টুকাই হেসে অস্থির হল। ম্যাজিশিয়ান-মামা খুব আমুদে মানুষ, তা সে বরাবর দেখেছে। বলল, আচ্ছা ম্যাজিশিয়ান-মামা, ভূতেরা কি ম্যাজিক দেখাতে পারে?
–হুঁ-উ! খুব পারে। তবে ভূতের ম্যাজিক তো। আরও অদ্ভুত। দেখবে নাকি? বলে ম্যাজিশিয়ান-মামা প্যাচালো নাট থেকে বন্টু খোলার মতো নিজের প্রকাণ্ড মাথাটা কয়েক পাক ঘুরিয়ে দিলেন। অমনি তার মুণ্ডু বাই-বাই করে ঘুরতে থাকল। টুকাই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখছিল। এতক্ষণে তার গা ছমছম করতে লাগল। চোখদুটো বড় হয়ে উঠল। এ যে বড় সাঙ্ঘাতিক ম্যাজিক।
ম্যাজিশিয়ান-মামার মুণ্ডুর ঘূর্ণি থামল। তখন চোখ নাড়িয়ে বললেন, কেমন ম্যাজিক? এর নাম হল হল মুত্যু। এবার এইটে দেখো। এ আমার নতুন ম্যাজিক। এর নাম হল জ্বলন্ত মোমবাতি ভক্ষণ।
এবার উনি আস্ত মোমবাতিটা মুখে পুরে কোত করে গিলে ফেললেন। ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। টুকাই ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল,-ম্যাজিশিয়ান-মামা! ম্যাজিশিয়ান মামা!
মোমবাতিটা হঠাৎ ম্যাজিশিয়ান-মামার টাক ফুঁড়ে বেরুল। ঘর আলোকিত হল আগের মতো। উনি ফিক করে হেসে বললেন, ভয় পেয়েছিলে বুঝি? এটা তত কিছু ভয়ের না। তবে এই তিন নম্বর খেলাটা…
টুকাই চেঁচিয়ে উঠল ফের, আর না। আর না। তারপর সটান দরজা দিয়ে ছিটকে বেরুল এবং বারান্দা থেকে এক লাফে নেমে গেট পেরিয়ে দৌড়-দৌড়! এ কখনও ম্যাজিক নয়। এ যে বড্ড ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানা। মুনৃত্য, জ্বলন্ত মোমবাতি ভক্ষণ; তারপর তিন নম্বরটা হয়তো টুকাই ভক্ষণ। বাপস!…
পরদিন স্কুলে কুট্টুসের সঙ্গে দেখা। কুট্টুসকে কিছু বলার আগেই সে চোখ পাকিয়ে তেড়ে এল। টুকাই আর কখনও তোকে বই দেব না। অমন করে জানলা গলিয়ে বইটা ছুঁড়ে ফেলে এসেছিস। মলাট ছিঁড়ে কী অবস্থা হয়েছে দেখেছিস?
টুকাই কঁচুমাচু মুখে বলল, যাঃ! ছুঁড়ে দিয়ে আসব কেন? বইটা তো তোর ম্যাজিশিয়ান-মামাকে দিয়ে এসেছিলুম। উনিই দেখতে নিলেন যে!
কুট্টুস আরও খাপ্পা হয়ে বলল,-চালাকির জায়গা পাসনি? ওঁকে কোথায় পেলি? ম্যাজিশিয়ান-মামা তো আমেরিকায় ম্যাজিক দেখাতে গেছেন। এখন সানফ্রান্সিসকোতে ম্যাজিক দেখাচ্ছেন। কাগজে ছবি বেরিয়েছে না?
টুকাই ঢোক গিলে বলল, তাহলে কাল সন্ধেবেলা তোদের বাড়িতে কাকে দেখলুম রে?
কুট্টুস ঘুষি পাকিয়ে বলল,–ফের চালাকি?
টুকাই চুপচাপ কেটে পড়ল তার সামনে থেকে। হুঁ, খুব বেঁচে গেছে কাল সন্ধেবেলা। তবে দোষ তো কুট্টুসদেরই। কবরখানার কাছে বাড়ি খালি রেখে অমন করে–নেমন্তন্ন খেতে যায় কেউ?…
যার যা খাদ্য
শহরের বাইরে নদীর ধারে এই বাড়িটা অনেকদিন খালি পড়েই ছিল। মুরারিবাবু চাকরি থেকে রিটায়ার করার পর বাড়িটা কিনেছেন। নিরিবিলি নিঃঝুম জায়গা। গাছপালা, ঝোঁপজঙ্গল আনাচে কানাচে প্রচুর। মুরারিবাবুর হই-চই পছন্দ হয় না। তাই বাড়িটা খুব পছন্দ হয়েছিল।
কিন্তু বাস করতে গিয়েই ঝামেলায় পড়লেন। রাত দুপুরে উঠোনে টুপ-টুপ করে ঢিল পড়ে। ছাদে কারা হেঁটে বেড়ায় ধুপ-ধুপ-ধুপ-ধুপ। বেরিয়ে গিয়ে টর্চের আলোয় খোঁজাখুঁজি করেন। কাকেও দেখতে পান না। প্রথমে ভেবেছিলেন, দুষ্ট লোকের কাজ। তাকে তাড়ানোর মতলব করছে। তাই থানায় গিয়েছিলেন। দুজন পালোয়ান চেহারার সেপাই পাঠানো হয়েছিল রাতে বাড়ি পাহারা দিতে। কিন্তু তাতেও টিলপড়া বা ছাদে হাঁটাচলার শব্দ বন্ধ হয়নি। বরং ঘুম ভেঙে শোনেন, সেপাই দুজনে পরস্পর তুমুল ঝগড়া করেছে। এ ওকে বন্দুক তুলে শাসাচ্ছে। ব্যাপারটা কী?
বেরিয়ে গিয়ে মুরারিবাবু দুজনকে শান্ত করেছিলেন। কিন্তু কারুর রাগ পড়ে না। একজন আর একজনের দিকে আঙুল তুলে বলে,–ও আমার গোঁফ টেনেছে। আরেকজন বলে,-মিছে কথা! ও আমার কানের লতিতে কামড়ে দিয়েছে।
সেই সময় আচমকা একটা বিদঘুঁটে ব্যাপার ঘটে গেল। তিনজনের মাথায় তিনটে অদৃশ্য হাতের চাঁটি পড়ল। চাটিগুলো একেবারে বরফের মতো ঠান্ডা।
এমন টি খাওয়ার পর কি এ বাড়ির ত্রিসীমানায় থাকার হিম্মত থাকে কারুর? সেপাই দুজন সেই রাতেই রাম-রাম বলে চ্যাঁচিতে-চ্যাঁচিতে পালিয়ে গিয়েছিল। মুরারিবাবুও চটপট ঘরে ঢুকে দরজায় খিল এঁটেছিলেন। টের পেয়েছিলেন ব্যাপারটা নিছক ভৌতিক।
কিন্তু এমন পছন্দসই একটা বাড়ি কিনে নেহাত ভূতের ভয়ে চলে যাওয়া কাজের কথা না। বোঝা যাচ্ছে বাড়িটা পোডড়া হয়েছিল বলে ভূতেরা এসে আশ্রয় নিয়েছিল। এখন দখল ছাড়তে চাইছে না।
মুরারিবাবু তাই ঠিক করলেন ভূতগুলোকে তাড়াতে হবে, এ কাজ ওঝা ছাড়া আর কারুর নয়। এখানে ওখানে খোঁজাখুঁজির পর এক ওঝার নাম-ঠিকানা পাওয়া গেল।
তার নাম হরিপদ। থাকে রামনগরে। ঘুঘুডাঙা থেকে বাসে ঘণ্টা তিনেকের পথ। হরিপদর খুব নামডাক আছে নাকি। তার মন্তরটন্তরের চোটে ওই এলাকা থেকে সব ভূত পালিয়ে গেছে। বাড়ি খালি থাকলেও সেখানে বড়জোর বাদুড়, চামচিকে বা আরশোলা, টিকটিকি গিয়ে জোটে। ভূতের ঢোকার সাধ্য নেই। আহা, ঘুঘুডাঙার হরিপদ এসে থাকলে কী শান্তিতে না থাকা যেত।
অনেক ফিকির মাথায় নিয়েই মুরারিবাবু রামনগর চললেন। হরিপদকে মাইনে দিয়ে বরং কাছে রাখবেন। টুকিটাকি কাজকর্ম করবে আর থাকবে তার কাছে। বরাবরের জন্য ভূতের হাতে থেকে নিশ্চিন্তে থাকা যাবে।
