15 বিলিওন বছর সময়টিতে এক বছরের একটি ক্যালেন্ডারে প্রকাশ করা হলে কিছু চমকপ্রদ ব্যাপার দেখা যায়, যেমন মানুষের জন্ম হয়েছে ডিসেম্বরের একত্রিশ তারিখ রাত সাড়ে দশটায়, অর্থাৎ মাত্র দেড়ঘণ্টা আগে!
মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারে যাবার আগে আমরা সংখ্যার হিসেবটি একবার ঝালাই করে নিই। আমরা দৈনন্দিন কথাবার্তায় সংখ্যাকে হাজার, লক্ষ কোটি হিসেবে প্রকাশ করে থাকি, কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় সংখ্যাকে এক হাজার গুণ হিসেবে প্রকাশ করা হয়। লক্ষ সংখ্যাটি বিজ্ঞানের জনপ্রিয় নয়, এক হাজারের হাজার গুণ, অর্থাৎ, দশ লক্ষ বেশ জনপ্রিয়, এই সংখ্যাটির নাম মিলিওন। উনিশ শ একাত্তরে এই দেশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যায় তিন মিলিওন লোক মারা গিয়েছে, বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যা একশ পঞ্চাশ মিলিওনের কাছাকাছি। পরবর্তী বড় সংখ্যা হচ্ছে বিলিওন, সেটি হচ্ছে এক হাজার মিলিওন। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের বয়স পনেরো বিলিওন, পৃথিবীর জনসংখ্যা পাঁচ বিলিওন। এক হাজার বিলিওনকে বলা হয় ট্রিলিওন, বাংলাদেশের মজুত গ্যাসের পরিমাণ ধরা হয় বারো থেকে ষোল ট্রিলিওন কিউবিক ফুট।
মিলিওন, বিলিওন এবং ট্রিলিওন সংখ্যাগুলো ব্যাখ্যা করার পর আমরা আমাদের মূল বিষয়টিতে যাই। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি হবার পর পনেরো বিলিওন বৎসরকে যদি এক বছরের একটি মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারের মাঝে আটিয়ে দেয়া যায় তাহলে মহাজাগতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ঘটেছে এভাবে:
(ক) বিগ ব্যাংয়ের মাধ্যমে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি : জানুয়ারি 1.
(খ) আমরা যে গ্যালাক্সিতে আছি, ছায়াপথ নামে সেই গ্যালাক্সির জন্ম : মে 1 এখানে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে জানুয়ারির এক তারিখে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হবার পরও গ্যালাক্সিগুলোর জন্ম নিতে পাঁচ মাস সময় লেগেছে।
(গ) সৌরজগতের জন্ম : সেপ্টেম্বরের 9 তারিখ । গ্যালাক্সি জন্ম নেবার পরও চার মাস থেকে বেশি সময় লেগেছে সৌর জগতের জন্ম হতে।
(ঘ) পৃথিবীর জন্ম : সেপ্টেম্বরের 14 তারিখ। সৌরজগৎ জন্ম নেবার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় পৃথিবীর জন্ম হয়েছে।
(ঙ) পৃথিবীতে প্রথম আদিম প্রাণের বিকাশ : সেপ্টেম্বরের 25 তারিখ । পৃথিবী জন্ম নেবার পর দুই সপ্তাহ থেকেও কম সময়ে প্রাণের আবির্ভাব হয়েছে।
(চ) প্রাচীনতম পাথরের জন্ম : 2 অক্টোবর।
(ছ) ব্যাক্টেরিয়া এবং নীল সবুজ এলজির প্রাচীনতম ফসিল : অক্টোবরের 9 তারিখ।
(জ) জন্ম প্রক্রিয়ার জন্যে ভিন্ন লিঙের উদ্ভব (জীবাণুদের ভেতর) : 1 নভেম্বর।
(ঝ) সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে এ-রকম গাছের জন্ম: নভেম্বরের 12 তারিখ।
(ঞ) উন্নত প্রাণীর জন্যে নিউক্লিয়াসসহ কোষের (ইউক্যারিওটস) আবির্ভাব :
দেখাই যাচ্ছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হয়েছে জানুয়ারির এক তারিখে কিন্তু নভেম্বরের 15 তারিখ পর্যন্ত, বছরের প্রায় বড় সময়টাই চলে গেছে এতদিনে মাত্র উন্নত প্রাণী জন্ম নেয়ার উপযোগী কোষ তৈরি হতে শুরু করেছে। পুরো সময়টা আরো সঠিকভাবে অনুভব করার জন্যে মনে রাখতে হবে মহাজাগতিক এই ক্যালেন্ডারে এক সেকেন্ড প্রায় পাঁচশ বৎসর (নিখুঁতভাবে বলতে গেলে 475 বৎসর) একদিন হচ্ছে চল্লিশ মিলিওন বৎসর (কিংবা চার কোটি বৎসর)!
মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারে নভেম্বর মাস শেষ হয়ে ডিসেম্বর মাস আসার পর পৃথিবীর ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ঘটতে শুরু করেছে বলা যায়। তাই ডিসেম্বর মাসের ক্যালেন্ডারটা আলাদাভাবে লেখা যেতে পারে:
ডিসেম্বর 1 পৃথিবীতে অক্সিজেন সমৃদ্ধ বায়ুমণ্ডলের শুরু।
ডিসেম্বর 16 কেঁচো জাতীয় প্রাণীর উদ্ভব ।
ডিসেম্বর 17 মেরুদণ্ডহীন প্রাণীর বিকাশ।
ডিসেম্বর 18 সামুদ্রিক প্লাংকটন, শামুক জাতীয় ট্রাইলোবাইটের জন্য ।
ডিসেম্বর 19 প্রথম মাছ এবং মেরুদণ্ডী প্রাণীর উদ্ভব
ডিসেম্বর 20 পৃথিবীর স্থলভাগ গাছ দিয়ে ঢেকে যেতে শুরু করা ।
ডিসেম্বর 21 পোকামাকড়ের জন্ম। স্থলভাগে প্রাণীদের বিচরণ।
ডিসেম্বর 22 প্রথম উভচর প্রাণীর উদ্ভব।
ডিসেম্বর 23 প্রথম বৃক্ষ এবং সরীসৃপের জন্ম।
ডিসেম্বর 24 ডাইনোসরের জন্ম।
ডিসেম্বর 26 স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্ম।
ডিসেম্বর 27 প্রথম পাখির জন্ম।
ডিসেম্বর 28 ডাইনোসরের জন্মের চারদিন পর তাদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার শুরু।
ডিসেম্বর 29 বানর জাতীয় প্রাণীর উদ্ভব।
ডিসেম্বর 30 বৃহৎ স্তন্যপায়ী প্রাণীর জন্ম।
ডিসেম্বর 31 পৃথিবীতে প্রথম মানুষের জন্ম।
দেখাই যাচ্ছে ডিসেম্বর মাসটি ছিল খুব ঘটনাবহুল । সৃষ্টি জগতের পুরোটুকু এক বছরের মাঝে সাজিয়ে দিতে হলে দেখা যায় শেষ দুই সপ্তাহটিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ঘটেছে। এবং তার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হচ্ছে মানুষের জন্ম হয়েছে একেবারে শেষ দিনে। কিন্তু আমরা আগেই বলেছি মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারে একদিন হচ্ছে চল্লিশ মিলিওন বা চার কোটি বছর। কাজেই শেষ । দিনটিকেও একটু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখা যেতে পারে। সত্যি কথা বলতে কি ডিসেম্বর মাসের শেষ দিনটি সারা দিন পার হয়ে সূর্য ডুবে যাবার পর যখন রাত সাড়ে দশটা বাজে তখন প্রথম মানুষের জন্ম হয়েছিল। কাজেই মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারে মানুষের বয়স মাত্র দেড় ঘণ্টা! মানবের জন্মের পর তাদের ইতিহাসটুকু তাহলে দেখা যাক:
