মাত্র দুটাকায় একটা বেতের ছড়ি পাওয়া গেল। ছাতার বাঁটের মতো বাঁকানো হাতল আছে। ছড়িটা বগলদাবা করে মাছভর্তি থলে ঝুলিয়ে ছোটমামা হাঁটতে থাকলেন। আমি তাঁর কাছ ঘেঁষে হাঁটছিলুম। কিছুক্ষণ চলার পর অন্ধকার স্বচ্ছ মনে হল। শরৎকালের আকাশে নক্ষত্ররা উজ্জ্বল হয়।
ছোটমামা একটু হেসে বললেন,-বুঝলি পুঁটু! ঠিক এমনি একটি ছড়ি সিঙ্গিমশাইয়ের আছে। দেখিসনি তুই?
বললুম, সিঙ্গিমশাই সবসময় ছড়ি হাতে নিয়ে হাঁটেন কেন ছোটমামা?
—ওটা স্টাইল! বুঝলি পুঁটু! সব মানুষ বুড়ো হলেই ছড়ি নিয়ে হাঁটে না। তোর ঠাকুরদা তো বুড়োমানুষ। তার হাতে ছড়ি দেখেছিস?
–না ছোটমামা!
—তাহলেই বুঝে দ্যাখ পুঁটু! সিঙ্গিমশাইয়ের ছড়ি হাতে হাঁটাটা আসলে স্টাইল! আমিও সেইরকম স্টাইলে হাঁটছি, দ্যাখ!
বলে ছোটমামা বাঁ-হাতে মাছের থলে নিয়ে ডানহাতে ছড়ির হাতল ধরে অবিকল সিঙ্গিমশাইয়ের মতো মাটিতে ছড়ির ডগা ঠেকালেন। তারপর হাঁটতে শুরু করলেন।
একটু পরে দেখি, ছোটমামা মাটির রাস্তায় জোরে হাঁটতে শুরু করেছেন। আমি দৌড়ে তাঁর নাগাল পাচ্ছি না। রাগ করে চেঁচিয়ে বললুম,—ছোটমামা! অত জোরে হাঁটছেন কেন?
ছোটমামা সামনের দিক থেকে কেন যেন কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন,আমি কি জোরে হাঁটছি রে পুঁটু? ছড়িটা আমাকে হাঁটাচ্ছে। মানে, ছড়িটা টেনে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে! এই! এই ছড়ি! আস্তে আস্তে!
আমি যথাসাধ্য দৌড়ে গিয়ে বললুম,—ছোটমামা! ছোটমামা! আমি দৌড়ুতে পারছিনে।
—ওরে পুঁটু! ছড়িটা সর্বনাশ! এই! এই ব্যাটাচ্ছেলে! রাস্তা ছেড়ে এদিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?
বলে ছোটমামা চ্যাঁচাতে থাকলেন,—পুঁটু! পুঁটু! আমাকে ছড়িটা ধানক্ষেতের আলে টেনে নিয়ে যাচ্ছে রে!
ততক্ষণে পিছনে উঁদ উঁকি দিয়েছে আবছা, জ্যোৎস্নায় দেখলুম, ছোটমামা বাঁ-দিকে ধানক্ষেতের মধ্যে দিয়ে চলেছেন। চেঁচিয়ে বললুম,—ছোটমামা! ছড়িটা ফেলে দিচ্ছেন না কেন? এক্ষুনি ছড়িটা ফেলে দিন!
ছোটমামার করুণ চিৎকার শোনা গেল,—ওরে পুঁটু! ছড়ির হাত থেকে হাত ছাড়াতে পারছি না যে!
আতঙ্কে, দুর্ভাবনায় আমি এবার চেঁচিয়ে বললুম,ছোটমামা! গঙ্গারামের কাটামুণ্ডুকে ডাকুন।
কথাটা আমার মাথায় কেমন করে এসেছিল কে জানে! আমার কথাটা শুনেই বাঁ-দিকে খানিকটা দূরে ধানক্ষেতের মধ্যে ছোটমামা এবার হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, ওরে গঙ্গারাম! গঙ্গারাম তোর কাটামুণ্ডুটা নিয়ে আয় তো! ছড়ি ব্যাটাছেলের মুন্ডু কেটে তোর মতো করে ফেলবি গঙ্গারাম! ওরে কাটিহারের গঙ্গারাম। শিগগির আয়
রে!
তারপরই ছোটমামার হাসি শুনতে পেলুম। আবছা জ্যোৎস্নায় ছোটমামাকে হাসতে-হাসতে ফিরে আসতে দেখলুম। তিনি বলছিলেন—কেমন জব্দ? আঁ? গঙ্গারামের কাটামুণ্ডুকে ডাকতে ছড়িটা আমার হাত থেকে খসে ডিগবাজি খেতেখেতে পালিয়ে গেল!
ছোটমামার প্যান্টের নিচের দিকটা শিশিরে আর ঘাসের কুটোয় নোংরা হয়ে গেছে। ভিজে জবজব করছে। তিনি আমার কাছে এসে হাঁপাতে-হাঁপাতে বললেন, ওঃ, কী সর্বনেশে ছড়ির পাল্লায় পড়েছিলুম রে পুঁটু! ভাগ্যিস, তুই বুদ্ধি করে গঙ্গারামের কাটামুণ্ডুর কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলি।
বললুম,—ছোটমামা! কিন্তু গঙ্গারামের কাটামুণ্ডুকে ছড়ির ভূত অত ভয় পেল কেন?
ছোটমামা বললেন,বুঝতে পারিসনি পুটু? ছড়ির ভূত নিশ্চয় ম্যাজিকের তাবুতে গঙ্গারামের কাটামুণ্ডু দেখেছিল।
এরপর ছোটমামা আমাকে মাছের থলে দিয়ে জুতোদুটো খুললেন তারপর প্যান্ট গুটিয়ে জুতো বাঁ হাতে নিয়ে হাঁটতে থাকলেন। ততক্ষণে জ্যোৎস্না উজ্জ্বল হয়েছে। জিগ্যেস করলুম, ছড়িটা অমন করে আপনাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল কেন?
ছোটমামা বললেন,—সেটাই তো বুঝতে পারছি না রে পুঁটু! ভূত কি ছড়ি হতে পারে? আমার মনে হচ্ছে, ওটা কোনও ভূতের ছড়ি! বুঝলি? ছড়িওয়ালা কোনও মরা মানুষের ছড়ি সস্তায় কিনে আমাকে বেচেছিল।
কথাটা বলেই ছোটমামা থমকে দাঁড়ালেন। জিগ্যেস করলুম,কী হল ছোটমামা?
—ওই দ্যাখ! দেখতে পাচ্ছিস? ছড়ি ব্যাটাচ্ছেলে আমাদের আগে-আগে খুটখুট শব্দ করে হেঁটে চলেছে।
ভয় পেয়ে বললুম,—ছোটমামা! ছড়ি হাঁটছে না। ভূত ছড়ি হাতে নিয়ে হাঁটছে।
এবার ছোটমামা হুংকার দিয়ে বললেন,আয় তত পুঁটু! দেখি ব্যাটাচ্ছলেকে। এখনও এত সাহস!
ছোটমামা বোকামিই করে ফেলতেন, কারণ ছড়িটা ডিগবাজি খেতে-খেতে তার দিকে আসছিল। আমি চেঁচিয়ে উঠলুম,—গঙ্গারাম! গঙ্গারাম! তোমার কাটামুণ্ডু নিয়ে এসো শিগগির!
অমনি দেখলুম ছড়িটা পাশের ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে উধাও হয়ে গেল। ছোটমামা বললেন,ধ্যাত্তেরি! কথাটা আমার কিছুতেই মনে থাকছে না। পুঁটু। আমরা দুজনে এবার গঙ্গারামের কাটামুণ্ডুর জয় দিতে-দিতে হাঁটি!
বলেই ছোটমামা স্লোগানের সুরে হাঁকলেন,–গঙ্গারামের কাটামুণ্ডু কী? আমি চেঁচিয়ে বললুম,—জয়!
–গঙ্গারামের কাটামুণ্ডু!
এমন স্লোগান ওই বয়সে কত শুনতুম, তাই চেঁচিয়ে বললুম,অমর রহে। অমর রহে।
-–গঙ্গারামের কাটামুণ্ডু!
—জিতা রহে! জিতা রহে!
—কাটিহারের গঙ্গারাম কী?
—জয়!
বাড়ি ঢােকার মুখে ছোটমামা মুচকি হেসে বলেছিলেন, ভাগ্যিস ছড়ির ভূতটা প্রফেসর বংকারামের ম্যাজিক দেখতে ঢুকেছিল। নইলে তোর ঠাকুরদার খয়রা মাছ আর খাওয়া হতো না। কাটামুণ্ডু দেখে ভূতটাও ভয় পেয়েছিল।
কিন্তু ম্যাজিক দেখতে আমরা না ঢুকলে আমাদের দুজনের অবস্থাটা কী হতো, সেটা আর ছোটমামাকে বলিনি।
কালো ঘোড়া
ব্যাপারটা নিছক স্বপ্ন, নাকি সত্যি সত্যি ঘটেছিল, বলা কঠিন। শুধু এটুকুই বলতে পারি, এ ঘটনা আমি মোটেও বানিয়ে বলছি না। যা-যা ঘটেছিল, অবিকল তাই-তাই বর্ণনা করছি।
