দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটি দিয়েছিলেন জর্জ গ্যামো। তার ব্যাখ্যাটি অনেক বেশি নাটকীয়। আমরা এখন যেহেতু দেখতে পাচ্ছি সবকিছু প্রবল বেগে একটি থেকে অন্যটি দূরে সরে যাচ্ছে, তার
অর্থ অতীতে নিশ্চয়ই সবকিছু এক জায়গায় ছিল। সঠিকভাবে বলতে গেলে বলতে হয় এক বিন্দুতে ছিল। তখন প্রচণ্ড এক বিস্ফোরণের ভেতর দিয়ে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হয় এবং সেই বিস্ফোরণের কারণে সবকিছু ছুটে যেতে শুরু করেছে এবং আমরা সেটাই দেখছি। এই ব্যাখ্যাটির নাম বিগ ব্যাং (Big Bang)। বোঝাই যাচ্ছে এ ধরনের একটা নাটকীয় ব্যাখ্যা শুনলেই আমরা ভুরু কুচকে নানা ধরনের প্রশ্ন শুরু করি, এত বড় বিশ্বব্রহ্মাণ্ড কেমন করে একটা বিন্দুতে থাকে, কেমন করে সেই বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণের আগে সেখানে কী ছিল, ইত্যাদি ইত্যাদি।
বোঝাই যাচ্ছে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড নিয়ে তো ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়, তাই কোন ব্যাখ্যাটি সত্য সেটা বের করা নিশ্চয়ই খুব সহজ একটা ব্যাপার হবে না। বিজ্ঞানীরা বুঝি আজীবন একটি কিংবা অন্যটির পক্ষে বিপক্ষে যুক্তিতর্ক দিয়ে ঝগড়াঝাটি করতে থাকবেন।
কিন্তু সেটি হয় নি, পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা অতি নাটকীয় বিগ ব্যাং ব্যাখ্যাটিই গ্রহণ করে নিয়েছেন। তার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি ঘটেছে 1965 সালে। আর্নো পেনজিয়া এবং রবার্ট উইলসন নামে বেল ল্যাবের দুজন বিজ্ঞানী একটা মাইক্রোওয়েভ এন্টেনা দিয়ে একটা নিখুঁত পরীক্ষা করতে গিয়ে খুব ঝামেলায় পড়ে গেলেন, তার এন্টেনাতে সব সময়েই একটা বিরক্তিকর সিগন্যাল এসে নিখুঁত পরীক্ষার মাঝে বাধা সৃষ্টি করতে লাগল। অনেক চেষ্টা করেও এই অনাকাঙ্ক্ষিত বিরক্তিকর সিগন্যালটা দূর করতে না পেরে বিজ্ঞানী দুজন হতাশ হয়ে বললেন, যেদিকেই এই এন্টেনাটি ব্যবহার করা যাক না কেন, সব দিক থেকেই এই সিগন্যালটি আসছে। মনে হচ্ছে পুরো পৃথিবী বা পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডটা যেন এই সিগন্যালে ডুবে আছে। বিজ্ঞানের ভাষায় বলা যায় পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের তাপমাত্রা হচ্ছে তিন ডিগ্রি কেলভিন।
ঠিক একই সময়ে মাইল বিশেক দূরে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু জ্যোতির্বিজ্ঞানী হিসেব করে বের করলেন বিগ ব্যাং এর প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটে থাকলে সেখানে প্রচণ্ড তাপমাত্রার সৃষ্টি হবে, এতদিন তার তাপমাত্রা কমে সেটি তিন ডিগ্রি কেলভিনে নেমে আসবে। খুব সহজেই পরীক্ষা করে এটা মাপা সম্ভব। কিছুদিনের মাঝেই তারা খবর পেলেন এই পরীক্ষাটি আসলে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। ইতোমধ্যে সেটা করা হয়ে গেছে। পরীক্ষার ফলাফলও প্রস্তুত।
কাজেই পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা এখন বিশ্বাস করেন আজ থেকে বিশ বিলিওন বৎসর আগে ভয়ংকর এক বিস্ফোরণের ভেতর দিয়ে আমাদের এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জন্ম হয়েছিল। বিজ্ঞানের জগতে নাটকীয় বিষয়ের স্থান খুব কম। কিন্তু বিগ ব্যাংয়ের মতো একটি অতি নাটকীয় বিষয় আমাদের বিজ্ঞানের মাঝে মনে হয় পাকাপাকিভাবেই ঢুকে গেছে।
.
20. সবকিছুর তত্ত্ব : স্ট্রিং থিওরি
পৃথিবীতে চার ধরনের বল রয়েছে। মহাকর্ষ বল, নিউক্লিয়ার বল, বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় বল এবং উইক (weak বা দুর্বল) বল। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রথম তিনটির কথা ঘুরে ফিরে চলে আসে, অনুমান করা যায় চতুর্থটির নাম আমরা সেরকম শুনতে পাই না। মহাকর্ষ বলের কারণে পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরে কিংবা আছাড় খেলে আমরা শূন্যে ঝুলে না থেকে ধরাম করে পড়ে যাই! নিউক্লিয়ার বল ব্যবহার করে নিউক্লিয়ার বোমা তৈরি করা হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় হিরোশিমা আর নাগাসাকিতে এই বোমা দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। আমরা সূর্য থেকে যে আলো আর তাপ পাই সেটাও আসে নিউক্লিয়ার বল থেকে। বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় বলের উদাহরণ অসংখ্য, আমাদের চারপাশে তার ছড়াছড়ি। ঘরের লাইট বালু বা গাড়ির ইঞ্জিন সবকিছুর মূলে এই বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় শক্তি। উইক বলের উদাহরণ দিতে হলে একটু মাথা চুলকাতে হয় কারণ আমাদের চারপাশে আমরা যা কিছু দেখি তার মাঝে চট করে সেরকম উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায় না। উইক বলের কারণে সূর্যের ভেতরে নিউট্রিনো নামে এক ধরণের কণা তৈরি হয়, সেগুলো প্রতি মুহূর্তে আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে চলে যায় আমরা কখনো টের পাই না! শুধুমাত্র চোখের ভিতর দিয়ে প্রতি সেকেন্ডে এক মিলিওন নিউট্রিনো চলে যাচ্ছে কেউ সেটা দেখছে না! কারণটি সহজ, উইক বল আসলেই দুর্বল। আসলেই এটা কোনো কিছুর সাথে বিক্রিয়া করে না।
বিজ্ঞানীরা সব সময়েই সবকিছু সহজ করে বোঝার চেষ্টা করেন। একটা সময় ছিল যখন চুম্বক এবং বিদ্যুৎকে আলাদা বলে মনে করা হতো। একসময় তারা দেখলেন যে আসলে এই দুটো আলাদা কিছু না, একই বলের দুটি ভিন্নরূপ। ঠিক একইভাবে তারা বিশ্বাস করেন প্রকৃতিতে যে চারটি বল রয়েছে সেগুলো আসলে আলাদা নয়, সেগুলো আসলে একই বলের ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এই বিশ্বাস নিয়ে কাজ করে ইতোমধ্যে তারা বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় বল এবং উইক বলকে একত্র করে ফেলেছেন, সেটার নাম দেয়া হয়েছে ইলেকট্রো উইক বল! কাজেই যদি শুরুতে যদি বলা হতো প্রকৃতিতে তিন ধরনের বল মহাকর্ষ, নিউক্লিয়ার এবং ইলেকট্রো উইক তাহলে ভুল হতো না! আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিদ্যুৎ চৌম্বকীয় এবং উইক বলকে আলাদাভাবে দেখি, তাপমাত্রা যদি অনেক বেশি হতো তা হলে সেটা আর আলাদা থাকত না এক হয়ে যেত। বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করেন তাপমাত্রা যদি আরও বাড়িয়ে দেয়া যেত তাহলে নিইক্লয়ার বল এবং ইলেকট্রো উহক বলও এক হয়ে যাবে এবং এই ধারণাটার নাম স্ট্যান্ডার্ড মডেল (Standard model)। পদার্থবিজ্ঞানের এটা বেশ গ্রহণযোগ্য একটা ধারণা।
