এখন এই ধনসম্পদ তুলবে না? শাঙ্কো বলল।
না। সে সব রাজা করবেন। তিন চারদিন পর। ভোর হয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি নেমে চলো–ফ্রান্সিস বলল।
দুজনে বেশ দ্রুতই নেমে এল পাহাড় থেকে। তখন বনভূমিতে পাখিদের কাকলি শুরু হয়েছে। বনভূমি পার হতে হতে সূর্য উঠল।
দুজনে যখন নিজেদের ঘরের কাছে এল তখনই দেখল সেনাপতি আসছে।
ফ্রান্সিস দ্রুত ঘরে ঢুকে পড়ল। ওর ধূলোবালি মাখা পোশাক দেখলে সেনাপতির সন্দেহ হতে পারে। ফ্রান্সিসের অবস্থা দেখে মারিয়া কিছু বলতে গেল। ফ্রান্সিস মুখে আঙ্গুল দিয়ে ওকে চুপ করিয়ে দিল।
সেনাপতি প্রান্তরে নেমে চলল রাজবাড়ির পেছনের দিকে। ফ্রান্সিস দেখে নিশ্চিত হল। বলল–মারিয়া আমার পুরোনো পোশাকটা নিয়ে এসো। মারিয়া দ্রুত হেঁটে রাজবাড়িতে চলে গেল। ফিরল ফ্রান্সিসের আর একটি নতুন পোশাক নিয়ে। ফ্রান্সিস পোশাক নিয়ে স্নান করতে গেল।
মারিয়ারা ঘরে অপেক্ষা করতে লাগল। হ্যারি একটু অধৈর্য হয়ে বলল–শাঙ্কো ফ্রান্সিস রাজা মুস্তাকিমের ধনসম্পদ উদ্ধার করতে পেরেছে?
-হ্যাঁ। শাঙ্কো হেসে বলল।
–সত্যি? মারিয়া প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
–রাজকুমারী–আস্তে। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস আসুক সেই সব বলবে।
স্নান সেরে ফ্রান্সিস ঘরে এল নতুন পোশাক পরে। মারিয়া অনুচ্চস্বরে বলল–তুমি নাকি– ফ্রান্সিস হেসে ওকে হাতের চেটো দেখিয়ে থামিয়ে বলল–সব বলছি। তার আগে সকালের খাবারটা খেয়ে নি। খাওয়ার ঘরে চলো।
সবাই খেতে চলল। ওরা খাওয়া সেরে ঘরে ফিরে এল।
সবাই বিছানায় বসলে ফ্রান্সিস বলতে লাগল–গুহাটা দেখার সময় একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছিলাম। উত্তরের দিকে গুহার ঢাল। সেটার মুখের পরেই নিচে লম্বালম্বি অনুর্বর লম্বাটে একটা অংশ। একটা ঘাসও নেই। অথচ ও জায়গার দুপাশে বন গাছপালা। কেন এরকম হল? নিশ্চয়ই কিছু ও জায়গায় ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। কী বয়ে যেতে পারে? সোজা উত্তর মৃত্যু-সায়রের বিষাক্ত জল। তাহলে সেই জল বেরোবার পথ গুহার মধ্যে আছে। অতীতের রাজা মুস্তাকিম ঐ পথ লোক লাগিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। একটা ফলকও গেঁথে দেওয়া হয়েছিল। তাতে উত্তীর্ণ ছিল–একটা প্রাচীন স্পেনীয় শব্দ–এ বিয়োর্তা ইনান্দার। অর্থ মুক্তধারা। সুতরাং আমি নিশ্চিত হলাম এই ফলক আটকানো পাথরটা ভাঙলেই মৃত্যু-সায়রের জল নেমে আসবে। আমি তাই করেছি। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল–আর একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। রাজা মুন্তাকিম খেয়ালি রাজা ছিলেন। একা একা বনভূমিতে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াতেন। এই তথ্য থেকে আমার সন্দেহ হয় ঐ মৃত্যু-সায়রেই উনি তার ধনরত্ন ফেলে দিতেন। সকলের অগোচরে। মৃত্যু-সায়রে। নেমে ধনরত্ন চুরি করা অসম্ভব। অতএব মৃত্যু-সরোবর থেকে বিষাক্ত জল নামাতে হবে।
তারপর ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলে গেল কীভাবে ও বিষাক্ত জল নামিয়েছে। শুকনো মৃত্যু সায়রেকীরকম ধনরত্ন ওরা দেখেছে তাও বলল।
-সাবাস ফ্রান্সিস। এখন কী করবে? মারিয়া বলে উঠল।
–আজ সন্ধ্যেবেলা রাজাকে সব জানাবো। আমি স্তিফানোকে বিশ্বাস করি না। ধনরত্ন উদ্ধার হয়েছে এটা জানতে পারলে ও আসল চেহারা ধরবে। তখন রাজাকে হত্যা করতে পারে। আমাদেরও বন্দী করতে পারো। অতএব রাজাকে খুব সাবধানে ঐ ধনরত্ন উঠিয়ে আনতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
সন্ধ্যে হল। ফ্রান্সিস বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। ডাকল–হ্যারি। হ্যারিও উঠে দাঁড়াল। তারপর রাজবাড়ির দিকে দুজনে চলল।
সদর দরজায় দু’জন প্রহরী দাঁড়িয়ে। ফ্রান্সিস বলল
রাজামশাইকে বলে আমরা বিদেশীরা তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। খুব বিশেষ প্রয়োজন।
একজন প্রহরী চলে গেল। কিছুক্ষণ পরে ফিরে এল। বলল–চলুন। ফ্রান্সিসরা প্রহরীর পেছনে পেছনে রাজবাড়ির মন্ত্রণাকক্ষে এল। আসনে বসল।
কিছুক্ষণ পরে রাজা এলেন। বললেন–কী ব্যাপার?
ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়ে বসে পড়ল। তারপর ফ্রান্সিস বলল–মান্যবর রাজা–আমরা কাল সকালে চলে যাচ্ছি। তাই আপনার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।
–ও। তাহলে আমাদের এক পূর্বপুরুষের ধনরত্নের ভান্ডার উদ্ধার করতে পারলে না। রাজা বললেন।
–না। আমরা সেই ধনরত্নের গোপন ভান্ডার খুঁজে পেয়েছি।
-বলো কি? রাজা প্রোফেন প্রায় লাফিয়ে উঠলেন। বললেন–কোথায় সেই ধনরত্নের ভান্ডার?
লুভিনা পাহাড়ের মৃত্যু-সায়রে। ফ্রান্সিস বলল।
–ঐ সাংঘাতিক বিষাক্ত জলে নামবে কে? রাজা বুললেন।
–এখন ঐ মৃত্যু-সায়রে জল নেই। কয়েকদিন পরে একফোঁটা জলও থাকবে না। তখন আপনি সেই ধনভান্ডার তুলে আনতে পারবেন। কিন্তু এরমধ্যে আদেশ জারি করে দিন মৃত্যু-সায়রে যেন কেউ না যায়।
আদেশ জারির দরকার নেই। কেউ ওখানে যেতে সাহস পায় না। রাজা বললেন।
তবু আদেশ জারি করবেন। আর একটা কথা আপনার মন্ত্রী স্তিফানো যেন গুপ্ত ধনভান্ডারের খোঁজ না পায়। সমস্ত ব্যাপারটাই আপনি গোপন রাখবেন। ফ্রান্সিস বলল।
–মন্ত্রীমশাই হয়তো কোনভাবে জানতে পারে। রাজা বললেন।
–আপনি সে ব্যাপারে সাবধান হবেন। আমি কারো সম্বন্ধে অন্য কাউকে কিছু বলি না। সহজে দোষারোপও করি না। কিন্তু আজ বলতে বাধ্য হচ্ছি–স্তিফানো অত্যন্ত শঠ ও নির্দয়। ও ধনভান্ডারের সংবাদ পেলে আপনার জীবনও বিপন্ন হতে পারে। তাকে বিশ্বাস করবেন না–এই অনুরোধ। ফ্রান্সিস বলল।
