আধা ঘণ্টার মধ্যেই সামারভিল এসে পড়ল। ইতিমধ্যে কখন যে বৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে, সেটা খেয়াল করিনি; সেটা বুঝলাম সামারভিলকে ভিজে বিষতি খুলতে দেখে। বলল, আগে কফি আনাও, তারপর কথা হবে।
কথাটা বলে সেও গ্রোপিয়াসের মতো মিনিটখানেক ধরে আমার দিকে চেয়ে রইল। এ ব্যাপারটা প্রায় আমার গা-সওয়া হয়ে যাচ্ছে, যদিও সামারভিলের প্রতিক্রিয়া হল অন্যরকম। তোমার চাহনিতে কোনও পরিবর্তন দেখছি না শঙ্কু। আমার বিশ্বাস তুমি সম্পূর্ণ সুস্থ।
আমি এত দিনে নিশ্চিন্তির হাঁপ ছাড়লাম।
কফি আসার পর সামারভিলকে আজকের সারা দিনের ঘটনা বললাম। সব শুনে সে বলল, আমি গত ক দিনে পুরনো জামান বৈজ্ঞানিক পত্রিকা ঘেঁটে গ্রোপিয়াসের কয়েকটা প্ৰবন্ধ আবিষ্কার করেছি। গত দশ বছরের মধ্যে সে কোনও লেখা লেখেনি, কিন্তু তার আগে লিখেছে।
কী সম্বন্ধে লিখেছে?
তার ব্যর্থতা সম্বন্ধে।
কী রকম? কীসের ব্যর্থতা?
এর উত্তরে সামারভিল যা বলল তাতে যে আমি শুধু অবাকই হলাম তা নয়; এর ফলে সমস্ত ঘটনোটা একটা নতুন চেহারা নিয়ে উপস্থিত হল আমার সামনে। সে বলল–
তোমার তৈরি অমনিস্কোপ, তোমার ধন্বন্তরি ওষুধ মিরাকিউরল, তোমার লিঙ্গুয়াগ্রাফ, তোমার এয়ারকন্ডিশনিং পিল-প্রত্যেকটি জিনিসই গ্রোপিয়াসের মাথা থেকে বেরিয়েছিল। দুঃখের বিষয় প্রতি বারই সে জেনেছে যে তার ঠিক আগেই তুমি এগুলোর পেটেন্ট নিয়ে বসে আছে। অর্থাৎ প্রতিভার দৌড়ে প্রতি বারই সে তোমার কাছে অল্পের জন্য হার মেনেছে। দশ বছর আগে তার শেষ প্রবন্ধে যে অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেছে যে কোনও বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের জন্য খ্যাতিলাভের ব্যাপারটা নেহাতই আকস্মিক। প্রাচীন পুঁথিপত্র ঘেঁটে ও এর নজিরও দেখিয়েছে–যেমন মাধ্যাকর্ষণের ব্যাপারে খ্যাতি হল নিউটনের, কিন্তু তারও ত্রিশ বছর আগে ইতালির বৈজ্ঞানিক ফ্রাতেল্লি নাকি এই মাধ্যাকর্ষণের কথা লিখে গেছেন।
আমি বললাম, ঠিক সেইভাবে বেতার আবিষ্কারের কৃতিত্ব আমাদের জগদীশ বোসের কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছেন মার্কনি।
এগজ্যোক্টলি, বলল সামারভিল। কাজেই গ্রোপিয়াস যদি তোমার প্রতি বিরূপভােব পোষণ করে তা হলে আশ্চর্য হয়ে না।
তা তো বুঝলাম, কিন্তু এতে দ্বিতীয় শঙ্কুর রহস্যের সমাধান হচ্ছে কীভাবে?
প্রশ্নটি করাতে সামারভিল গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, তোমার সঙ্গে গ্রোপিয়াসের শেষ দেখা হয়েছিল বাগদাদে সাত বছর আগে। তারপর থেকে সে আর কোনও বিজ্ঞান সম্মেলনে যায়নি। এই প্রথম গত মে মাসে ইন্সব্রুকে তারই উদ্যোগে আয়োজিত বিজ্ঞানী সম্মেলনে সে যোগদান করে। আর–
আমি সামারভিলকে বাধা দিয়ে বললাম, কিন্তু এই সম্মেলন থেকে আমি কোনও চিঠি পাইনি।
সে তো পাবেই না। কিন্তু গ্রোপিয়াস নিশ্চয়ই বলেছে যে সে তোমাকে ডেকেছে। এমনকী সে তোমার সই সমেত চিঠিও নিশ্চয়ই তার ফাইলে রেখেছে।
আমাকে বলতেই হল যে, সে চিঠি আমি নিজের চোখে দেখে এসেছি।
তার সঙ্গে এর আগে তোমার চিঠি লেখালেখি হয়েছে? সামারভিল প্রশ্ন করল।
আমি বললাম, বাগদাদে ওর সঙ্গে আলাপ হবার পর আমি ওকে দু বার চিঠি লিখেছি, আর পর পর পাঁচ বছর নববর্ষের সম্ভাষণ জানিয়ে কার্ড পাঠিয়েছি।
সামারভিল গভীরভাবে মাথা নাড়ল। তারপর বলল, তোমার সঙ্গে চেহারার মিল আছে এমন কোনও লোক নিশ্চয়ই জোগাড় করেছে। গ্রোপিয়াস। যেটুকু তফাত—সেটুকু মেকআপের সাহায্যে ম্যানেজ করেছে, আর বক্তৃতার বিষয়টা তাকে আগে থেকেই শিখিয়ে নিয়েছে। টাকার লোভে এ কাজটা অনেকেই করতে রাজি হবে। এই দ্বিতীয় শঙ্কুর তো কোনও দায়-দায়িত্ব নেই; সে ফরমাশ খেটে টাকা পেয়ে খালাস, এদিকে আসল শঙ্কুর যা সর্বনাশ হবার তা হয়েই গেল, আর গ্রোপিয়াসেরও প্ৰতিশোধ নেওয়া হয়ে গেল। ভাল কথা, তোমার বক্তৃতার কোনও রেকর্ডিং গ্রোপিয়াসের কাছে থাকতে পারে?
প্রশ্নটা শুনেই আমার মনে পড়ে গেল, বাগদাদে গ্রোপিয়াসকে একটা ছোট্ট টেপরেকর্ডার সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে দেখেছি। আমি বললাম, সেটা খুবই সম্ভব। শুধু তাই না, আমার একটা ভাল। রঙিন ছবিও তার কাছে আছে। আমি আজই দেখেছি।
সামারভিল একটা আক্ষেপসূচক শব্দ করে বলল, মুশকিলটা কী জান? যাকে শঙ্কু সাজিয়েছে তাকে খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। অথচ গ্রোপিয়াসের শয়তানি প্রমাণ করতে গেলে এই দ্বিতীয় শঙ্কুর প্রয়োজন।
এই হোটেলে ঘরে টেলিফোন নেই। দোতলার তিনজন বাসিন্দার জন্য একটিমাত্র টেলিফোন রয়েছে প্যাসেজে। যদি এক নম্বরের জন্য ফোন আসে তা হলে একবার একবার করে রিং হতে থাকে, দুই নম্বর হলে ডাবল রিং, আর তিন হলে তিনবার। টেলিফোন দুই দুই করে বাজছে দেখে বুঝলাম আমারই ফোন।
দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে ফোন ধরলাম।
হ্যালো!
প্রোফেসর শঙ্কু কথা বলছেন?
হ্যাঁ।
আমার নাম ফিংকেলস্টাইন।
আমি বৃথা বাক্যব্যয় না করে আসল প্রসঙ্গে চলে গেলাম।
গত মে মাসে এখানে একটা বিজ্ঞানীসভায় তুমি বোধ হয় উপস্থিত ছিলে। কাগজে তোমার ছবি দেখলাম।
তুমি কি তোমার চশমা হারিয়েছ?
এই অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের কী জবাব দিতে হবে ভাবছি, সেই ফাঁকে ফিংকেলস্টাইন আর একটা প্রশ্ন করে বসল।
তোমার চশমার কাঁচ কি ঘোলাটে, না স্বচ্ছ?
আমি বললাম, স্বচ্ছ। এবং সে চশমা আমার কাছেই আছে, কোনও দিন হারায়নি।
আমার তাই বিশ্বাস। যাই হোক, বিজ্ঞান সভায় যে-শষ্ণু বক্তৃতা দিয়েছিলেন, তিনি ঘর থেকে বেরোবার সময় তাঁর চশমাটা খুলে মেঝেতে পড়ে যায়। সেটা আমি তুলে নিই। শুধু চশমা নয়, তার সঙ্গে একটি জিনিস আটকে ছিল, সেটাও আমার কাছে আছে।
