প্রথম প্রথম গ্রহাণুর নামগুলো ছিল বেশ ভারিক্কী। যতদিন যেতে শুরু করেছে জ্যোতির্বিদরা ততোই লঘু মেজাজে নাম দিতে শুরু করেছেন। যেমন 2309 নম্বর গ্রহাণুটির নাম দেয়া হয়েছে মি. স্পক। মি. স্পক হচ্ছে জনপ্রিয় টেলিভিশন সিরিজ স্টার ট্রেকের একটা চরিত্র! অনেক সময় গ্রহাণুর নামগুলো কোনো একটা স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্যেও ব্যবহার করা হয়। 1986 সালের মার্চ মাসে একটা দুর্ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশান চ্যালেঞ্জার বিধ্বস্ত হয়ে সাতজন মহাকাশচারী মারা গিয়েছিলেন। 3350 থেকে 3356 এই সাতটি গ্রহাণুকে এই সাতজন মহাকাশচারীর নামে নামকরণ করা হয়েছিল। এখন মোটামুটিভাবে যে জ্যোতির্বিদ একটা গ্রহাণুকে খুঁজে বের করেন তিনিই তার আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে সেই গ্রহাণুর নাম দিয়ে ফেলতে পারেন।
1 নং তালিকার গ্রহাণুগুলোর দিকে তাকালে যে বিষয়টিকে সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক মনে হবে সেটি হচ্ছে সূর্য থেকে এই গ্রহাণুগুলোর দূরত্ব। সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্বকে 1 ধরে (আসলে এটি 94 মিলিওন মাইল) তার তুলনার দূরত্বগুলো বসানো হয়েছে। মঙ্গলের কক্ষপথের দূরত্ব পৃথিবীর তুলনায় 1.5 এবং বৃহস্পতির কক্ষপথ 5.2 কাজেই গ্রহাণুগুলোর এর ভেতরেই থাকার কথা এবং মোটামুটি সেভাবেই আছে তবে প্রত্যেকটা গ্রহাণুর জন্যে দুটি দূরত্ব দেওয়া আছে একটি কম অন্যটি বেশি। তার কারণ গ্রহাণুগুলোর কক্ষপথ বৃত্তাকার নয় এগুলো উপবৃত্তাকার। কখনো-কখনো এটা সূর্যের কাছাকাছি চলে আসে এবং কখনো-কখনো দূরে চলে যায়। এ-রকম কয়েকটি গ্রহাণুর কক্ষপথ 22.1 নং ছবিতে দেখানো হয়েছে। এগুলোর মাঝে সবচেয়ে বড় গ্রহাণু সিরাসের কক্ষপথটি মোটামুটি বৃত্তাকার। হিলডালগো গ্রহাণুটির কক্ষপথ বৃহস্পতি এবং মঙ্গলের কক্ষপথ ভেদ করে পৃথিবীর কক্ষপথের কাছাকাছি চলে এসেছে। এপোলো এবং ইকারাস গ্রহাণুর কক্ষপথ আসলে পৃথিবীর কক্ষপথ ভেদ করে চলে এসেছে। সম্ভবত ইকারাসের নামকরণটি যথার্থ দেয়া হয়েছে। গ্রিক পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী ইকারাস মোম দিয়ে পাখা তৈরি করে ওড়ার চেষ্টা করেছিল। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী উড়তে উড়তে সে সূর্যের এত কাছাকাছি চলে এসেছিল যে সূর্যের প্রচণ্ড উত্তাপে মোম গলে তার পাখাগুলো খুলে গিয়ে তার মৃত্যু হয়। সূর্যের খুব কাছাকাছি চলে যায় বলেই হয়তো এই গ্রহাণুটার নাম দেয়া হয়েছে ইকারাস।
| সংখ্যা | নাম | আবিষ্কারের বছর | সূর্য থেকে দূরত্ব (পৃথিবীর তুলনায়) |
ব্যাস (মাইল) |
| 1 | সিরাস | 1801 | 2.55-2.94 | 622 |
| 2 | পালাস | 1802 | 2.11-3.42 | 377 |
| 3 | জুনো | 1804 | 1.98-3.35 | 155 |
| 4 | ভেস্টা | 1807 | 2.15-2.57 | 333 |
| 5 | এস্ট্রিয়া | 1845 | 2.10-3.06 | 63 |
| 6 | হেব | 1847 | 1.86-2.55 | 121 |
| 7 | আইরিস | 1847 | 2.09-2.55 | 130 |
| 8 | ফ্লোরা | 1847 | 1.86-2.55 | 94 |
| 9 | মিটাস | 1848 | 2.09-2.68 | 94 |
| 10 | হাইজিয়া | 1849 | 2.84-3.46 | 279 |
22.1 নং ছবিতে হেক্টর নামে যে গ্রহাণুটির কক্ষপথটি দেখানো হয়েছে সেটি প্রায় বৃহস্পতির কক্ষপথের মতোই। বৃহস্পতি আসলে বিশাল একটি গ্রহ তার আকর্ষণের কারণে অনেক গ্রহাণুই কাছাকাছি চলে এসেছে। বিশাল বৃহস্পতির সামনে এবং পিছনে থেকে পাইক বরকন্দাজের মতো এই গ্রহাণুগুলো বৃহস্পতিকে অনুসরণ করে। বৃহস্পতির কক্ষপথের এই গ্রহাণুগুলোর নাম হচ্ছে ট্রজান, যেগুলো সামনে থাকে সেগুলো হচ্ছে অগ্রগামী ট্রজান এবং যেগুলো পিছনে যাকে সেগুলো হচ্ছে পশ্চাগামী ট্রজান।
একটা গ্রহ যখন অনেক বড় হয় মাধ্যাকর্ষণের কারণে তখন সেটা গোলাকার রূপ নেয়। গ্রহাণুগুলোর আকার এত ছোট যে সেগুলোর আকার সব সময়ে গোলাকার নয়, তাদের বিচিত্র সব আকার রয়েছে। আকারে ছোট বলে ভর কম, তাই কোনো বায়ুমণ্ডলও নেই। কাজেই গ্রহাণুগুলোতে গ্রহের মতো জটিল কিছু নেই, এগুলো সহজ-সরল নিঃসঙ্গ ছোট-বড় পাথরের টুকরো ছাড়া আর কিছু নয়।
কে জানে, কোনোদিন হয়তো বিজ্ঞানীরা এই সাদামাটা পাথরের টুকরো থেকে সুদূর অতীতের কোনো প্রলয়ংকরী দুর্ঘটনা বা বিস্ফোরণের ইতিহাস খুঁজে বের করবেন।
০৯. মহাজগৎ
23. মহাজাগতিক ক্যালেন্ডার
খুব বড় একটি সংখ্যা অনুভব করা সহজ নয়। পৃথিবীতে এমনকি আমাদের দেশেও আজকাল টাকার ছড়াছড়ি, আমাদের আশপাশেই আমরা কোটিপতি দেখতে পাই। কিন্তু কোটি সংখ্যাটি কত বড় সেটা কি অনুভব করা খুব সহজ? একটা উপায় হচ্ছে সেটাকে কোনোভাবে আমাদের জীবনের সাথে সম্পর্ক আছে এ-রকম কোনো কিছুর সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া। আমরা সবাই মনে করি টাকা খরচ করতে পারাটা খুব আনন্দের ব্যাপার, কাজেই যদি মনে করি প্রতিদিন হাজার টাকা খরচ করতে পারব তাহলে এক কোটি টাকা খরচ করে শেষ করতে কতদিন লাগবে? একটু হিসেব করলেই আমরা দেখব সময়টা অনেক দীর্ঘ প্রায় সাড়ে সাতাইশ বছর! আমি নিশ্চিত এক কোটি সংখ্যাটি কত বড় এবারে সেটা সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া গেল। প্রতিদিন এক হাজার টাকা করে খরচ করলেও এক কোটি টাকা শেষ করতে যদি টানা সাড়ে সাতাইশ বছর লাগে তাহলে সংখ্যাটি নিঃসন্দেহে অনেক বড়।
বলা হয়ে থাকে আমাদের এই পরিচিত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হয়েছিল 15 বিলিওন বছর আগে। এর আগে কী ছিল বিজ্ঞানীরা সেই প্রশ্নটি শুনতে রাজি নন। বিশাল এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে (যেটাকে বলে বিগ ব্যাং) এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হবার আগে কিছুই ছিল না, সময়েরও শুরু হয়েছে এই বিগ ব্যাংক থেকে এটা হচ্ছে প্রচলিত বিশ্বাস। কিন্তু এই 15 বিলিওন বছরটি কত বড় সেটা কি আমরা অনুভব করতে পারি? আমাদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়গুলো (এস.এস.সি পরীক্ষা, সন্তানের বড় হওয়া) সাধারণত বছরের হিসেবে আসে, জীবন কয়েকটি দশকে শেষ হয়, কাজেই এর চাইতে দীর্ঘ কোনো সময় আমরা হয়তো কাগজে চট করে লিখে ফেলতে পারব কিন্তু সেই সময়টা কি সত্যিকারভাবে অনুভব করতে পারব? কাজটি সহজ নয়। তাই এই বিশাল মাপের সময়কে অনুভব করার জন্যে বিজ্ঞানীরা পুরো সময়টিকে এক বছরের একটা ক্যালেন্ডারের মাঝে প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ আমরা একটা মহাজাগতিক ক্যালেন্ডারের কথা বলছি যেটাতে জানুয়ারি মাসের এক তারিখে বিগ ব্যাং হয়েছিল এবং বর্তমান সময়টি হচ্ছে ডিসেম্বর মাসের একত্রিশ তারিখ রাত বারোটা, নূতন বছর মাত্র শুরু হতে যাচ্ছে।
