ঘড়ি দেখে বললাম, ”আমার ট্রেনের সময় হয়ে গেছে, এবার কলকাতা ফিরব। মাঝে মাঝে এসে যদি গল্প করি, বিরক্ত হবেন না তো?”
”না না, রোজ আসুন, তা হলে তো বেঁচে যাই, সময় কাটতেই চায় না। বাড়ি থেকে রোজ রোজ বৌয়ের পক্ষে আসা তো সম্ভব নয়।”
চোখে মুখে কাতরতা ফুটে উঠতে দেখে, এই অমার্জিত কিন্তু সরল রাগী উদ্ধত লোকটির জন্য মায়া বোধ করলাম। ঘরের অন্য তিন জনের ভাবভঙ্গি দেখে বুঝলাম কেউই ওকে পছন্দ করে না। করার কথাও নয়। আমিও করতাম না। কিন্তু এমন একটা বন্য—প্রকৃতির শক্তির বিচ্ছুরণ ওর কণ্ঠস্বর, হাত বা মাথা নাড়া, চাহনি এবং মেজাজের দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ঘটে যাচ্ছিল, যেটা আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় বোধ হল। বললাম, ”বইটই পড়তে চান তো এনে দিতে পারি।”
”বই!” কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে বলল, ”নাহ, পড়তে—টড়তে ভালো লাগে না। একবার মোনবাগানের সঙ্গে খেলার আগের দিন রাত্রে—” থেমে গিয়ে একগাল হেসে বলল, ”সকালে আর উঠতেই পারি না। দারুণ ডিটেকটিভ গপ্পো, ছাড়তে পারিনি আর। সারারাত জেগে—”
”সেদিন খেলেছিলেন কেমন?”
”আরে খেলব কি, শুরু হবার দশ মিনিটের মধ্যেইতো ম্যাকব্রাইড আমায় মাঠ থেকে বার করে দিল। সামান্য পা চালিয়েছিলুম, অতি সামান্য, তেমন কিছু লাগেওনি। ফ্রি কিক দিয়েছে, বেশ ভালো কথা, কিন্তু সেইসঙ্গে মাঠ থেকে বারও করে দেওয়া?”
ওর গলায় প্রকৃত ক্ষোভ ফুটে উঠল। আমার দিকে যেভাবে তাকিয়ে, তাতে একটা কিছু মন্তব্য না করে উপায় নেই। বললাম, ”রেফারি বোধহয় নার্ভাস ছিল তাই বেশি কড়া হয়ে নিজেকে সামাল দিতে গিয়ে—”
”না না, ম্যাকব্রাইড খুব ভালো রেফারি, নার্ভাস হবার লোকই নয়। আসলে আমি ঠিক বুঝতে পারি না কোন পর্যন্ত গেলে, বুঝলেন, কোথায় নিজেকে আটকাতে হবে, একদমই জানি না। এতে আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমি অলিম্পিকে যেতে পারলুম না শুধু এই জন্যেই। তেল দিতে পারি না, জিবের আড় নেই। কত্তাদের মুখের ওপরই যাচ্ছেতাই করে বলতুম। খেলা দেখিয়ে টিমে আসব, ব্যাটাদের পা চেটে ব্যাকডোর দিয়ে নয়।”
ধীরে ধীরে বিষণ্ণ হয়ে এল বিজন দত্তের কণ্ঠস্বর। চাহনিতে অনুশোচনার আভাস দেখতে বললাম, ”তাইতো উচিত। পুরুষমানুষরা তো তাই করে। এতে আপনার বিবেক চিরদিন পরিষ্কার থাকবে, আপনি মাথা উঁচু করে চলতে পারবেন। আর রতন সরকারের মতো লোকেরা আপনাকে দেখে কেঁচো হয়ে যাবে।”
ওর মুখে চাপা সুখের আমেজ ফুটে উঠতে দেখলাম, সেইসঙ্গে চাপা রাগও। দাঁত চেপে বিড় বিড় করে বলল, ”একবার পাই … এখান থেকে আগে ফিরি।”
ফেরার সময় ট্রেনে বসে হঠাৎ খেয়াল হল, সারাক্ষণ আমি দাঁড়িয়েই ওর সঙ্গে কথা বলেছি। বিজন দত্ত আমায় বসতে বলেনি। মনে হল, ভদ্রতার অভাব নয়, আসলে ও সৌজন্যের ব্যাপারটা একদমই জানে না।
মাঝে মাঝে যেতাম ওর কাছে। লক্ষ্য করলাম আমার জন্য বিজন দত্ত অপেক্ষা করে। বিছানা থেকে ওঠার অনুমতি পেয়েছে, বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে থাকে। স্যানাটোরিয়াম গেটের কাছে আমায় দেখলেই বারান্দা থেকে হাত নাড়ে। টুলটা টেনে বসামাত্রই শুরু হয় অনুযোগ, কেন দু—দিন আসিনি। আমাকে ওর ভালো লেগে গেছে। আমরা বারান্দায় গিয়ে বসতাম, ও গল্প করে যেত—কুড়ি পঁচিশ বছর আগের কোনো একটি গোলের, খেলার, খেলোয়াড়দের, দারুণ কোনো জেতার কিংবা জোচ্চচুরির শিকার হয়ে হেরে যাওয়ার। ওর সমস্ত গল্পের মধ্যেই একটা কথা স্পষ্ট হয়ে উঠত—তুমি যেমন শক্ত ফুটবলও তেমনি শক্ত আর ফুটবল শক্ত যেহেতু জীবনটাই শক্ত।
একদিন গিয়ে দেখি, বিজন দত্ত বিছানায় শুয়ে, তার সামনে টুলে বসে তাঁতের রঙিন শাড়ি—পরা শ্যামবর্ণা স্থূলকায়া এক মহিলা। মুখখানি গোলাকার, কপালে বড় সিঁদুরটিপ, গলায় ও ঘাড়ে পাউডার, হাতে শাঁখা ও লোহা ছাড়া কিছু প্লাস্টিক চুড়ির সঙ্গে একগাছি সোনার চুড়িও। দেখেই বুঝলাম এ বিজন দত্তর স্ত্রী। বেশি বয়সেই বিয়ে করেছে বিজন দত্ত। একটিমাত্র ছেলে, বছর—দশেক বয়স। ”ব্যাটার পায়ে সট আছে, দু পায়েই।”—এর বেশি ছেলে সম্পর্কে কিছু বলেনি। স্ত্রী সম্পর্কে শুধু: ”ভাগ্যিস খেলা ছেড়ে দেবার পর বিয়েটা করেছি, নয়তো খেলা শিকেয় উঠত।”
মহিলার মুখের বিরক্তি আর বিজন দত্তর হাত নেড়ে অসহায় ভঙ্গিতে তাকে বোঝানোর চেষ্টা দেখে মনে হল, ওরা বোধহয় ব্যক্তিগত কোনো ব্যাপারের ফয়সালায় ব্যস্ত। আমাকে দেখতে পায়নি বিজন দত্ত। ওখান থেকেই আমি ফিরে গেলাম। পরদিন ওর সঙ্গে ঘণ্টাখানেক গল্প করলাম কিন্তু একবারও বলল না, কাল ওর স্ত্রী এসেছিল।
দিনচারেক পর, আমি টুলে বসে আছি, বিজন দত্ত বাথরুমে। দীর্ঘাঙ্গী এক বিধবা মহিলাকে ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ইতস্তত করতে দেখলাম। বয়স মনে হল পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। কাঁধে একটি থলি। চোখা নাকের দুপাশে দীর্ঘ চোখ। চাপা গলায় দরজার ধারের খাটে বইয়ে মগ্ন রোগীটিকে কী জিজ্ঞাসা করতেই সে আঙুল দিয়ে আমাকে দেখিয়ে দিল। আমার কাছে এসে মহিলা মৃদুকণ্ঠে বলল, ”বিজন দত্ত কি এই বেডের?”
”হ্যাঁ, বাথরুমে গেছেন, আপনি বসুন।” টুল ছেড়ে আমি উঠে পড়লাম। অপরিচিতার সঙ্গে চুপচাপ বসে থাকা অস্বস্তিকর, তাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালাম। মিনিটদুয়েক পরই বিজন দত্তর হর্ষোৎফুল্ল কণ্ঠ শুনলাম—”আরে মিনু।”
