তুমি কালকেই রাজা আনোতারের সঙ্গে কথা বলা। যে করে হোক রাজকুমারীকে অন্য কোথাও রাখতে রাজাকে অনুরোধ কর।
–ঠিক বুঝতে পারছি না রাজা আনোতার রাজি হবে কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
–বলে তো দেখে। হ্যারি বলল।
–হুঁ। বলতে হবেই ফ্রান্সিস বলল।
পাহাড়ের নিচেই বনভূমি। খুব গভীরবননয়। ছাড়া ছাড়া গাছগাছালি জংলা ঝোঁপঝাড়। সে সবের মাঝখান দিয়ে পায়ে চলা পথ। বনের সেই পথ ধরে চলল সবাই।
কিছু পরে একটা লম্বাটে ঘরের সামনে এসে সেনাপতি দাঁড়িয়ে পড়ল। বোঝা গেল এই ঘরটাই কয়েদঘর। ঘরের ছাউনি শুকনো ঘাস পাতার। ঘরের দরজার সামনে বর্শা হাতে দুজন প্রহরী দাঁড়িয়ে। সেনাপতিকে দেখে দুজনে মাথা একটুনুইয়ে সম্মান জানাল। একজন প্রহরী কোমরের কাপড়ের ফেট্টিতে ঝোলানো চাবি বের করে লোহার দরজাশব্দ করে খুলে দিল। সেনাপতি ফ্রান্সিসদের ঘরে ঢুকতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা একে একেঘরটায় ঢুকল।
ঘরের মেঝেয় শুকনো ঘাস লতাপাতা বিছানো দেখা গেল আগে থেকেই বেশ কিছু বন্দী শুয়ে আছে। ঘরের দেয়াল এবড়ো খেবুড়ো পাথরের। ঘরটার ওপর দিকে একটা ফোকরমত। ওটাই জানালা। বাইরের যেটুকুআলোহাওয়া ঐ পথ দিয়েই আসছে ফ্রান্সিসরা কেউ কেউ বসল, কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস দেয়ালে ঠেসান দিয়ে বসল। রাজকুমারী ফ্রান্সিসদের পাশে এসে বসল। ফ্রান্সিস ভাবছিল রাত পাহারার জন্যে পেড্রো কেবলা উচিত ছিল। পেড্রোনজর রাখলে। এভাবে বিনা লড়াইয়ে বন্দী হতে হত না।
একটু চুপ করে থেকে মারিয়া বলল–আমাকে তাহলে এখানেই থাকতে হবে।
-না-না। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল–তোমাকে অন্য কোথাও রাখার জন্য রাজাকে। অনুরোধ করবো।
–কোন দরকার নেই। আমি এখানেই তোমাদের সঙ্গে থাকবো। মারিয়া বলল।
–তা হয় না। এই বদ্ধ ঘরে এভাবে তুমি অসুস্থ হয়ে পড়বে। তাতে আমাদের বিপদই বাড়বে। ফ্রান্সিস বলল।
-তোমরা এত কষ্ট সহ্য করে থাকবেআর আমি থাকতে পারবোনা? মারিয়া বলল।
–না পারবে না। কাল সকালে রাজার সঙ্গে দেখা করবো। ফ্রান্সিস বলল।
রাজাকে দেখে আমার ভালো লাগে নি। লোকটা দাম্ভিক। মারিয়া বলল।
–শুধু দাম্ভিক নয় তার চেয়েও বেশি কিছু। কিন্তু উপায় নেই। ওর মন রেখে কথা বলতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
সিনাত্রা ফ্রান্সিসের কাছে সরে এল। বেশ ভীতস্বরে বলল–রাজা আমাদের মেরে ফেলবে না তো?
–অত ভয় পেও না। আমাদের মেরে ফেলে রাজার কী লাভ। লাভের জন্য তো আমাদের জাহাজ তল্লাশীই করেছে। কয়েকটা সোনার চাকতি ছাড়া কিছুই পায় নি। কাজেই রাজা মিছিমিছি আমাদের মেরে ফেলবে না। তবে আমাদের বন্দী করে রাখবে। তারপর কিছুদিন যাক। দেখা যাক আমাদের নিয়ে কী করে। সিনাত্রা আর কিছু বলল না। ? তবে ওর মন থেকে ভয় গেল না।
দুপুর হল। দুজন প্রহরী লম্বাটে শুকনো পাতা নিয়ে ঢুকল। সবার সামনে পাতা পেলে দিল। দুজনে মিলে তাতেখাবার দিল। আধপোড়া রুটি আর পাখির মাংস। ক্ষুধার্ত ফ্রান্সিসরা চেটেপুটে খেল। কেউ কেউ বাড়তি খাবারও নিল। খাওয়া শেষ হলে ঘরের কোনায়। মাটির পাত্রে রাখা জল খেল। প্রহরীরা এঁটো পাতা নিয়ে চলে গেল। পাখির মাংস সুস্বাদু। ওরা খেয়ে তৃপ্ত হল। এবার শুয়ে বসে রইল ওরা।
ফ্রান্সিস শুয়ে পড়েছিল। মৃদুস্বরে ডাকল হ্যারি। হ্যারি এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস বলল আগে থেকে যে বন্দীরা ছিল তাদের সঙ্গে কথা বলো তো। ওরা কারা। কেনই বা ওদের বন্দী করা হয়েছে-খবর নাও।
আগে থেকে যারা বন্দী ছিল হ্যারি তাদের কাছে গেল। ও কিছু বলার আগে ঐ বন্দীদের একজন যুবক দেশীয় ভাষায় হ্যারিকে কিছু বলল। হ্যারি বুঝল না। তাই ও মাথা নাড়ল। যুবকটি এবার ভাঙা ভাঙা পোর্তুগীজ ভাষায় বলল–আমার নাম বিন্তানো। তোমার নাম কী? হ্যারি বলল-হ্যারি।
তোমরা বিদেশি। বিন্তানো জানতে চাইল।
হ্যাঁ। রাজা তোমাদের বন্দী করেছে কেন?
শত্রুতা শত্রুতা। এটাই আমাদের দেশ বাতোরিয়া রাজা আনোতারের দেশ হচ্ছে। ঐ পাহাড়ের ওপাশে। রাজা আনোতার ধূর্ত ফীবাজ নিষ্ঠুরও। হঠাৎ আমাদের দেশ আক্রমণ করে জয় করেছে। এখন দুই দেশেরই রাজা হয়ে বসেছে। বিন্তানো বলল।
–তোমাদের দেশের রাজা? তিনি কোথায়? হ্যারি প্রশ্ন করল।
বিন্তানো চোখের ইঙ্গিতে দেখালে ঠেস দিয়ে বসা একজন দাড়ি গোঁফওয়ালা রোগাটে চেহারার লোককে দেখাল। হ্যারি দেখল লোকটির পরনে দামি কাপড়ের পোশাক। লোকটি চুপ করে বসে আছে।
–উনিই তোমাদের রাজা?
–হ্যাঁ রাজা পাকোর্দো আমরা কয়েকজন তার দেহরক্ষী। বিন্তানো বলল।
–তোমাদের সেনাপতি? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
লড়াইয়ে মারা গেছেন। এখন আমরা অবাক হবো না যদি রাজা আনোতার আমাদের রাজাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। সেক্ষেত্রে আমরাও যে কজন আছিমৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে বাঁচবো না। আমরাও বিন্তানো বলল।
রাজাসহ তোমাদেরও মৃত্যুদণ্ড দেবে কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা আনোতার সব পারে। লড়াইয়ে হেরে গেছি কাজেই আমাদের জীবনের কোন দাম নেই। বিন্তানো বলল।
–তোমাদের রাজা পাকোর্দো কেমন মানুষ? ফ্রান্সিস বলল।
–দেবতা–দেবতা। প্রজারা তাকে দেবতার মত ভক্তি করে আবার বন্ধুর মত ভালোবাসে। আজকে উনি এই জঘন্য কয়েদঘরে বন্দী হয়ে আছেন এটা জেনে আমাদের বুক ভেঙে যাচ্ছে। বিন্তানো বলল।
লড়াইয়ে হারজিৎ আছেই। ওসব ভেবে কী হবে। হ্যারি বলল।
