুপারনোভা বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর আগে সুপারনোভা বিস্ফোরণ শুধুমাত্র তার আলো থেকে দেখা যেত, এই প্রথমবার বিজ্ঞানীরা আলো ছাড়াও অদৃশ্য নিউট্রিনো ডিটেক্টর তৈরি করেছেন এবং প্রথমবার সুপারনোভা বিস্ফোরণ থেকে বের হওয়া নিউট্রিনোকে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেলেন। সারা পৃথিবীতে বিশাল হইচই পড়ে গেল!
