একটা খুব সহজ প্রশ্ন করা যায়, সূর্যে (কিংবা অন্যান্য নক্ষত্রে) যখন হাইড্রোজেন (নিউট্রনের সাহায্যে) হিলিয়ামের পরিণত হয় তখন তার 0.007 ভাগ ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়। এই সংখ্যাটি যদি 0.007 না হয়ে 0.006 বা 0.008 হতো তাহলে কী হতো? প্রশ্নটি খুবই সহজ কিন্তু এর উত্তরটি ভয়াবহ। সংখ্যাটির এই ক্ষুদ্রতম বিচ্যুতি হলেই এই বিশ্বব্ৰহ্মাণ্ড, সৃষ্টিজগৎ, গাছপালা, প্রাণী কিছুই থাকত না!
ধরা যাক সংখ্যাটি 0.006 বা তার থেকে কম। যার অর্থ নিউক্লিয়ার বিক্রিয়াতে শক্তি খানিকটা কম তৈরি হচ্ছে, সূর্যের উত্তাপ খানিকটা কম, এবং সূর্যের আয়ুও খানিকটা কম। কিন্তু এ কারণে আসলে এর থেকেও অনেক গুরুতর ব্যাপার ঘটতে পারে।
সূর্য বা অন্য নক্ষত্রে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়াম সরাসরি তৈরি হয় না, এটা ধাপে ধাপে তৈরি হয়। প্রথম ধাপে একটি প্রোটন (হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস) এবং একটা নিউট্রন একত্র হয়ে ডিউটোরিয়াম তৈরি হয়। এই ডিউটেরিয়াম বিক্রিয়া করে হিলিয়াম তৈরি করে। যদি হিলিয়ামের হারিয়ে যাওয়া ভরের অংশ 0.006 বা তার কম হতো তাহলে নক্ষত্রের বা সূর্যের ভেতর ডিউটেরিয়ামগুলো টিকে থাকতে পারত না। আর ডিউটেরিয়াম যদি টিকে থাকতে না পারে তাহলে সেটা পরবর্তী ধাপে হিলিয়াম নিউক্লিয়াস কেমন করে তৈরি করবে? যার অর্থ হাইড্রোজেন কখনোই হিলিয়ামে পরিণত হতে পারবে না। নক্ষত্রগুলো হবে আলোহীন এবং নিষ্প্রভ। সূর্য থেকে দেড়গুণ বড় নক্ষত্র যেভাবে প্রচণ্ড সুপারনোভা বিস্ফোরণ করে নানা ধরনের নিউক্লিয়াস ছড়িয়ে দেয় সেই প্রক্রিয়াটি বন্ধ থাকত। যার অর্থ এই বিশ্বজগতে হাইড্রোজেন ছাড়া আর কিছুই থাকত না। কোথাও কোনো জটিলতা নেই, কোনো জটিল অনু পরমাণু নেই, গ্রহ নেই, ই গাছপালা নেই, প্রাণ নেই– সমস্ত বিশ্বজগতে মাত্র একটি পরমাণু, বৈচিত্রহীন হাইড্রোজেন।
হিলিয়ামের হারিয়ে যাওয়া ভর 0.006 থেকে কম হওয়ার কারণে পুরো বিশ্বজগৎ যদি বৈচিত্রহীন হয়ে পড়ে তাহলে অনেকের ধারণা হতে পারে সম্ভবত সেটি যদি 0.009 কিংবা তার থেকেও বেশি হতো তাহলে সম্ভবত সমস্ত বিশ্বজগৎ আরো অনেক চমকপ্রদ হতো, আরো বিচিত্র সব অনু আরো । বিচিত্র যৌগিক পদার্থ, আরো বিচিত্র রসায়ন, বৃক্ষলতা প্রাণীর জন্ম হতো। কিন্তু ব্যাপারটি মোটেও সে-রকম নয়। বিশ্বজগৎ সৃষ্টির প্রথম ধাপ হচ্ছে হাইড্রোজেন থেকে হিলিয়ামের সৃষ্টি। আগেই বলা হয়েছে সেটা তৈরি করার জন্যে প্রথমে ডিউটোরিয়ামের জন্ম হতে হয়। যদি হিলিয়াম নিউক্লিয়াসের হারিয়ে যাওয়া ভর 0.007 থেকে বেশি হয়ে 0.008 বা তার থেকে বেশি হয়ে যায় তাহলে আর ডিউটেরিয়াম তৈরি হতে হয় না, দুটি হাইড্রোজেনের নিউক্লিয়াস (অর্থাৎ, দুটো প্রোটন) নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া করে একত্র হয়ে যেতে পারতো। এই সম্পূর্ণ নূতন ধরনের নিউক্লিয়াস তৈরি হতো বিশ্বজগৎ সৃষ্টির একেবারে গোড়ার দিকে, আর এভাবে সমস্ত হাইড্রোজেন খরচ হয়ে যেত। নক্ষত্রের জ্বালানী হবার জন্যে কোনো হাইড্রোজেন আর বাকি থাকত না। আর হাইড্রোজেনই না থাকে তাহলে পানি আসতো কোথা থেকে?
কাজেই বিজ্ঞানীরা দেখেছেন হিলিয়াম নিউক্লিয়াসের হারিয়ে যাওয়া ভর যদি 0.006 থেকে 0.008 এর ভেতরে না হতো তাহলে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড তৈরিই হতো না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার শুধু এই সংখ্যাটি নয় প্রকৃতিতে আরো অনেক সংখ্যা আছে যেগুলো অল্প একটু পরিবর্তন হলেই এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডটি হয় এভাবে তৈরি হতো না, আর যদিও বা তৈরি হতো সেটি হতো এমন বিদঘুঁটে জগৎ যে সেই জগতে বুদ্ধিমান প্রাণী দূরে থাকুক প্রাণের বিকাশই ঘটা সম্ভব হতো না! দেখে-শুনে মনে হয় প্রকৃতি বুঝে খুব সতর্কভাবে এই সংখ্যাগুলো বেছে নিয়েছে যেন বিবর্তনের ভেতর দিয়ে মানুষের মতো বুদ্ধিমান প্রাণী এই পৃথিবীতে জন্ম নিতে পারে।
সহায়ক গ্রন্থ : Just six numbers Martin Rees
.
25. নক্ষত্রের সন্তান
মানুষের শরীরের বেশিরভাগই পানি, যদি পানিটুকু আলাদা করা যেত তাহলে দেখা যেত পায়ের তলা থেকে বুক পর্যন্ত পুরোটুকুই পানি। পানিকে আমরা পানি হিসেবেই দেখে অভ্যস্ত, যদিও আসলে সেটা হাইড্রোজেন এবং অক্সিজেন পরমাণু দিয়ে তৈরি। পরমাণুর সংখ্যা দিয়ে হিসেব করলে মানুষের শরীরে সবচেয়ে বেশি রয়েছে হাইড্রোজেনের পরমাণু কিন্তু হাইড্রোজেন যেহেতু সবচেয়ে হালকা পরমাণু তাই সংখ্যায় বেশি থেকেও তার ওজন বেশি নয়, মানুষের শরীরে ওজন হিসেবে হাইড্রোজেন হচ্ছে শতকরা দশভাগ। সেই হিসেবে সবচেয়ে বেশি হচ্ছে অক্সিজেন শতকরা পঁয়ষট্টি ভাগ। এরপর হচ্ছে কার্বন শতকরা আঠারো ভাগ। এই বড় তিনটি পরমাণুর পরই হচ্ছে নাইট্রোজেন, শতকরা তিন ভাগ। বাকি চার ভাগ তৈরি হয় ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লোহা, ম্যাগনেসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ক্লোরিন, ফ্লোরিন এই ধরনের আরো নানা পরমাণু দিয়ে। পরিমাণে তুলনামূলকভাবে কম হলেও এদের গুরুত্ব কিন্তু মোটেও কম নয়। যেমন লোহার পরিমাণ শতকরা অর্ধ শতাংশেরও কম হলেও আমাদের রক্তে অক্সিজেন নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ কাজটা করে লোহা। কাজেই হাইড্রোজেন, অক্সিজেন, কার্বন, নাইট্রোজেন ছাড়া অন্যান্য পরমাণুগুলো ছাড়া মানবদেহ সম্পূর্ণ হতে পারে না।
