কে তিনি?
আমি একটু হেসে বললাম, তিনিও প্রোফেসর শঙ্কুর বক্তৃতায় উপস্থিত ছিলেন। তোমার পাঠানো খবরের কাগজের ছবিতে তাঁকে দেখলাম।
গ্রোপিয়াস ভ্রূকুঞ্চিত করল।
কার কথা বলছি তুমি?
প্রোফেসর ফিংকেলস্টাইন।
আই সি।
খবরটা শুনে গ্রোপিয়াসকে তেমন প্রসন্ন বলে মনে হল না। প্রায় আধামিনিট চুপ থাকার পর আমার দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, ফিংকেলস্টাইনের গবেষণা সম্বন্ধে সে দিন তুমি কী বলেছিলে সেটা মনে আছে?
আমি বাধ্য হয়েই মাথা নেড়ে না বললাম।
যদি মনে থাকত, তা হলে আর তাকে ফোন করতে না। তুমি বলেছিলে, একটি তিন বছরের শিশুও তার চেয়ে বেশি বুদ্ধি রাখে।
আমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। খুব ভাল করেই জানি, এই উন্মাদ বক্তৃতার জন্য আমি দায়ী নই, কিন্তু এখানকার লোকের যদি সত্যিই ধারণা হয়ে থাকে যে এই প্ৰতারকই হচ্ছে আসল শঙ্কু, তা হলে আমার বিপদের শেষ নেই। গ্রোপিয়াস ছাড়া কি তা হলে আমি কারুর উপরেই ভরসা রাখতে পারব না?
একটা গাড়ির শব্দ।
ওই বোধ হয় ওয়েবার এল বলল গ্রোপিয়াস।
ডাক্তারকে আমার ভাল লাগল না। জামানির তুলনায় অস্ট্রিয়ার লোকেদের মধ্যে যে মোলায়েম ভাব থাকে, সেটা এর মধ্যেও আছে, তবে সেটার মাত্ৰাটা যেন একটু অস্বস্তিকর রকম বেশি। মুখে লেগে থাকা সরল হাসিটাও কেন জানি কৃত্রিম বলে মনে হয়।
ওয়েবার আধা ঘণ্টা ধরে আমাকে নানারকম প্রশ্ন করে পরীক্ষা করল, আমিও সব সহ্য করলাম। যাবার সময় বলল, গ্রোপিয়াস তোমাকে গাড়ি পাঠিয়ে দেবে, কাল সকালে গটফিট্ষ্ট্রাসেতে আমার ক্লিনিকে এসো, সেখানে আমার যন্ত্রপাতি আছে। তোমাকে সুস্থ করাটা আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে রইল।
আমি মনে মনে বললাম-তোমার চেয়ে অন্তত দশগুণ বেশি সুস্থ আমি। তুমি একমাস নখ কাটোনি, তোমার ঠোঁটে সিগারেটের কাগজ লেগে আছে, তোমার জিভের দোষে কথা জড়িয়ে যায়-তুমি করবে। আমার মাথার ব্যামোর চিকিৎসা?
ওয়েবারকে গাড়িতে তুলে দিতে গ্রোপিয়াস ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, ওর দেরি দেখে আমি ঘরটা ঘুরে দেখছিলাম, তাকের উপর ফোটো অ্যালবাম দেখে পাতা উলটে দেখি একটা ছবিতে আমি রয়েছি। এ ছবি আমার কাছে নেই, তবে এটা তোলার কথা আমার স্পষ্ট মনে আছে। বাগদাদের হোটেল সপ্লেনডিডের সামনে তোলা। আমি, গ্রোপিয়াস আর রুশ বৈজ্ঞানিক কামেনস্কি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছি।
তোমার সঙ্গে জিনিসপত্র কী আছে? গ্রোপিয়াস ঘরে ফিরে এসে প্রশ্ন করল।
কেন বলে তো?
আমার মনে হয়, তুমি আমার এখানে চলে এসো। তোমার নিরাপত্তার জন্যই আমি এই প্রস্তাব করছি। আমার বড় গোস্টররুম আছে, তুমি এর আগেও সেখানে থেকে গেছ-যদিও তোমার সেটা মনে থাকার কথা নয়। মে মাসে যখন এসেছিলে, তখন তুমি আমারই আতিথেয়তা গ্ৰহণ করেছিলে।
ব্যাপারটা অসম্ভব জানলেও মাথাটা কেমন যেন গুলিয়ে উঠছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমাকে কি তুমিই নেমন্তন্ন করেছিলে?
গ্রোপিয়াস এর উত্তরে উঠে গিয়ে পাশের ঘর থেকে একটা ফাইল নিয়ে এল। তাতে অন্য চিঠির মধ্যে আমার দুখানা চিঠি রয়েছে। অবিকল আমার চিঠির কাগজ, আমার সই, আমার অলিভেটি টাইপরাইটারের হরফ। প্রথম চিঠিটায় লিখেছি যে, মে মাসে এমনিতেই আমি ইউরোপ যাচ্ছি, কাজেই ইন্সব্রুকে যাওয়ায় কোনও অসুবিধা নেই। দ্বিতীয় চিঠিটায় জানিয়েছি কবে পৌঁছোচ্ছি।
রহস্য ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে এবং সেই সঙ্গে আমার সংকটাপন্ন অবস্থাটাও ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখানের হোটেলেই যখন আমাকে ঢুকতে দেয়নি, তখন যে লোককে আমি প্রকাশ্য বক্তৃতায় নাম ধরে অপমান করেছি, আমার প্রতি তার মনোভােব কী হবে সেটা বোঝাই যাচ্ছে।
কিন্তু গ্রোপিয়াসকে বলতে হল যে এখুনি তার বাড়িতে এসে ওঠা। আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
আজ রাত্রে আমার বন্ধু সামারভিল লন্ডন থেকে আসছে। কাল যদি আমরা দুজনে একসঙ্গে তোমার বাড়িতে এসে উঠি?
সামারভিল কে? একটু সন্দিগ্ধভাবে প্রশ্ন করল গ্রোপিয়াস। আমি সামারভিলের পরিচয় দিয়ে বললাম, সে আমার বিশিষ্ট বন্ধু; ঘটনাটা শুনে সে বিশেষ চিন্তিত।
তোমার কি ধারণা এখানে এসে তোমাকে দেখলে তার চিন্তা দূর হবে?
আমি কোনও উত্তর না দিয়ে গ্রোপিয়াসের দিকে চেয়ে রইলাম। আমি জানি ও কী বলবে, এবং ঠিক তাই বলল।
তোমার বন্ধুও তোমার চিকিৎসার জন্য আমারই মতো ব্যস্ত হয়ে উঠবে এতে কোনও সন্দেহ নেই।
আমি হোটেলে ফিরেছি। সন্ধ্যা সাতটায়। ফিংকেলস্টাইনের কাছ থেকে কোনও ফোন আসেনি। ঘরে গিয়ে চেয়ারে বসে আজকের আশ্চর্য ঘটনাগুলো নিয়ে চিন্তা করছি, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। সামারভিল। রেলস্টেশন থেকে ফোন করছে। বললাম, কী হল, তুমি আসছ না?
আসছি তো বটেই, একটা উৎকণ্ঠা হচ্ছিল—তাই ফোনটা করলাম।
কী ব্যাপার?
তুমি অক্ষত আছ কি না সেটা জানা দরকার।
অক্ষত এবং সম্পূর্ণ সুস্থ।
ভেরি গুড। আমি আধা ঘণ্টার মধ্যে আসছি। অনেক খবর আছে।
আমার সম্বন্ধে সামারভিল যে কতটা উদ্বিগ্ন সেটা এই টেলিফোনেই বুঝতে পারলাম। কিন্তু কী খবর আনছে। সে?
আমার ঘরে যদিও দুটো খোট রয়েছে, কিন্তু ঘরটা এত ছোট যে আমি সামারভিলের জন্য পাশের ঘরটা বন্দোবস্ত করব বলে ঠিক করেছিলাম। যখন বাড়ি ফিরেছি তখনও ঘরটা খালি ছিল। হোটেলের মালিককে সেটা সম্বন্ধে বলব বলে ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, সে ঘরে বাতি জ্বলছে এবং আধ-খোলা দরজা দিয়ে কড়া চুরুটের গন্ধ আসছে। আর কোনও খালি ঘর আছে কি? খোঁজ নিয়ে জানলাম, নেই। অগত্যা আমার এই ছোট ঘরেই সামারভিলকে থাকতে হবে।
