আজ পুরো একটা বেঞ্চ খালি। মুরারিবাবু ঘড়ি দেখলেন। ছটা বেজে গেছে। আজ একটু বেশি হাঁটা হয়ে গেছে হয়তো। তাই ক্লান্তিটা যাচ্ছে না যেন। আরও মিনিট দশেক বসা যাক।
একটু পরে এক ভদ্রলোক এসে বেঞ্চটার অন্যপ্রান্তে বসলেন। একমাথা সাদা চুল। পাকানো গোঁফ। পরনে গিলেকরা আদ্দির পাঞ্জাবি আর ধাক্কাপাড় ধুতি। পায়ে চকচকে পামশু। হাতে একটা কালো ছড়ি। বেশ শৌখিন মনে হচ্ছিল তাকে। তাছাড়া মিঠে একটা সুগন্ধও টের পাচ্ছিলেন মুরারিবাবু। এ বয়সে সেন্ট মেখে মর্নিংওয়াক করতে বেরিয়েছেন ভদ্রলোক।
মনে-মনে হাসি এল মুরারিবাবুর। আড়চোখে ভদ্রলোককে লক্ষ করতে থাকলেন। এবার ভদ্রলোক পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার বের করলেন। তারপর সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়ার রিং পাকাতে থাকলেন।
কিছুক্ষণ পরে হঠাৎ সিগারেটটা জুতোর তলায় ঘষটে নিভিয়ে ভদ্রলোক উঠে দাঁড়ালেন এবং হন্তদন্ত হাঁটতে শুরু করলেন।
মুরারিবাবু অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলেন। ভদ্রলোক পার্কের গেট গলিয়ে বড়রাস্তার ফুটপাতে পৌঁছেছেন, সেই সময় মুরারিবাবুর চোখে পড়ল ওঁর কালো ছড়িটা। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ছড়িটা তুলে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,–ও মশাই! ও মশাই! আপনার ছড়িটা ফেলে গেলেন যে!
ভদ্রলোক যেন শুনতেই পেলেন না। ফুটপাতের ওখানেই বাসস্টপ। প্রায় খালি একটা বাস এসে গেল এবং উনি বাসে উঠে গেলেন। বাসটা তক্ষুনি গর্জন করতে করতে জোরে চলে গেল।মুরারিবাবু ছড়িটা হাতে নিয়ে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
কালো ছড়িটা ওই ভদ্রলোকের মতোই শৌখিন বলা যায়। হাতলওয়ালা ছড়ি। হাতলে রুপোলি নকশা আছে। বাকি অংশ মসৃণ। তলার দিকটা ইঞ্চিটাক রুপোলি খাপে মোড়া।
মুরারিবাবু অগত্যা ছড়িটা নিয়ে বাড়ি ফিরলেন। কাল মর্নিংওয়াকে গিয়ে যদি ওঁর দেখা পান, ফেরত দেবেন। কাল যদি দেখা না পান, পরশুও ছড়িটা নিয়ে যাবেন। যতদিন না ওঁর দেখা পান, ততদিন এটা সঙ্গে নিয়ে মর্নিংওয়াকে বেরুবেন।…
সেদিন রাত্রে কী একটা শব্দে ঘুম ভেঙে গেল মুরারিবাবুর।
তারপর ঝাঝালো মিঠে সুগন্ধ টের পেলেন তিনি। প্রথমে ভাবলেন মনের ভুল। পরে বুঝলেন, মনের ভুল নয়। ঘরে সত্যিই সুগন্ধ মউ-মউ করছে। আজ ভোরবেলা পার্কের সেই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়ে গেল। ঠিক এই গন্ধটাই তখন টের পেয়েছিলেন মুরারিবাবু।
কিন্তু সেই সুগন্ধ এই ঘরের ভেতর কেন?
চমকে উঠে মুরারিবাবু সুইচ টিপে টেবিল ল্যাম্প জ্বেলে দিলেন। তারপর মশারি থেকে বেরিয়ে সুইচ টিপে টিউবলাইটটাও জ্বাললেন।
ঘরে তিনি ছাড়া দ্বিতীয় মানুষ নেই। থাকবেই বা কেমন করে? মশার জন্য মাথার দিকের দুটো জানালা সন্ধ্যার আগে বন্ধ করে দেন মুরারিবাবু। পায়ের দিকে অর্থাৎ বাড়ির ভেতর দিকের দুটো জানালার মধ্যে একটা বন্ধ করেন, অন্যটা শুধু খোলা থাকে। পাশের ঘরে যাওয়ার দরজা এবং বারান্দায় যাওয়ার দরজা ভেতর থেকে বন্ধ আছে। তাহলে সুগন্ধটা কি ভেতরের বারান্দা থেকে আসছে!
সেই খোলা জানালার দিকে পা বাড়াতে গিয়ে হঠাৎ তার চোখে পড়ল, দেয়ালের ব্র্যাকেটে হাতল আটকে সেই কালো ছড়িটা ঝুলিয়ে রেখেছিলেন, সেটা নেই।
অমনি বুক ধড়াস করে উঠল মুরারিবাবুর। ছড়িটা গেল কোথায়?
অবশ্য তত ভিতু মানুষ তিনি নন। রেলের চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর এই পৈতৃক একতলা বাড়িতে বসবাস করছেন মুরারিবাবু। যখন তিনি চাকরি করতেন, তখন তাঁর বিধবা দিদি এই বাড়িতে একমাত্র ছেলে নকুলকে নিয়ে থাকতেন। মুরারিবাবু রিটায়ার করার আগেই নকুলকে রেলে একটা চাকরি জুটিয়ে দিয়েছিলেন। এতদিনে নকুল কোয়ার্টার পেয়ে তার মাকে নিয়ে গেছে। কাজেই মুরারিবাবু এ বাড়িতে একা থাকেন। স্বপাক খান। বরাবর তিনি স্বাবলম্বী মানুষ। জীবনে কখনও ভূতপ্রেত দেখেননি। ভূতপ্রেত আছে না নেই, তা নিয়ে কখনও মাথা ঘামাননি। অবশেষে এই বয়সে যে এমন একটা ভুতুড়ে ঘটনার মধ্যে তাকে পড়তে হবে, কোনওদিন কল্পনাও করেননি।
মাথা ঠান্ডা রেখে মুরারিবাবু ঘটনাটা বুঝতে চাইলেন। এ তো একটা অদ্ভুত অবিশ্বাস্য ব্যাপার। ভোরবেলা পার্কে দেখা সেই ভদ্রলোক জলজ্যান্ত মানুষ। রহস্য যেটুকু ছিল, সেটুকু তার আকস্মিক চলে যাওয়া নিয়ে। কিন্তু এখন রহস্যটা রীতিমতো ঘোরালো হয়ে উঠল যে!
একটু পরে মুরারিবাবু টের পেলেন, ঝাঁকে ঝাঁকে মশা তার দুপায়ে যথেষ্ট হুল ফোঁটাচ্ছে। এই তল্লাটে মশার উৎপাত প্রচণ্ড। দেয়ালের সুইচ টিপে টিউবলাইট বন্ধ করে মুরারিবাবু মশারির ভেতর ঢুকে পড়লেন। তিনি এখন মরিয়া। যা ঘটে ঘটুক, তিনি গ্রাহ্য করবেন না। কিছুক্ষণ পরে মশারির ভেতর থেকে হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্পের সুইচ অফ করলেন মুরারিবাবু।
মাথার ওপর নতুন সিলিংফ্যান নিঃশব্দে ঘুরছিল। সুগন্ধটা তখনও মউমউ করছিল। সেই সুগন্ধে যেন কী মাদকতা আছে। মাদকাচ্ছন্ন অবস্থায় ঘুমে তলিয়ে গেলেন রেলের এক প্রাক্তন গার্ড মুরারিমোহন ধাড়া…
ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া থাকে। ভোর পাঁচটায় সেই অ্যালার্ম বাজলে মুরারিবাবুর ঘুম ভেঙে গেল। অভ্যাসমতো শশব্যস্তে উঠে পড়লেন তিনি। তারপরই মনে পড়ে গেল রাত্রের সেই অদ্ভুত ঘটনার কথা। কিন্তু নাহ! এখন ঘরে সেই সুগন্ধ নেই।
আর কী আশ্চর্য, সেই কালো ছড়িটা ব্র্যাকেটেই ঝুলছে। তাহলে কি তিনি একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছেন?
