এখন তাহলে কী করবো? রাজা বললেন।
কয়েকদিন অপেক্ষা। আমি আগুন জ্বেলে জল অনেকটা শুষিয়ে দিয়েছি। কয়েকদিন সূর্যালোক পেলে সব জল বাষ্প হয়ে উড়ে যাবে। তখন নেমে ধনসম্পদ তুলে নেবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তাই করবো। রাজা বললেন।
–আপনার সবচেয়ে বিশ্বস্তজন কে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–সেনাপতি। মন্ত্রী স্তিফানোর প্রতি তার রাগ আছে। রাজা বললেন।
–সেটাই স্বাভাবিক। সেনাপতিকে স্তিফানো কোন পাত্তাই দেয় না। যাহোক সেনাপতিকে সঙ্গে নিয়ে কোন গভীর রাতে মৃত্যু-সায়র থেকে ধনরত্ন তুলে নিয়ে আসুন। আপনি একা পারবেন না। কিন্তু ধনভান্ডারের কথা গোপন রাখবেন। বিশেষ করে স্তিফানোর কাছ থেকে। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ তাই হবে। কিন্তু তোমরা ধনভান্ডার উদ্ধার করলে। তোমাদের তো কিছু প্রাপ্য হয়। রাজা বললেন।
আমরা কিছুই চাই না। বুদ্ধি খাটিয়ে পরিশ্রম করে উদ্ধার করলাম এতেই আমরা খুশি। ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়াল।
–আপনার জন্যেই আমরা বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়েছিলাম। আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ রইলাম। হ্যারি বলল।
–তাহলে চলি। ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে রাজবাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল।
পরদিন ভোরে মারিয়া রাজবাড়ি থেকে চামড়ার থলে আর কাপড়ের বোঝা নিয়ে চলে এল ফ্রান্সিসদের ঘরে। সৈন্যাবাসে গিয়ে ঘর থেকে দল বেঁধে বেরিয়ে এল। প্রান্তর পার হয়ে জেলেপাড়ার ঘাটে এল। ওরা দুজন নৌকোয় উঠল। দাঁড় বাইতে লাগল ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো। খাঁড়ি পার হয়ে নৌকো দুটো সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে পড়ল। দ্রুত নৌকো চালিয়ে ওরা ওদের জাহাজের কাছে এল। শাঙ্কো ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো। সেই ধ্বনি শুনে জাহাজে ভাইকিং বন্ধুদের কয়েকজন ধ্বনি তুলল–ও-হো-হো। বন্ধুরা জাহাজ থেকে দড়ির মইনামিয়ে দিল। ফ্রান্সিসরা মই বেয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এল। বন্ধুরা ছুটে এসে ওদের ঘিরে দাঁড়াল। সবাই জানতে চায় ফ্রান্সিস গুপ্ত ধনভাণ্ডার উদ্ধার করতে পেরেছে। কিনা। ফ্রান্সিস বলল–বড় ক্লান্ত। শাঙ্কো সব বললে। সবাই শাঙ্কোর কাছে এল। শাঙ্কো হাত পা নেড়ে ফ্রান্সিসের অভিযানের কাহিনী বলতে লাগল।
সুলতান হানিফের রত্নভাণ্ডার
সেদিন ভোর থেকে জোর বাতাস ছুটেছে। ফ্রান্সিসদের জাহাজের পালগুলো ফুলে উঠেছে। আকাশ মেঘলা তবে বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ। জোর হাওয়ায় সমুদ্রের বিরাট বিরাট ঢেউ ঝাঁপিয়ে পড়ছে জাহাজের গায়। জাহাজের জোর দুলুনির মধ্যে ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা নিজেদের কাজ করে যাচ্ছে। জাহাজের কাজ সহজ নয়। ডেক ধোয়া মোছা। বাতাসের গতি বুঝে পাল ঘোরানো। রান্নার জায়গা খাবারের জায়গা পরিষ্কার রাখা। প্রায় পঁচিশ তিরিশজনের রান্না করা চার বেলা খাবার তৈরি করা। কাঠের বাসনটাসন ধোয়া। দু’চারজন অসুস্থ বন্ধু থাকেই। তাদের জন্যে পথ্যর ব্যবস্থা। চিকিৎসা। শুশ্রূষা। শুশ্রূষার কাজটা মারিয়াকেই করতে হয়। এর মধ্যেই দিক ঠিক রেখে ফ্লেজার আর শাঙ্কো দু’জন মিলে জাহাজ চালায়। জাহাজের পালের মেরামতির কাজও চালাতে হয়। এ ভাবেই দিন কাটে ভাইকিংদের। এর মধ্যেই জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে রাতে খাওয়া দাওয়ার পর ডেকএ উঠে আসে সবাই। নাচগানের আসর বসে মাঝে মাঝে। সুকণ্ঠী সিনাত্রা ওদের দেশের চাষীদের, ভেড়াপালকদের, মাঝিদের গান গায়। শাঙ্কো খালি পীপেয় থাবড়া দিয়ে দিয়ে তাল দেয়। দু’চারজন কাঠের ডেক-এ থপ্ থপ শব্দ তুলে নাচে। সেই নাচে ফ্রান্সিসকে মারিয়াকেও অংশ নিতে হয়। নাচগান জমে ওঠে। একসময় নাচগান শেষ হয়। ক্লান্ত ভাইকিংরা অনেকেই ডেক-এই এখানে-ওখানে শুয়ে পড়ে। বাকিরা কেবিনঘরে ফিরে আসে। ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে। এভাবেই দিনরাত কাটে ভাইকিংদের।
এরমধ্যে ওদের নিজেদের মধ্যেও ঝগড়াঝাটি হয়। ঝগড়া বাড়াবাড়ি হলে ফ্রান্সিসের শরণাপন্ন হয় ওরা। ফ্রান্সিস বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঝগড়া মিটিয়ে দেয়। জাহাজে ফ্রান্সিসের কথাই শেষ কথা। ঝগড়া মিটে যায়। বন্ধুরা পরস্পর হাত ধরে ঝগড়া মিটিয়ে নেয়। ফ্রান্সিসকে ওরা বিশ্বাস করে, ভালোবাসে। ফ্রান্সিসের নির্দেশ মেনে চলে। ফ্রান্সিসের কড়া নির্দেশ–যত ঝগড়া হোক মনমালিন্য হোক মারামারি করা চলবে না। ভাইকিং বন্ধুরা ফ্রান্সিসের নির্দেশ মেনে চলে। তাই পরস্পরে মারামারির মত কোন ঘটনা ঘটে না। সবাই শান্তিতে থাকে।
দিন যায় রাত যায়। জাহাজ চলেছে। দিন দশ পনেরো হয়ে গেল ডাঙার দেখা নেই। মাস্তুলের মাথায় বসে পেড্রো দিন রাত নজর রাখে। ওর নজর–কোন জলদস্যুদের জাহাজ আসছে কিনা আর ডাঙা দেখা যায় কিনা।
একদিন দুপুরে ফ্রান্সিসদের দুপুরের খাওয়া-দাওয়া সবে শেষ হয়েছে। ওরা শুনল পেড্রোর চিৎকার করে বলাভাই সব–ডাঙা দেখা যাচ্ছে। হ্যারি তখন ডেক এই ছিল চেঁচিয়ে বলল–কোনদিকে? পেড্রো ডানদিকে দেখিয়ে গলা তুলে বলল–ডানদিকে? হ্যারি ডানদিকে চোখ কুঁচকে তাকাল। দুপুরের উজ্জ্বল রোদে সমুদ্রতীর দেখল। একটা বন্দর বলেই মনে হল। দুটো জাহাজ নোঙর করা। তারপর টানা বালি-ঢাকা জমি। আরো কয়েকজন ভাইকিং বন্ধুও জাহাজের রেলিঙ ধরে দাঁড়াল। বন্দর বালি-ঢাকা প্রান্তর দেখল।
হ্যারি দ্রুত পায়ে ফ্রান্সিসের কেবিনঘরে নেমে এল। বন্ধ দরজা খুলে ফ্রান্সিস তখনই বেরিয়ে এল। বলল পেড্রোর কথা শুনেছি। চলো–কোথায় এলাম দেখি। মারিয়াও চলো। ফ্রান্সিস বলল।
