তিনজনে জাহাজের ডেক উঠে এল। ততক্ষণে জাহাজ ডাঙার অনেক কাছে চলে এসেছে। ফ্রান্সিসরা রেলিঙ ধরে দাঁড়াল। তখনই দেখল সেই বালি ঢাকা প্রান্তরের বাঁ দিক থেকে একদল যোদ্ধা খোলা তরোয়াল আর বর্শা হাতে চিৎকার করতে করতে ছুটে আসছে। তাদের তরোয়ালে দুপুরের রোদ পড়েঝিকিয়ে উঠছে। তাদের গায়ে কালোকাপড়ের পোশাক। তখনই ডানদিক দিয়ে দেখা গেল আর একদল যোদ্ধা খোলা তরোয়াল বর্শা নিয়ে ছুটে আসছে। তাদের পোশাক নানা রঙের। সবই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। দু’দল যোদ্ধা পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হল লড়াই। তরোয়ালে তরোয়ালে বর্শায় বর্শায় ঠোকাঠুকিরশব্দ শুরু হল। সেইসঙ্গে চিৎকার আহতদের গোঙনি আর্তস্বর। দেখতে দেখতে হ্যারি বলল ফ্রান্সিস আমরা এক লড়াইয়ের মধ্যে এসে পড়লাম। আমরা কী করবো?
–নীরব দর্শক। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
–জাহাজ ঘোরাতে বল। এখানে নামবো না আমরা। মারিয়া বলল।
লড়াইয়ের শেষটা দেখি। এই লড়াইয়ে তো আমরা জড়াবোনা। ফ্রান্সিস বলল।
—তবে আর এখানে থাকবো কেন? হ্যারি বলল।
–এটা তো জানতে হবে কোথায় এলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–এই লড়াইয়ের পরিবেশে? হ্যারি একটু অবাক হয়েই বলল।
-আরে বাবা-লড়াই তো একসময়ে থামবে। কোন পক্ষ তেজিতবে? তাদের কাছেই জানবো। ফ্রান্সিস বলল।
বড্ড বেশি ঝুঁকি নিচ্ছো ফ্রান্সিস। এই দুই দলের তোক কারা কেমন আমরা জানি না। যারা জিতবে তাদেরও পরিচয় আমরা জানি না। তাদের কাছে সব জানতে গেলে বিপদেও পড়তেপারি। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। বিপদ হতে পারে। তবে খোঁজ খবরটা সাবধানে নিতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
হ্যারি আর কোন কথা বলল না।
মারিয়া বলে উঠল–এসব মারামারি কাটাকাটি আমি দু’চক্ষে দেখতে পারি না। আমি চললাম। মারিয়া চলে গেল।
লড়াই ততক্ষণে শেষের দিকে। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে রঙ-বেরঙের পোশাকপরা যোদ্ধারা হেরে যাচ্ছে। ওদের সংখ্যা কমে আসছে। তখনও অক্ষত থাকা তারা অনেকেই ছুটে পালাচ্ছে। কালো পোশাকপরা যোদ্ধারা তাদের ধাওয়া করছে। যোদ্ধাদের পায়ের চাপে ধূলোবালি উড়ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই রঙবেরঙের পোশাকপরা অনেকেই মারা গেল নয়তো আহত হয়ে বালির ওপর পড়ে রইল। এ লড়াই শেষ। কালো পোশাকপরা যোদ্ধারা সোৎসাহে খোলা তরোয়াল শূন্যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিজয় উল্লাসে মাতল। তারপর পশ্চিমমুখো যেতে লাগল। বোঝা গেল–ওদিকেই রঙবেরঙের পোশাকপরা যোদ্ধাদের দেশ।
লড়াই থেমে গেছে। কিন্তু যুদ্ধে যে কালোপোশাকপরা যোদ্ধাদের জয় হল তারা তো চলে গেল। ওদেরসঙ্গে কথা বলার জন্য তো আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
তাহলে আমাদের জাহাজ এখানেই থাকবে? হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। ফ্রান্সিস ঘাড় কাত করে বলল।
বিকেল হয়ে এল। বিজয়ী যোদ্ধাদের কোলাহল আর শোনা যাচ্ছে না। ফ্রান্সিস হ্যারি নিজেদের কেবিনঘরে ফিরে এল। ভাইকিংবন্ধুরা যারা রেলিং ধরে লড়াই দেখছিল তারাও অনেকে নিজেদের কেবিনঘরে নেমে এল। কয়েকজন অবশ্য ডেক-এই বসে রইল।
মারিয়া ডেক-এ উঠে এল। আবার সূর্যাস্ত দেখতে মারিয়া প্রতিদিন ডেক-এ উঠে আসে। পশ্চিমের আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখল সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পশ্চিমের আকাশে হালকা মেঘের গায়ে নানা রঙের খেলা চলেছে। একসময় সব রঙ মিলিয়ে গিয়ে আকাশে গভীর কমলা রঙ ছড়িয়ে পড়ল। একটা বিরাট কমলা রঙের থালার মত সূর্য দিগন্তে নেমে এল। সূর্য অস্ত গেল। বেশ কিছুক্ষণ পশ্চিম আকাশে কমলা রঙ ছড়িয়ে রইল। আস্তে আস্তে সেই রঙ মুছে গেল। সন্ধ্যের অন্ধকার নেমে এল। মারিয়া কেবিনঘরে চলে এল।
ফ্রান্সিস কেবিনঘরের কাঠের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বিছানায় বসেছিল। মারিয়া মোমবাতি জ্বালতে গেল। ফ্রান্সিস বলে উঠল–অন্ধকারই থাক। আলো জ্বেলো না। মারিয়া আর আলো জ্বালল না। বিছানায় বসতে বসতে মারিয়া বলল–ডাঙায় নামবেনা?
–হ্যাঁ। নামতে তো হবেই। তবে এখন নয়। কাল সকালের খাবার খেয়ে নামবো। ফ্রান্সিস বলল।
–এখানে তো দেখলাম দুই দলে লড়াই চলছে। এই পরিবেশে নামাটা কি বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
–উপায় নেই। খোঁজ খবর করতেই হবে।
–বিপদে পড়বে না তো।
বিপদ তো যে কোন মুহূর্তে হতে পারে। বিপদের আশঙ্কাটা বড় করে দেখলে তো হাত পা ছেড়ে চুপচাপ বসে থাকতে হয়।
তাতে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া যাবে না। ধরো–কোনরকম খোঁজখবর করলাম না। জাহাজ যেদিকে খুশি চলল। তাহলে কি কোনদিন স্বদেশে পৌঁছতে পারবো? উল্টে আরো বড় বিপদে পড়বো। কাজেই খোঁজ খবর নিয়ে দিক ঠিক রেখে জাহাজ চালাতে হবে। বিপদের আশঙ্কায় চুপ করে বসে থাকলে চলবে না। বিপদ হতে পারে আবার নাও হতে পারে। বিপদের কথা ভেবে লাভ নেই। তাতে মন দুর্বল হয়ে পড়ে। মনটা শান্ত রাখতে হবে। –ফ্রান্সিস বলল।
–আমি আর কী বলবো। তুমি তোমার মতোই চল। মারিয়া বলল।
–তোমার অভিমান হল। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
–না-না। অভিমান হতে যাবে কেন। মারিয়া বলল।
–যাক গে–এসব নিয়ে তুমি ভেবো না। তুমি খুশি থাকো।
–ঠিক আছে। মারিয়া বলল
এবার আলো জ্বালো। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়া বিছানা থেকে উঠে মোমবাতি জ্বালল। ঘরে আলো ছড়ালো। ফ্রান্সিস মোমবাতির আলোর দিকে তাকিয়ে একইভাবে বসে রইল।
রাত বাড়ল। সবাই রাতের খাবার খেয়ে নিল। তারপর কেবিন ঘরে ডেক-এর ওপরে সবাই শুয়ে পড়ল। সারাদিন গরমের পর এখন সমুদ্রের জলেভেজা ঠাণ্ডা হাওয়া ছুটেছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়ল।
