তখন গভীর রাত। শাঙ্কো ডেক-এর ওপর হালের কাছে ঘুমিয়ে ছিল। গভীর ঘুম। হঠাৎ কীসের খোঁচা লেগে ঘুম ভেঙে গেলো ও ধড়মড় করে উঠে বসল। চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় দেখল কালো পোশাকপরা একজন যোদ্ধা ওর বুকের ওপর তরোয়াল চেপে ধরেছে। ও চারপাশে তাকাল। দেখল একদল কালো পোশাক পরা যোদ্ধা বন্ধুদের ঘিরে ধরেছে। সবার হাতে খোলা তরোয়াল। কয়েকজনের বর্শা। এই কালো পোশাকপরা যোদ্ধাদের শাঙ্কো দেখেছে লড়াই করতে আর লড়াইয়ে জিতে উল্লাস প্রকাশ করতে। তারপর পশ্চিমমুখো চলে যেতে। তাহলে ওরাই ফিরে এসে ওদের জাহাজ দখল করেছে।
ওরা জনকয়েক সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেছে। ততক্ষণে। উদ্দেশ্য কেবিনঘরের বন্ধুদের বন্দী করা। এখন তাকিয়ে, তাকিয়ে দেখা ছাড়া কোন উপায় নেই। নিরস্ত্র ওদের আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কিছু করার নেই।
কিছু পরে ফ্রান্সিসরা নিচের কেবিনঘর থেকে ডেক-এ উঠে এল। প্রত্যেকের পেছনে একজন করে কালো পোশাকপরা যোদ্ধা। মারিয়াও রেহাই পেল না। তাকেও উঠে আসতে হল।
ফ্রান্সিসদের সবাইকে ডেকএ বসানো হল। কালো পোশাকপরা যোদ্ধারা ওদের চারপাশ থেকে ঘিরে দাঁড়াল। যোদ্ধাদের মধ্যে থেকে একজন রোগা লম্বা যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এল। শরীরের তুলনায় ভারি গলায় বলল–তোমাদের দলনেতা কে? ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। বলল–আমি। যোদ্ধাটি ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করল
–তোমাদের পরিচয় বলো। ভাঙা ভাঙা পোতুর্গীজ ভাষায় বলল।
–আমরা ভাইকিং। বিদেশি। ফ্রান্সিস বলল।
–এখানে এসেছো কেন? যোদ্ধাটি জিজ্ঞেস করল।
–এমনি। এ বন্দর সে বন্দর ঘুরে এখানে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।
উঁহু। তোমাদের অন্য কোন উদ্দেশ্য আছে। যোদ্ধারা বলল।
–আমাদের কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
–ধনসম্পদ লুঠ করা। তোমরা লুঠের দল। যোদ্ধাটি বলল।
আমরা লুঠেরা হলে বেশকিছু সম্পদ আমাদের জাহাজে থাকতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
–থাকতে পারে বৈ কি। যোদ্ধাটি বলল।
তাহলে জাহাজ তল্লাশী নিন। ফ্রান্সিস বলল।
–সে তো নেবই যোদ্ধাটি বলল।
–কিছুই পাবেন না। কয়েকটা স্বর্ণমুদ্রা ছাড়া। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখা যাক। যাক গে–তোমাদের বন্দী করা হল। যোদ্ধাটি বলল।
–কেন? আমরা কী এমন অপরাধ করেছি? ফ্রান্সিস বলল।
–যে সব আমাদের রাজা আনোতার বুঝবেন। সকালে তোমাদের রাজসভায় নিয়ে যাওয়া হবে। রাজা আনোতারের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার আশা কম। তোমাদের বন্দী করেই রাখা হবে। যোদ্ধাটি বলল।
–আপনার পরিচয় জানতে পারি? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।
–নিশ্চয়ই। আমি রাজা আনোতারের সেনাপতি। সেনাপতি বলল।
–ও। তা এখন আমাদের নিয়ে কী করবেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–এখন তোমাদের এখানেই রাখা হবে। তারপর তল্লাশী চলবে। সেনাপতি বলল।
–বেশ। আপনার মর্জি। ফ্রান্সিস বলল।
সেনাপতি ছ’সাতজন যোদ্ধার একটা দল করল। হুকুম দিল জাহাজ লুঠ করো। যোদ্ধাদের দলটি সিঁড়ি দিয়ে নিচে কেবিনঘর গুলোর দিকে ছুটল। ওরা তল্লাশী শুরু করল।
পূবের আকাশে কমলা রঙ ধরল। অল্পক্ষণের মধ্যে সূর্য উঠল।
তল্লাসী শেষ। তল্লাশী চালাচ্ছিল যারা তারা ফিরে এল। একজন যোদ্ধা একটা রুমালে বাঁধা কিছু সোনার চাকতি সেনাপতিকে দিল। রুমালটা মারিয়ার।
–তেমন কিছু পেলেন? ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল।
না। সেনাপতি মাথা নাড়ল।
–তাহলেই বুঝতে পারছেন যে আমরা লুঠেরার দল নই। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। আগে রাজসভায় চল। সেনাপতি বলল।
ফ্রান্সিসের পাশেই মারিয়া বসেছিল। মৃদুস্বরে বলল–আমার বড় পছন্দের রুমালটা।
–দুঃখ করো না। ওর বদলে পাঁচটা ভালো রুমাল কিনে নিও। ফ্রান্সিসও মৃদুস্বরে বলল। তারপর হ্যারির দিকে তাকিয়ে একটু হেসে বলল–মারিয়ার বুদ্ধির প্রশংসা করতে হয়। স্বর্ণমুদ্রাগুলো ও লুকিয়ে রেখেছিস বলেই দুতিনবার আমাদের জাহাজ লুঠ হলেও ঐ স্বর্ণমুদ্রাগুলোর হদিস কেউ পায় নি। এবার মারিয়া একটু অভিমানের সুরে বলল–আমি আর একটা বুদ্ধিমতীর মত কথাও বলেছিলাম।
–হুঁ। তুমি এখান থেকে চলে যেতে বলেছিলে। ফ্রান্সিস বলল।
–এবার বোঝ–আমার মতটা ঠিক ছিল কিনা। মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ কিন্তু লড়াইয়ে জিতে যোদ্ধার দল চলে গিয়েছিল। ওরা ফিরে এসে আমাদের জাহাজ দখল করবে অতটা ভাবি নি। ফ্রান্সিস বলল।
–সেটাই তো হল। মারিয়া বলল।
–ঠিক আছে। দেখা যাক এরা আমাদের নিয়ে কী করে? ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস এবার ভাবলো একটা খোঁজখবর করতে হবে। ও সেনাপতির কাছে এগিয়ে এল। বলল–একটা খবর জানতে চাইছিলাম।
–কী খবর? সেনাপতি ফ্রান্সিসদের দিকে ফিরে তাকাল।
–এটা কি একটা দেশের অংশ নাকি একটা দ্বীপ! ফ্রান্সিস বলল।
দ্বীপনয় এটুকু বলতে পারি। কারণ পশ্চিমমুখো আমরা যতদূর গেছি শেষ পাইনি। সেনাপতি বলল।
–এই দেশের নাম কী? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
বাতোরিয়া। এখানকার রাজা ছিল পাকার্দেন। তাকে লড়াই করে হারিয়ে আমাদের রাজা আনোতার এই বাতোরিয়ার রাজা হয়েছেন। সেনাপতি বলল।
–তাহলে আপনাদের অন্য এক রাজত্ব ছিল। ফ্রানিস বলল।
–হ্যাঁ। ঐ যে দক্ষিণদিকে পাহাড় দেখছো ঐ পাহাড়ের ওপারে আছে ভিঙগার দেশ। ওটাই আমাদের দেশ। এখন ঐ ভিঙ্গার দেশ আর এই বাতোরিয়া দুই দেশেরই রাজা হলেন আনোতার।
–রাজা পাকার্দেনকে তো বন্দী করা হয়েছে। ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
