কী জিনিস?
সেটা তুমি এলে দেখাব। ওটা না পেলে কিন্তু আমারও ধারণা হত যে, যিনি বক্তৃতা দিয়েছেন তিনি আসল শঙ্কু, নকল নন।
কথাটা শুনে আমার হৃৎকম্প শুরু হয়ে গেছে। বললাম, কখন তোমার সঙ্গে দেখা করা যায়?
ফিংকেলস্টাইন বলল, এখন রাত হয়ে গেছে, আর দিনটাও ভাল না। কাল সকাল সাড়ে আটটায় আমার বাড়িতে এসো। বেশি সকাল হয়ে যাচ্ছে না তো?
না না। ঠিক সাড়ে আটটায় যাব। আমার সঙ্গে আমার ইংরেজ বন্ধু জন সামারভিলও থাকবে।
বেশ, তাকে নিয়ে এসো। তখনই কথা হবে। অনেক কিছু বলার আছে।
ফোন রেখে দিলাম। সামারভিল পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। দুজনে আবার ঘরে ফিরে এলাম। সামারভিল দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বলল, তিন নম্বরে যিনি আছেন তাঁকে চেনো?
কোন বলে তো? লোকটি আজ সন্ধ্যায় এসেছে।
ভদ্রলোকের একটু বেশি রকম কৌতূহল বলে মনে হল। চুরুটের গন্ধ পেয়ে পিছনে ফিরে দেখি দরজাটা এক ইঞ্চি ফাঁক করে দাঁড়িয়ে আছে। তোমার ফোনের কথা শোনার জন্য তার এত আগ্রহ কেন?
এর উত্তর আমি জানি না। লোকটা কে তাও জানি না। আশা করি। কাল ফিংকেলস্টাইনের সঙ্গে কথা বলে রহস্য অনেকটা পরিষ্কার হবে।
এখন রাত এগারোটা। বৃষ্টি হয়ে চলেছে। সামারভিল শুয়ে পড়েছে।
৯ই জুলাই
কাল ডায়রি লিখতে পারিনি। লেখার মতো অবস্থা ছিল না। সেই জ্যোতিষীর গণনা শেষ পর্যন্ত ফলেছে। একটা কথা মানতেই হবে; শয়তানিতে একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বৈজ্ঞানিককে টেক্কা দেওয়া অসম্ভব। যাক গে, আপাতত কালকের অসামান্য ঘটনাগুলোর বর্ণনায় মনোনিবেশ করি।
সকাল সাড়ে আটটায়। ফিংকেলস্টাইনের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। টেলিফোন ডিরেক্টরিতে ফিংকেলস্টাইনের ঠিকানা দেখে সামারভিল বলল, হেঁটে যাওয়া যেতে পারে। বেশি দূর না— আধা ঘণ্টায় পৌঁছে যাব। সামারভিলের চেনা শহর ইন্সব্রুক। তা ছাড়া আমাকে ট্যাক্সিতে তোলার বিপদের কথাও ও জানে।
আটটায় বেরিয়ে পড়লাম। প্রাচীন শহরের ভিতর দিয়ে রাস্তা। সামারভিল দেখলাম আলিগলির মধ্য দিয়ে শর্টকাটগুলোও জানে। একটা গলি পেরিয়ে খোলা জায়গায় পড়তেই দেখি, ডাইনে ছবির মতো সুন্দর সিল নদী বয়ে যাচ্ছে। আমরা নদীর ধার ধরে কিছুদূর গিয়ে বাঁয়ে একটা পার্ক ছাড়িয়ে আবার বা দিকেই ঘুরে একটা নির্জন রাস্তায় পড়লাম। এটাই রোজেনবাউম আলে অৰ্থাৎ ফিংকেলস্টাইনের বাড়ির রাস্তা। এগারো নম্বর খুঁজে পেতে কোনওই অসুবিধা হল না।
ছোট অথচ ছবির মতো সুন্দর বাড়ি। সামনেই বাগান, তাতে নানা রঙের ফুল ফুটে রয়েছে, আর তারই মধ্যে সামনের দরজার ডান পাশে একটা আপেল গাছ দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মতো।
আমরা এগিয়ে গিয়ে দরজার বেল টিপলাম। একজন প্রৌঢ় চাকর এসে দরজা খুলে দিল। আমাকে দেখেই তার মুখে হাসি ফুটে ওঠাটা কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগল।
আসুন ভেতরে…আপনি কিছু ফেলে গেছেন বুঝি?
আমার বুকের ভিতরে যেন একটা হাতুড়ি পড়ল।
প্রোফেসর ফিংকেলস্টাইন আছেন? সামারভিলের গলার স্বরে সংশয়।
মনিব তো এখনও ঘরেই আছেন।
কোথায় ঘর?
দোতলায় উঠেই ডান দিকে। ইনি তো একটু আগেই—
তিন ধাপ করে সিঁড়ি উঠে দোতলায় পৌঁছে গেলাম। ডান দিকের ঘরের দরজা খোলা। সামারভিল তার লম্বা পা ফেলে আগে ঢুকে ‘মাই গড!’ বলে দাঁড়িয়ে গেল।
এটা ফিংকেলস্টাইনের স্টাডি। মেহগনির টেবিলের সামনে অদ্ভুতভাবে মাথাটাকে পিছনে চিতিয়ে চেয়ারে বসে আছে। ফিংকেলস্টাইন, তার হাত দুটো চেয়ারের দু পাশে ঝুলে রয়েছে।
এগিয়ে গিয়ে দেখি, যা অনুমান করেছি। তাই। ফিংকেলস্টাইনের মুখের দিকে চাওয়া যায় না। তাকে গলা টিপে মারা হয়েছে। কণ্ঠনালীর দু পাশে আঙুলের দাগ এখনও টাটকা। এই দৃশ্য দেখে ফিংকেলস্টাইনের চাকর যেটা করল সেটাও মনে রাখার মতো। একটা অস্ফুট চিৎকার করে আমার দিকে একটা বিস্ফারিত দৃষ্টি দিয়ে সে টেবিলের উপর রাখা টেলিফোনটার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। তার উদ্দেশ্য স্পষ্ট; সে পুলিশে খবর দেবে।
সামারভিল যেটা করল সেটা অবিশ্যি তার উপস্থিত বুদ্ধির পরিচায়ক। সে এক ঘুঁষিতে ভৃত্যটিকে ধরাশায়ী করল। দেখে বুঝলাম, ভূত্য অজ্ঞান।
তুমি ফাঁদে পড়েছ, শঙ্কু! রুদ্ধশ্বাসে বলল সামারভিল। মাথা ঠাণ্ডা করে কাজ করতে হবে।
কিন্তু ওটা কী?
আমার চোখ চলে গেছে টেবিলের উপর রাখা একটা প্যাডের দিকে। তাতে একটি মাত্র কথা লেখা রয়েছে লাল পেনসিলে—এসঁটে। অর্থাৎ ফাস্ট, প্রথম। আরও যে কিছু লেখার ইচ্ছা ছিল। ফিংকেলস্টাইনের সেটা কথাটার পরেই পেনসিলের দাগ থেকে বোঝা যাচ্ছে। পেনসিলটা পড়ে রয়েছে টেবিলের পাশে মেঝেতে।
যা করতে হবে খুব তাড়াতাড়ি। এসর্টে লিখে কী বোঝাতে চেয়েছিল। ফিংকেলস্টাইন? প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয়—এইভাবে বোঝানো যেতে পারে, এমন কী আছে ঘরের মধ্যে? বইয়ের তাক বোঝাতে পারে কি? মনে হয় না। আমি বুঝতে পারছি, কী জিনিসের অবস্থান বোঝাতে চেয়েছিল। ফিংকেলস্টাইন। আমার চশমা।
জিনিসটা পাওয়া গেল টেবিলের প্রথম-অর্থাৎ ওপরের দেরাজটা খুলে। কাগজপত্ৰ কলম পেনসিল ইত্যাদির মধ্যে একটা কাডবোর্ডের বাক্স রাখা রয়েছে, তার ঢাকনাতে জামান ভাষায় লেখা শঙ্কুর চশমা এবং চুল। বাক্সটা নিয়ে আমরা দুজনে চম্পট দিলাম। ভৃত্যু এখনও বেহুঁশি।
সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় লক্ষ করলাম জুতোর ছাপ; ওঠার সময় তাড়াতাড়িতে চোখে পড়েনি।
বাইরেও রয়েছে সেই ছাপ; দরজা দিয়ে বেরিয়ে গোট ছাড়িয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়েছে। আসার ছাপ, যাওয়ার ছাপ, দু রকমই আছে। কাল রাত্রের বৃষ্টিই অবিশ্যি এর জন্য দায়ী।
