মেইগ্রের মতোই, দেবু সব ব্যাপার একটু তলিয়ে বুঝতে চায়। ”সত্যসন্ধানী হওয়া উচিত মানুষ মাত্রেরই”, দেবু প্রায়ই বলে। ”যা কিছু ঘটছে বা ঘটবে তার পিছনে কারণ থাকবেই। সেটাই হল সত্য। সেটা খুঁজে বার না করলে শুধু আইন টাইন দিয়ে সমাধান হয় না।” আনন্দ বলেছিল, ”তা হলে একটা সমস্যার সমাধান করে দিন দেখি—আপনি যেখানে সেখানে কেন ঘুমিয়ে পড়েন?” দেবু থতমত হয়ে তারপর বলেছিল, ”ঠিক আছে, রিসার্চ করে তোকে জানিয়ে দোব।” চার দিন পরই দেবু একটা কাগজে তার গবেষণার ফল লিখে এনে আনন্দকে পড়ে শোনায়—”ভাতই হল মূল কারণ। তারপরই চিনি দিয়ে তৈরি খাদ্য, আলু প্রভৃতি যাবতীয় কার্বোহাইড্রেট। মানুষের অন্ত্রনালিতে এগুলো গেঁজে উঠে ইথেনল তৈরি করে। এই জিনিসটার কেমিক্যাল নাম ইথেইল অ্যালকহল। বেশি পরিমাণে ভাত, মিষ্টি ইত্যাদি খেলে অন্ত্রে বেশি পরিমাণ ইথেনল তৈরি হয় যার ফলে শরীর ভার লাগে, চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে।” তারপর দেবু বলে, ”এই ভাত খাওয়ার জন্যই বাঙালিরা কুঁড়ে। বুঝলি আনন্দ, আমি আজ থেকে ভাত খাওয়া ছেড়ে দিলুম। দুবেলা রুটি খাব।” আনন্দ খোঁজ নিয়ে জেনেছিল, তিন দিন পর্যন্ত সে ভাতের বদলে রুটি খেয়ে থেকেছিল। দেবুর আর এক অভ্যাস মাঝে মাঝে বলে ওঠা, ”আঃ, যদি লটারির একটা ফার্স্ট প্রাইজ পেয়ে যাই!”
মাস দুয়েক হল দেবু আর তাদের বাড়িতে আসে না। তার কারণটা এইরকম—কোর্টে সওয়াল করতে করতে অনাদিপ্রসাদ হাত বাড়ালেন দেবব্রতর দিকে। টেবলে লাল মলাটের বাঁধানো তিনখানা একই আকারের হৃষ্টপুষ্ট বই দেবব্রতর সামনে। হাত বাড়ালেই সে জানে পরের পর কোন বই অনাদিপ্রসাদের হাতে গছিয়ে দিতে হবে। দুরাত্রি জেগে তিনি বার করেছেন, ছত্রিশ বছর আগে মাদ্রাজ হাইকোর্টে ঠিক এইরকম মামলায় যে রায়টি দেওয়া হয়েছিল। বইয়ের সেই পাতায় ফ্ল্যাপ দেওয়া আছে। মামলায় সেই পুরনো রায়টা তাঁর পাশুপত অস্ত্র।
হাত বাড়িয়েও বইটা হাতে না আসায় অনাদিপ্রসাদ তাকালেন, এবং দেখলেন, দেবব্রতর চোখ বন্ধ, চিবুক নেমে এসেছে বুকের কাছে। চাপা গর্জন হল একটা। ধড়মড়িয়ে উঠে দেবব্রত চোখ খুলে দেখল প্রসারিত একটি হাত এবং তখনি টেবিল থেকে একটা লাল বই তুলে হাতে ধরিয়ে দিল।
নাটকীয় ভঙ্গিতে ফ্ল্যাপ দেওয়া পাতাটি খুলে পড়তে গিয়ে অনাদিপ্রসাদের ভ্রূকুঞ্চিত হল। এটা পরের মামলার জন্য দরকার। তিনি আবার হাত বাড়ালেন। দেবব্রত ব্যস্ত হয়ে আর একটা লাল বই দিল। হ্যাঁ, এইটাই, কিন্তু হায়, বইয়ে যে ফ্ল্যাপের টিকিও দেখা যাচ্ছে না। কীভাবে এখনি বার করবেন রায়টা। অনাদিপ্রসাদ ফ্যালফ্যাল চোখে জজের দিকে আর জ্বলন্ত চোখে দেবব্রতর দিকে তাকান। মাথা চুলকে দেবব্রত বলল, ”ফ্ল্যাপ তো স্যার দেওয়াই ছিল!কোথাও পড়ে টড়ে গেছে বোধহয়, আমি খুঁজে দেখছি।”
ফ্ল্যাপ খুঁজতে, কোর্ট রুম থেকে দেবব্রত দুমাস আগে সেই যে দ্রুতবেগে বেরিয়েছিল তারপর আজও প্রত্যাবর্তন ঘটেনি। আনন্দের বাড়ির ত্রিসীমানায় সে আর আসে না। কিছু বুঝে নেবার দরকার হলে আনন্দই যায় ওর বাড়িতে।
এখন নেতাজি পার্ক থেকে ফেরার পথে তার দেখা হল দেবব্রতর সঙ্গে। কালো কোট, সাদা টাউজার্স এবং হাতে একটা পেপারব্যাগ ডিটেকটিভ বই। কোর্ট থেকে ফিরছে।
”দারুণ মুশকিলে পড়ে গেছে রে মেইগ্রে।”
দেবুদা বইটা মাথার উপর তুলে নাড়তে লাগল। ”খুনি ওকে অফিসে ফোন করেছে, চিঠিও লিখেছে।”
”মুশকিলটা কোথায়!”
”খুনিটা মানসিক রোগে ভুগছে। বুঝলি না, এসব ক্ষেত্রে হয়তো আত্মহত্যা করে ফেলতে পারে।”
”যদি করেই, তাতে ক্ষতিটা কী? ধরা পড়লে তো ফাঁসিই হবে!”
”আহহা, বুঝছিস না। যদি আত্মহত্যা করে বসে, তা হলে তো কেউই জানতে পারবে না যে খুনিটাই মরেছে। প্যারিসে অমন কত লোকই তো রোজ মরছে। সুতরাং ওকে হাতেনাতে ধরতেই হবে। পাবলিককে দেখাতে হবে খুনি ধরা পড়েছে, নয়তো তারা নিশ্চিত হবে কী করে? এদিকে মেইগ্রেকে দুদিন মাত্র সময় দিয়েছে ম্যাজিস্ট্রেট।”
”কীসের সময়?”
”খুনিদের একটা সায়কোলজি আছে।” দেবুদা এধার—ওধার তাকাল, ”চল, হাঁটতে হাঁটতে বলছি। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে খুন নিয়ে আলোচনা করাটা ঠিক নয়। ভাল উকিল হতে হলে ডিটেকটিভের বুদ্ধি রাখতে হয়। তোর বাবা তো এসব বোঝেন না। শিবা দত্তের উকিল হয়ে সারাজীবন শুধু ভাড়াটেদের সঙ্গেই মামলা করে গেল। ব্রেইন… মেইগ্রের মতো ব্রেইন চাই উকিল হতে হলে।”
”কী যেন সায়কোলজির কথা বলছিলেন?”
”সায়কোলজি এমন ব্যাপার যা বই আর থিওরি দিয়ে বোঝা যায় না। জ্ঞান হয় বটে, কিন্তু ভাল স্কুলমাস্টার কি ঔপন্যাসিক কি একজন ডিটেকটিভ যতটা ভালভাবে মানুষকে বোঝে তেমন ভাবে বুঝতে পারা চাই।”
”উকিলদেরও তো তা হলে….”
”নিশ্চয়, নিশ্চয়।” দেবু হঠাৎ চুপ করে গেল একজন পথিককে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতে দেখে। একটু দ্রুত হেঁটে এগিয়ে গিয়ে বলল, ”তোর বাবার জুনিয়ার হয়ে থাকলে কোনও অভিজ্ঞতাই হবে না।”
”বাবা তো খুনের কেস করে না।”
”সেই জন্যই তো ছেড়েছি তোর বাবাকে।”
”কী যেন সায়কোলজি সম্পর্কে বলেছিলেন?”
”খুনিদের মনস্তত্ত্ব! যেখানে খুন হবে সেখানে ওরা আসবেই। যাকে খুন করেছে তার ফিউনারালে নিশ্চয় যাবে এটা ধরে নিয়ে মেইগ্রে এক ফটোগ্রাফারকে বলল সেখানে উপস্থিত যাবতীয় লোকের এলোপাথাড়ি ছবি তুলে যাও। যদি একটা লোককে বেশির ভাগ ছবিতে পাওয়া যায় তা হলে তার পিছনে লোক লাগাবে। পাওয়া গেল একটা মুখ। কিন্তু অতবড় শহরে ওই মুখের লোকটাকে কী করে খুঁজে বার করা যায়!”
