দুপুরে নতু সাহা তাকে জানাল, কাল রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে খেলা আছে। কমল বলল, ”শরীর খারাপ, খেলব না।”
গম্ভীর হয়ে নতু সাহা চলে গেল।
।।বারো।।
যুগের যাত্রীর পনেরোটা ম্যাচ খেলে আঠারো পয়েন্ট। মোহনবাগানের চৌদ্দটি খেলায় চব্বিশ, ইস্টবেঙ্গলের চৌদ্দটি খেলায় ছাব্বিশ, মহমেডানের পনেরোটি খেলায় পঁচিশ পয়েন্ট। আর শোভাবাজারের ষোলোটি খেলায় ছয় পয়েন্টে। লিগের প্রথমার্ধ শেষ হয়ে আসছে। ইতিমধ্যে ময়দানে গুলতানি শুরু হয়ে গেছে—দ্বিতীয় ডিভিশনে শোভাবাজার অবধারিত নামছে। বালী প্রতিভা, স্পোর্টিং ইউনিয়ন, জর্জ টেলিগ্রাফ, কালীঘাট দু—তিন পয়েন্টে শোভাবাজারের উপরে।
যুগের যাত্রীর সঙ্গে লিগের প্রথম খেলার আগের দিন, অফিসের লিফটে ওঠার জন্য কমল যখন দাঁড়িয়ে, পিছন থেকে একজন বলল, ”কমলবাবু, কাল খেলছেন তো?”
গলার স্বরে চাপা বিদ্রুপ বিচ্ছুরিত হল। কমল জবাব দিল না। প্রশ্নকারী তাতে উত্তেজিত হয়ে উঠল। এবার রেগে বলল, ”আরে মশাই, যেটুকু নাম এখনও লোকে করে সেটা ডুবিয়ে কোনও লাভ আছে? অনেক তো খেললেন সারা জীবনে।”
লিফটের দরজা খুলে গেল। লাইন দেওয়া লোকেরা ঢুকল, তাদের সঙ্গে কমলও। দরজা বন্ধ হবার সময় সে শুনতে পেল, লাইনে দাঁড়ানো প্রশ্নকারী সকলকে শুনিয়ে বলছে, ”বুঝলেন, এরাই ফুটবলের ইজ্জৎ নষ্ট করে।”
টিফিনের সময় কমল নিজের চেয়ার থেকে উঠল না। আবার কে তাকে শুনিয়ে বিদ্রূপাত্মক কথা বলবে কে জানে। একমনে মাথা নিচু করে সে কাজ করে চলেছে। চমকে উঠল যখন তার সামনে একটা লোক হাজির হয়ে বলল, ”কমল, আছ কেমন?”
মুখ তুলে কমল দেখল, যুগের যাত্রীর তপেন রায়। সঙ্গে সঙ্গে তার মনে পড়ল, একশো টাকা ধার নেওয়ার কথাটা—মুখটা পাংশু হয়ে গেল।
”খেলাটেলা কেমন চলছে, শুনলুম দারুণ প্র্যাকটিস করছ?” চেয়ার টেনে বসতে বসতে তপেন রায় বলল।
”তপেনদা, আপনার টাকাটা এখনও দিতে পারিনি, এবার মাইনে পেলেই দিয়ে দেব।”
”টাকা! কীসের টাকা?” তপেন রায় আকাশ থেকে পড়ল।
কমল আরও কুণ্ঠিত স্বরে বলল, ”মনে আমার ঠিকই আছে, তবে একবারে একশোটা টাকা দেওয়ার সামর্থ তো নেই।”
তপেন রায় কিছুক্ষণ কমলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে যেন অতি কষ্টে মনে করতে পারল। তারপর বলল, ”ও হো, সেই টাকাটা! আমি তো ভুলেই গেছলুম। আরে দূর, ওটা তোমার ফেরত দিতে হবে না।” তারপর গলা নামিয়ে ফিসফিস করে বলল, ”যাত্রীর কাছে কত টাকা তুমি পাও, সেটা তো আমি ভাল করেই জানি। তোমায় ঠকিয়েছে কী ভাবে তার সাক্ষী আমি ছাড়া আর কে! এ টাকা তো আর মামলা করে যাত্রী আদায় করতে পারবে না। যা পেয়েছ তাই নিয়ে নাও।”
মুহূর্তে কমল সাবধান হয়ে গেল। এতদিন ফুটবল খেলে সে মাঠের লোকদের চিনেছে। হঠাৎ তপেন রায়ের আবির্ভাব এবং খুবই বন্ধুর মতো কথাবার্তা তার ভাল লাগল না। সে সতর্ক স্বরে বলল, ”তারপর, কী মনে করে হঠাৎ…।”
”বলছি।” তপেন রায় সিগারেট বার করল, ধরাল এবং প্রথম ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ”যুগের যাত্রীকে কমল গুহ যে সার্ভিস দিয়েছে তা ভোলার নয়। কিন্তু যাত্রী তার বিনিময়ে তাকে কী দিয়েছে? কিছুই নয়। এই নিয়ে ক্লাবে অনেকে অনেক কথা বলেছে। কমিটি মিটিং ডাকা হয়েছিল। ঠিক হয়েছে, তোমাকে এবারের লিগের শেষ খেলার দিন মাঠেই পাঁচ হাজার টাকার চেক দেওয়া হবে।”
”যাত্রীর সঙ্গে লিগের শেষ খেলা কিন্তু শোভাবাজারের।”
”তাই না কি! তা হলে তো ভালই। কিন্তু সবার আগে তোমার অনুমতি চাই, তুমি গ্রহণ করবে কি না। অবশ্য বলে রাখছি, পরশু দিনই কমিটির একটা মিটিং আছে, ব্যাপারটা তখনই পাকাপাকি ঠিক করা হবে।”
কমল একদৃষ্টে তাকিয়ে দেখছিল তপেন রায়ের চোখ দুটি। অতি সরল। ভিতর থেকে আন্তরিকতা ঠিকরে বেরোচ্ছে। কমল মনে মনে হেসে বলল, ”কাল যাত্রীর সঙ্গে খেলার পর আপনাকে জানাব।”
”কাল তুমি খেলছ না কি?”
”হ্যাঁ।”
তপেন রায় ঘন ঘন সিগারেটে টান দিয়ে কী যেন ভাবতে ভাবতে বলল, ”এই বাজারে পাঁচ হাজার টাকার দাম কম নয়। বলতে গেলে এক রকম পড়েই পাওয়া। মাথা গরম করে হারিয়ো না এটা। যাত্রী তো নাও দিতে পারে, তবু দেবে বলে মনস্থ করেছে। এতে তোমাকে যেমন সম্মান দেওয়া হবে, তেমনি যাত্রীর উপরও প্লেয়ারদের কনফিডেন্স আসবে, তাই নয় কি?”
কমল ঘাড় নাড়ল।
”এখনকার ক্লাবগুলো যা হয়েছে, বুঝলে কমল, একেবারে নেমকহারাম। প্লেয়ারাও সেই রকম। পয়সা ছাড়া মুখে কোনও কথা নেই। কিন্তু যাত্রী তো সেরকম ক্লাব নয়। প্লেয়ারদের সঙ্গে আত্মার সম্পর্কে না থাকলে ক্লাব চলে না।” তপেন রায় আবেগ চাপতে গিয়ে চুপ করল। কমল কথা বলল না।
”তা হলে তুমি এখন বলবে না টাকা নিতে রাজি কি না?”
”না। কাল খেলার পর এ নিয়ে ভাবব।”
তপেন রায় চলে যাবার পর বিপুল ঘোষ গলা বাড়িয়ে বলল, ”পাঁচ হাজার টাকা! ব্যাপার কী?”
”পরীক্ষা দিলাম। স্টপার খেলি, নানান দিক থেকে আক্রমণ আসে। এটাও একটা।”
”তার মানে?”
”আমরা সবাই তো স্টপার ঘোষদা, কেউ মাঠের মধ্যে, কেউ মাঠের বাইরে। ঠেকাচ্ছি আর ঠেকাচ্ছি। এটাও ঠেকালাম—লোভকে। ঘুষ দেবার প্রস্তাব নিয়ে এসেছিল লোকটা। কাল ওদের টিমের সঙ্গে খেলা। আমাদের মজুমদার সাহেবের টিম। এবছর লিগ চ্যাম্পিয়ন হবার জন্য খেলছে, ভালই খেলছে। হয়তো হয়েও যাবে। কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হবার পথে যাতে একটিও কাঁটা না থাকে সেই ব্যবস্থা করতে এসেছিল। আমাকে ওরা একটা কাঁটা ভাবে।”
