নিশ্চয়ই। তার দেহরক্ষীদেরও বন্দী করা হয়েছে। সেনাপতি বলল।
–তাদের কোথায় বন্দী করা হয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–ঐ পাহাড়ের নিচে কয়েদঘরে। সেনাপতি বলল।
–তাহলে আমাদেরও ওখানেই বন্দী করে রাখা হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। আর কথা নয়। রাজধানীতে চলল। সব দেখবে জানব। এখন তোমাদের রাঁধুনিদের বলো সকালের খাবার তৈরি করতে। সকালের খাবার খেয়ে আমরা রাজবাড়িতে যাবো। সেনাপতি বলল।
–বেশ। ফ্রান্সিস বলল। তারপর রাঁধুনি বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বললসকালের খাবার তৈরিকর। তিনজন রাঁধুনি বন্ধু উঠেদাঁড়াল। রসুইঘরে যাবে বলে নিচে নামার সিঁড়ির দিকে চলল। খোলা তরোয়াল হাতে তিনজন যোদ্ধাও ওদের পাহারা দেবার জন্য সঙ্গে গেল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সকালের খাবার তৈরি হয়ে গেল। সবাইকে খেতে দেওয়া হল। খাওয়া শেষ হল। সেনাপতিরআদেশে সৈন্যরা ফ্রান্সিসদের পাহারা দিয়ে জাহাজ থেকেপাতা পাটাতন দিয়ে তীরেনামানো হল। পাহারা দিয়ে ফ্রান্সিসদের নিয়ে পশ্চিমমুখো চলা শুরু হল।
বালি ভর্তি এলাকা দিয়ে চলল সবাই। কিছুদূর যেতে বালির এলাকা শেষ। শুরু হল মাটির রাস্তা। একসময় দূর থেকে রাজধানীর বাড়িঘর দেখা গেল। বাড়িঘর সব পাথর বালি আর কাঠের। পাহাড়ের নিচে বনভূমি। সহজেই কাঠ পাওয়া গেছে। বাড়িগুলোর ছাউনি লম্বা শুকনো ঘাস আর পাতার।
অন্যবাড়িগুলোর তুলনায় একটা বেশ বড় লম্বাটে বাড়ি। বোঝা গেল রাজবাড়ি। ফ্রান্সিসরা সেই বাড়ির প্রধান দরজার সামনে এসে দাঁড়াল।
সেনাপতি ফ্রান্সিসদের নিয়ে রাজসভায় ঢুকল। প্রহরীরা মাথা নুইয়ে সেনপাতিকে সম্মান জানাল। ফ্রান্সিস দেখল কাঠের সিংহাসনের গদীতে রাজা আনোতার বসে আছে। অসম্ভব মোটা। মুখে অল্প দাড়ি গোঁফ। মাথায় চৌকোনো সোনার গিল্টিকরা মুকুট। কুঁতকুঁতে চোখ।
তখন বিচার চলছিল। অল্পক্ষণের মধ্যেই বিচার শেষ হল। বিচার প্রার্থীরা চলে গেল। দোষী লোকটিকে দুজন প্রহরী হাতে দড়ি বেঁধে নিয়ে চলে গেল।
রাজার সিংহাসনের দুপাশে দুটো ছোট কাঠের আসন। তাতে গদী পাতা। সেনাপতি রাজার সম্মুখে গিয়ে মাথা একটু নুইয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে পাশের আসনে গিয়ে বসা অন্য আসনে বৃদ্ধ মন্ত্রী বসেই ছিল।
ফ্রান্সিস ভালো করে রাজা আনোতারকে দেখল কুঁকুঁতে চোখে রাজা ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। সে দৃষ্টি কুটিল। একে অতবড় মুখমণ্ডল তার ওপর ঐ দৃষ্টি। ফ্রান্সিস বুঝল লোকটা ধুরন্ধর, নিষ্ঠুর, অত্যাচারী।
বিচারপর্ব শেষ। সেনাপতি আসন থেকে উঠে দাঁড়াল। আঙ্গুল দিয়ে ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে দেশীয় ভাষায় কী সব বলে গেল। সেনাপতির কথা শেষ হলে রাজা আনোতার। একটু হেসে ভাঙা ভাঙা পোতুর্গীজ ভাষায় বলল–শুনলাম তোমরা ভাইকিং। এখানে নাকি বেড়াতে এসেছে।
–ঠিক বেড়াতে নয়। তবে কোন উদ্দেশ্য নিয়েও আসি নি। নানা দ্বীপ ঘুরে এখন নিজেদের দেশে ফিরে যাচ্ছিলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না। নিশ্চয়ই কোন উদ্দেশ্য নিয়ে তোমরা এখানে এসেছো। রাজা আনোতার বলল।
–না। কোন উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা এখানে আসি নি। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল।
–ঠিক আছে। সে সব পরে ভেবে দেখছি। এখন তোমাদের বন্দী করা হল। রাজা আনোতার বলল।
–কিন্তু আমরা তো আপনার বা আপনার দেশের কোন ক্ষতি করিনি। ফ্রান্সিস বলল।
–ক্ষতি করতে পারো এটা ধরে নিয়েই তোমাদের বন্দী করা হচ্চে। রাজা বলল। তারপর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল। –এটা কে? কথাটা শুনে ফ্রান্সিসের ভীষণ রাগ হল। কিন্তু সেই ভাবটা গোপন করে বলল–এটা নয় ইনি–ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী।
রাজকুমারী তো রাজপ্রাসাদে থাকে। রাজা বলল।
–না। ইনি আমাদের সঙ্গে থাকতেই ভালোবাসেন। ফ্রান্সিস বলল।
–যাক গে যার যেমন অভিরুচি। এবার সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বলল–এদের কয়েদঘরে ঢোকান। পরে ভেবে দেখছি এদের নিয়ে কী করা যায়।
ফ্রান্সিস বুঝল রাজা ওদের কোন কথাই শুনবে না। কিন্তু মারিয়ার কথাটা ভাবতে হয়। তাই ও বলল আমরা না হয় কয়েদ ঘরেই রইলাম। কিন্তু একটা অনুরোধ রাজকুমারীকে রাজবাড়ির অন্দরমহলে রাখুন।
তিনি তো আর আমাদের ফেলে রেখে পালাতে পারবেন না।
–কিন্তু তাকেও তো বন্দী হয়েই থাকতে হবে। রাজা বলল।
অন্তঃপুরে বন্দী করেই রাখুন। কয়েদ ঘরের কষ্ট ওঁর সহ্য হবেনা। ফ্রান্সিস বলল।
–ওসব পরে হবে। এখন তো কয়েদ ঘরে থাকুক। রাজা বলল।
ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না। বুঝল বলে লাভ নেই।
সেনাপতি ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের হাঁটতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা সেনাপতির পেছনে পেছনে চলল।
সবাই রাজবাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসদের দেখতে স্থানীয় অধিবাসীরা প্রায় ভিড় করে এল। বোঝা গেল ফ্রান্সিসদের দেখতেই ভিড়। সবাই বেশিঅবাক হলে মারিয়াকে দেখে। মারিয়ার পোশাক দেখে।
সবার আগে সেনাপতি চলল পাহাড়ের দিকে। তার যোদ্ধারা ফ্রান্সিসদের ঘিরে নিয়ে চলল যাতে কেউ পালাতে না পারে। যেতে যেতে হ্যারি ফ্রান্সিসদের কাছে এল। বলল– ফ্রান্সিস আবার সেই কয়েদঘরেই বন্দী হতে চলেছি।
–ভেবো না। ঠিক সময় সুযোগমত পালাবো। আমার শুধু একটাই চিন্তা মারিয়া এই কয়েদঘরের কষ্টকর জীবন কতদিন মেনে নিতে পারবে। ফ্রান্সিস চিন্তিত স্বরে বলল।
