সবাই সম্ভবত লক্ষ করেছে তাপমাত্রা আরও বাড়িয়ে দিলে মহাকর্ষ বলটিও তার সাথে একত্র হয়ে যাবে এই কথাটি বলা হয় নি! আসলে মহাকর্ষ বল অন্য তিনটি বল থেকে একেবারে অন্যরকম। নিউক্লিয়ার, বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় এবং উইক বলকে ব্যাখ্যা করার জন্যে পদার্থবিজ্ঞানের যে অংশ ব্যবহার করা হয় তার নাম কোয়ান্টাম মেকানিক্স। মহাকর্ষকে ব্যাখ্যা করার জন্যে পদার্থবিজ্ঞানের যে অংশ ব্যবহার করা হয় সেটি হচ্ছে জেনারেল রিলেটিভিটি! বিজ্ঞানী আইনস্টাইন জেনারেল রিলেটিভিটির জনক, তিনি তার জীবনের ত্রিশ বৎসর মহাকর্ষ বলের সাথে অন্য বলগুলো একত্র করার জন্যে ব্যয় করেছিলেন, পারেন নি। মহাকর্ষ বল এমন একটি বল যে সেটাকে অন্য বলের সাথে একত্র করা অত্যন্ত দূরুহ!
মহাকর্ষ বল তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত দুর্বল। এটা কত দুর্বল সেটা খুব সহজে পরীক্ষা করা যায়। শীতের দিনে চুল আচড়ে একটা চিরুনীকে ছোট কাগজের টুকরোর কাছে ধরলে কাগজটা লাফিয়ে চিরুনীর গায়ে লেগে যায়। বিশাল পৃথিবী তার সমস্ত ভর ব্যবহার করে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি দিয়ে কাগজটাকে নিচের দিকে টানছে অথচ ছোট একটা প্লাস্টিকের চিরুনীতে অল্প একটু স্থির বিদ্যুৎ দিয়েই পুরো পৃথিবীর সম্মিলিত মহাকর্ষ বল থেকে বেশি বল প্রয়োগ করা সম্ভব। মনে হতে পারে এটা বুঝি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের বল, কিন্তু দেখা গেছে মহাকর্ষ বল অন্য সব বলের মতো। এটাও আলোর বেগের দ্রুততায় কাজ করে। অর্থাৎ, কোনো জাদুমন্ত্রের সাহায্যে যদি সূর্যটাকে উধাও করে দেয়া যায় পৃথিবী তার কক্ষপথ থেকে সাথে সাথে ছিটকে যাবে না, এটা ছিটকে যাবে আট মিনিট পরে। কারণ, সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে সময় লাগে আট মিনিট। আলো হচ্ছে বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গ। দেখা যাচ্ছে কোনো এক রহস্যময় কারণে মহাকর্ষ বল বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় তরঙ্গকে তার বল প্রয়োগের সময় হিসেবে বেছে নিয়েছে, কাজেই নিশ্চয়ই তাদের ভেতরে কোনো এক ধরনের যোগসূত্র রয়েছে।
সব ধরনের বলকে একত্র করার জন্যে বিজ্ঞানীদের চেষ্টার অন্ত নেই, ঝামেলা ছিল মহাকর্ষ বলকে নিয়ে। শেষ পর্যন্ত যে পদ্ধতিতে এই চারটি বলকে একত্র করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে সেটার নাম হচ্ছে সুপার স্ট্রিং থিওরি (Super sting theory)। এর জন্ম ইতিহাসটা মোটামুটি চমকপ্রদ কারণ এর মাঝে আছে বৈচিত্র, কৌতূহল, হতাশা এবং ধৈয্যের এক অপূর্ব সম্মেলন!
1968 সালে গ্যাব্রিয়েল ভেনেজিয়ানো নামে একজন তরুণ পদার্থবিজ্ঞানী শক্তিশালী এক্সেলেটরে এক্সপেরিমেন্টের ফলাফলগুলো পরীক্ষা করতে করতে একটা বিচিত্র মিল খুঁজে পেলেন। তিনি দেখলেন বিখ্যাত গণিতবিদ অয়লার দুশ বছর আগে যে বিটা ফাংশান তৈরি করে দিয়েছেন পরীক্ষার ফলাফলগুলো তার সাথে মিলে যায়। কেন এটা হয় এই তরুণ বিজ্ঞানী সেটা ব্যাখ্যা করতে পারলেন না। দুই বছর পর 1970 সালে লিওনার্ড সাসকিন্ড, হলজার নিলসেন এবং ইওশিরো নামবু নামে তিনজন বিজ্ঞানী দেখেলেন যদি দুটো কণা আসলে সুতার মতো রিং হিসেবে থাকে তাহলে তাদের ভেতরে যে শক্তির আদান-প্রদান হয় সেটি অয়লারের বিটা ফাংশান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। বিষয়টি অত্যন্ত চমকপ্রদ কারণ এর আগে সবাই জানত সবকিছুই একটা বিন্দুর মতো যার কোনো ব্যাপ্তি নেই কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে এটি বিন্দু নয়, এগুলো রবার ব্যান্ডের মতো স্ট্রিং! এত বড় একটা আবিষ্কারের পরও পৃথিবীর বিজ্ঞানী সমাজ সেটাকে তেমন আমল দিলেন না কারণ এই তত্ত্বটি অন্য অনেক ফলাফলকে ব্যাখ্যা করতে পারল না। 1974 সালের মাঝে সবাই স্ট্রিং থিওরির কথা মোটামুটি ভুলেই গেল।
জন শোয়ার্জ নামে একজন শুধু স্ট্রিং থিওরিকে ভুলে গেলেন না, তার কেন জানি মনে হলো এর ভেতরে গভীর কোনো ব্যাপার লুকিয়ে আছে। তিনি এবং তার সহকর্মীরা এর পিছনে লেগে রইলেন। কোয়ান্টাম মেকানিক্স ব্যবহার করে তিনি স্ট্রিং থিওরি ব্যাখ্যা করলেন এবং আবিষ্কার করলেন স্ট্রিং থিওরি থেকে ভর শূন্য এবং স্পিন 2 এক ধরনের কণা বের হয়ে আসার কথা। (স্পিন কণাদের একটা ধর্ম। আলোর কণা হচ্ছে ফোটন তার স্পিন হচ্ছে 1) কোনো এক্সপেরিমেন্টে কোথাও কখনো স্পিন 2 কণা পাওয়া যায় নি। সবাই ধরেই নিল স্ট্রং থিওরিতে সমস্যা রয়েছে।
জন শোয়ার্জ এবং তার সহকর্মী জোয়েলের তখন হঠাৎ একটা চমকপ্রদ ব্যাখ্যা কথা মনে হলো বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় বলের বাহক হচ্ছে ফোটন, সে-রকম ধরে নেয়া হয় মহাকর্ষ বলের বাহক হচ্ছে গ্রেভিটন। গ্রেভিটন কেউ কখনো দেখে নি, কিন্তু যদি এটা থেকে থাকে তাহলে এটি হবে ভরশূন্য এবং এর স্পীন হবে 2! শোয়ার্জ এবং জোয়েল তখন ভাবলেন পৃথিবীর কেউ যেটা পারে নি মহাকর্ষ বলকে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আওতায় আনা, তাহলে কী তারা সেই সম্ভাবনায় হাত দিয়েছেন? তারা তাদের কাজ জার্নালে প্রকাশ করলেন, ভেবেছিলেন বিজ্ঞানী মহলে হইচই পড়ে যাবে কিন্তু দেখা গেল কেউ গা করল না। সবাই ধরে নিল একটা মৃতপ্রায় থিওরিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে তারা চেষ্টা করে যাচ্ছেন!
স্ট্রিং থিওরিকে কোনো গুরুত্ব না দেওয়ার জন্যে বিজ্ঞানী মহলকে অবশ্যি দোষ দেওয়া যায় না। এর মাঝে তখন বড় বড় সমস্যা ছিল। গাণিতিক অসামঞ্জস্যতা ছিল, পদার্থবিজ্ঞানীরা এ রকম সমস্যাবহুল থিওরি নিয়ে মাথা ঘামাবেন সেটা কেউই আশা করে না।
