জন শোয়ার্জ আশা ছাড়লেন। । তার কাছে মনে হলো যদি এটা সত্যিকারের একটা থিওরি হয়ে থাকে তাহলে এর মাঝে কোনো অসামঞ্জস্য থাকার কথা নয়। পুরো তত্ত্বটা যদি নিখুঁতভাবে হিসেব করা যায় হয়তো দেখা যাবে একটা সমস্যা অন্য সমস্যাকে কাটাকাটি করে দিচ্ছে। সমস্যারা নিজেরা কাটাকাটি করে সমস্যাহীন নিখুঁত একট তত্ত্ব বের হয়ে আসবে! ব্যাপারটা খুব বিশ্বাসযোগ্য নয় কিন্তু জন শোয়ার্জ লেগে থাকলেন। এবারে তার সাথে যোগ দিলেন মাইকেল গ্রীন এবং দুজন মিলে প্রায় দশ বৎসর টানা পরিশ্রম করে তারা আবিষ্কার করলেন যে তাদের ধারণা সত্যি, সমস্যাগুলো একটা আরেকটাকে কাটাকাটি করে দূর হয়ে গেছে! কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কাছে পুরাপুরি গ্রহণযোগ্য এই স্ট্রিং থিওরি। 1984 সালে তাদের এই আবিষ্কারের কথা যখন বিজ্ঞানী মহলে প্রচারিত হলো তখন একসাথে সবার টনক নড়লো। মহাকর্ষকে নিয়ে সকল বলকে এক সূত্রে গাথার এই তত্ত্বটি নিয়ে এতদিন গবেষণা করছিলেন মাত্র দুজন, রাতারাতি সেখানে কয়েক হাজার গবেষক ঝাঁপিয়ে পড়লেন। (জন শোয়ার্জ তখন ক্যালটেকের প্রফেসর, আমিও তখন পোস্ট ডক্টরাল কাজে ক্যালটেকে যোগ দিয়েছি। বিজ্ঞানীদের সেই উত্তেজনা আমার খুব কাছে থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল!)
বোঝাই যাচ্ছে স্ট্রিং থিওরির বিষয়টা কোনো সহজ বিষয় নয়, কিন্তু ভেতরে মূল ভাবটা এমন কিছু কঠিন নয়। বিষয়টা এভাবে বোঝানো যায় :
আমরা যে কোনো জিনিস নিয়েই শুরু করি না কেন, সেটাকে যদি ভাংতে শুরু করি তাহলে একসময় আমরা পরমাণুতে পৌঁছে যাবে। (20.1নং ছবি) এই পরমাণুর একটা যদি আমরা ভালো করে পরীক্ষা করি তাহলে দেখব এর মাঝখানে রয়েছে নিউক্লিয়াস এবং সেই নিউক্লিয়াসকে ঘিরে ঘুরছে ইলেকট্রন। ইলেকট্রনকে আর ভাঙা সম্ভব নয়, ধরে নেয়া হয় সেটাই তার আদি রূপ, তার কোনো ব্যাপ্তি নেই, এটি একটি বিন্দুর মতো। তবে নিউক্লিয়াসকে আরো ভাঙা সম্ভব এবং তাহলে আমরা পাব–প্রোটন আর নিউট্রন। বিশ্বাস করা হয় প্রোটন এবং নিউট্রন তৈরি হয়েছে কোয়ার্ক দিয়ে। ইলেকট্রনের মতো কোয়ার্ককেও ধরে নেয়া হয় ব্যাপ্তিহীন একটা বিন্দুর মতো, এটাকে ভেঙে আর নূতন কিছু পাওয়া সম্ভব নয়।
স্ট্রিং থিওরি বলছে যে ইলেকট্রন বা কোয়ার্কদেরকে আমরা একটা বিন্দু বলছি কারণ আমরা সেটাকে খুব সূক্ষ্মভাবে দেখতে পাচ্ছি না। যদি এটাকে আরো সূক্ষ্মভাবে দেখতে পেতাম তাহলে দেখতাম এগুলো আসলে বিন্দু নয় সুতা দিয়ে তৈরি রিংয়ের মতো এক ধরনের আকৃতির বস্তু! এই রিংগুলো নানাভাবে কাঁপতে পারে এবং এর এক একটি কম্পন হচ্ছে (20.3 নং ছবি) সৃষ্ট জগতের এক একটি কণা! এতদিন বিশ্বাস করা হতো সৃষ্ট জগতের সবকিছু তৈরি হয়েছে তিন ধরনের কণার পরিবার দিয়ে। এই পরিবারের চার সদস্য, ইলেকট্রন, নিউট্রিনো, আপ কোয়ার্ক এবং ডাউন কোয়ার্ক। (আপ কোয়ার্ক এবং ডাউন কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি হয় নিউট্রন এবং প্রোটন) এ-রকম আরো দুটি পরিবার আছে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যার খোঁজখবর থাকার কথা নয়।
সৃষ্টির এই আদি রূপের সবগুলো আসলে একটি করে স্ট্রীং! এই স্ট্রীংয়ের এক এক ধরনের কম্পনের জন্যে এক একটি কণার জন্ম হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা যেভাবে সবকিছু একটি সূত্র দিয়ে প্রকাশ করতে পছন্দ করেন এটা হচ্ছে ঠিক সেরকম একটি সূত্র। সৃষ্টজগতের সবকিছু হচ্ছে স্ট্রিং বা সুতোর বাঁধন!
এত চমৎকার একটা তত্ত্ব দেয়ার জন্যে আমাদের নিশ্চয়ই কিছু মূল্য দিতে হয়েছে। সেই মূল্যটা কী?
মূল্যটা কিন্তু কম নয়। মূল্যটা অনেক বড়–আমাদের পরিচিত ত্রিমাত্রিক জগৎকে বিসর্জন দিতে হয়েছে। স্ট্রিং থিওরি যদি সত্যি হয় তাহলে আমাদের জগৎটি আসলে ত্রিমাত্রিক নয় এর আরো ছয়টি মাত্রা রয়েছে যেগুলো খুব ক্ষুদ্র জায়গায় কুকড়ে রয়েছে বলে আমরা দেখতে পাচ্ছি না! সামনে পিছনে এক মাত্রা ডানে বায়ে দুই মাত্রা এবং উপরে নিচে হচ্ছে তিন মাত্রা এই তিনটি নিয়ে আমাদের পরিচিত ত্রিমাত্রিক জগৎ! এর বাইরে আরো ছয়টি মাত্রা কীভাবে থাকবে কেউ কী কল্পনা করতে পারবে?
যেটা কল্পনাও করা যায় না সেটার অস্তিত্ব আছে এর চাইতে চমকপ্রদ ব্যাপার আর কী হতে পারে?
০৮. গ্রহ
21. ভূমিকম্প
1987 সালের অক্টোবর মাসের 1 তারিখ ভোরবেলা আমি বাথরুমে গিয়েছি হঠাৎ করে মনে হলো আমার পায়ের তলার মেঝেটি একটি জীবন্ত প্রাণীর মতো ছটফট করে সরে যেতে শুরু করেছে। আমি তখন দক্ষিণ ক্যালিফোরনিয়ার প্যাসাডিনা এলাকায় থাকি এবং সবাই জানে এই এলাকায় সান এন্ড্রিয়াস ফল্ট লাইনটির কারণে যে কোনোদিন এখানে একটা ভয়াবহ ভূমিকম্প হবে–আমার ধারণা হলো এটিই বুঝি সেটি। আমার ছোট ছেলে এবং স্ত্রীকে নিয়ে দোতলা থেকে নেমে বাইরে যাওয়ার জন্যে যখন ছুটছি তখন অবাক হয়ে আবিষ্কার করলাম ভয়ংকর ভূমিকম্পটি আমাকে করিডোরের এক পাশ থেকে অন্য পাশে ছুঁড়ে দিচ্ছে আমি এগুতেই পারছি না। কোনোভাবে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছি এবং দেখছি একটু পরপর ভূমিকম্প ছুটে আসছে ঢেউয়ের মতো। ভূমিকম্প যে মাটির উপর দিয়ে ছুটে আসতে পারে সেটি আমি এর আগে কখনো দেখি নি!
রিক্টর স্কেলে সেই ভূমিকম্পটি ছিল ছয়! ছয় ভয়াবহ ভূমিকম্প নয় কিন্তু এতেই প্যাসাডিনা এলাকার অনেক ফ্রী ওয়ে ধ্বসে পড়েছিল, মানুষজনও মারা গিয়েছিল। আমার দেখা এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভূমিকম্প এবং এটা দেখেই ভূমিকম্প বিষয়টির প্রতি আমার একটা শ্রদ্ধা মেশানো ভয়ের জন্ম হয়ে গেছে।
