ফ্রান্সিসের কথামত শাঙ্কো দক্ষিণদিক দিয়ে গুহার বাইরে বেরিয়ে এল। মশাল নিভিয়ে ফ্রান্সিসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
ফ্রান্সিস একহাতে জ্বলন্ত মশাল আর অন্যহাতে কুড়ুল নিয়ে ভারসাম্য রেখে আস্তে আস্তে মই বেয়ে সেই খাঁজটার জায়গায় এসে দাঁড়াল। পাথরের দেয়ালে গর্ত ছিল। সেখানে মশালটা ঢুকিয়ে বাখল। তারপর যে পাথরে ফলকটা বসানো ছিল সেই পাথরে কুড়ুলের ঘা মারতে লাগল। কুড়ুলের ঘায়ের শব্দ গুহায় প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। তখনই ও কুড়ুলের ঘা সাবধানে মারতে লাগল যাতে বেশি শব্দ না হয়।
পরপর কয়েকটা জোর ঘা পড়তেই পাথরটা দু’ভাগ হয়ে ভেঙে পড়ল। ঝরঝর করে হলদেটে জলের ধারা নেমে এল। ফ্রান্সিস মৃদু হাসল–মৃত্যু-সায়রের জল। ও খাঁজের দেয়ালে পিঠ চেপে দাঁড়াল যাতে বিষাক্ত জলের ছিটে না লাগে। জল পড়তে লাগল।
গুহার বাইরে দাঁড়ানো শাঙ্কো কুড়ুলের ঘায়ের জল পড়ার মৃদু শব্দ শুনল। বুঝল মৃত্যু সায়রের জলই পড়ছে। এই ওর চিন্তা হল এই বিষাক্ত জল যদি ফ্রান্সিসের গায়ে লাগে! তবে এটা ভাবল ফ্রান্সিস সব দিক ভেবেই ঐ জল নামিয়েছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জলপড়া বন্ধ হল। মৃত্যু-সায়রে জল নিঃশেষ। তবু টুপ্টা জল পড়ছিল। সেটাও যেন গায়ে না লাগে। সাবধান হল ফ্রান্সিস। ও অপেক্ষা করতে লাগল। .
অল্পক্ষণের মধ্যেইটুপটাপ জল পড়াও বন্ধ হল। ফ্রান্সিস মশালটা তুলে নিয়ে মই বেয়ে। নিচের দিকে নামল। মই থেকেই দেখল ওর অনুমান সঠিক। বিষাক্ত জলধারা উত্তরের ঢাল বেয়ে গুহার বাইরে চলে গেছে। কিন্তু এইবার ও চিন্তায় পড়ল। গুহার মেঝেয় অল্প হলেও কিছু পরিমাণ বিষাক্ত জল জমে আছে। পা ফেলা যাবেনা। জল যাতে না লাগে তার উপায় ভাবতে হল। ও ভাবল ওপরে পাথরের চাঙর দিয়ে যে বা যারা ঐ মুক্তধারা’ কথাটি। ফলকের গায়ে উত্তীর্ণ করেছিল তারা নিশ্চয়ই মই ব্যবহার করে নি। অন্য কোন পথে ঐ খাঁজে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাকে বা তাদের জলের স্পর্শ এড়াতে হয়েছিল। সেই পথ ওখানেই আছে যে পথ দিয়ে সে বা ওরা ওখানে এসেছিল আবার বেরিয়েও গিয়েছিল।
ফ্রান্সিস মশাল হাতে মই বেয়ে ওপরের পাথরের খাঁজে উঠেএল। তারপরমশাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক দেখতে লাগল। বারকয়েকমশাল ঘোরাতেইনজরে পড়ল একটা ছোটমুখ। কাছে গিয়ে দেখল একটা সুড়ঙ্গের মুখ। আগে এই সুড়ঙ্গমুখ ওরনজরে পড়ে নি।
সুড়ঙ্গের মুখের কাছে গেল। ভেতরে তাকিয়ে দেখল অন্ধকার। ফ্রান্সিস হাতের মশালটা ছুঁড়ে দিল সুড়ঙ্গের মধ্যে। একটু দূরে গিয়েই পড়ল মশালটা। মশালের আলোয় দেখল ভেতরটা মুখের মত ছোট নয়। বড়ই।
ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। তারপর মাথা ঢুকিয়ে শরীর হিঁচড়ে টেনে নিয়ে সুড়ঙ্গে ঢুকল। সুড়ঙ্গের এবড়োখেবড়ো মেঝে দিয়ে চলল মশালটার দিকে।
মশালের কাছে এল। আবার ছুঁড়ে দিল মশালটা। মশালটা কিছু দূরে পড়ল। আমার, শরীর হিঁচড়ে টেনে চলল। মশালের কাছে এসেই দেখল একটু দূরে সুড়ঙ্গের মুখ। অস্পষ্ট চাঁদের আলো ঐ মুখে। আবার হিঁচড়ে চলল। সুড়ঙ্গের মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসে দেখল জ্যোৎস্নালোকিত পাহাড় গাছগাছালি।
হাঁপাতে হাঁপাতে চলল গুহামুখের দিকে। গুহামুখে এসে দেখলশাঙ্কো দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিস একটা পাথরে বসতে বসতে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো গুহামুখের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। চমকে পিছু ফিরে তাকাল। দেখল ফ্রান্সিস একটা পাথরে বসে হাঁপাচ্ছে। ফ্রান্সিসের সারা গায়ে ধূলোবালি। নতুন জামার এখানে ওখানে ছেঁড়া। শাঙ্কো বলে উঠল–এ কী চেহারা হয়েছে তোমার?
-অক্ষত ফিরে এসেছ। এটাই যথেষ্ট। ফ্রান্সিস হাতের মশাল নেভাল।
–গুহার ভেতরে কুড়ুলের শব্দ জলের শব্দ। কী ব্যাপার? শাঙ্কো বলল।
–সব বলবো। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল–ভোর হতে দেরি নেই। শেষ কাজটা এখনো বাকি। চলো।
–কোথায়? শাঙ্কো জিজ্ঞেস করল।
–মৃত্যু-সায়রে। ফ্রান্সিস বলল।
–কেন? শাঙ্কো বলল।
–গিয়ে দেখবে। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল।
দুজনে পাহাড়ে উঠতে লাগল। কিছু পরে মৃত্যু-সায়রের পাশে শুকনো ডালের গাছটার কাছে এল। ঢাল বেয়ে দু’জনে নেমে মৃত্যু সায়রের মধ্যে তাকাল। মৃত্যু সায়র জলশূন্য। পড়ে আছে একটা নরকঙ্কাল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–সেই যোদ্ধার কঙ্কাল। আমাকে যে হত্যা করতে চেয়েছিল।
–বিষাক্ত জল কোথায় গেল? শাঙ্কো তখনও ঠিক বুঝতে পারছিল না।
–সব বিষাক্ত জল গুহায় নেমে গেছে। ভালো করে নিচে তাকিয়ে দেখ। শাঙ্কো চাঁদের আলোয় দেখল মৃত্যু-সায়রের তলদেশে হীরের অলঙ্কার সোনার মুকুট। আরো কী কী রয়েছে। শাঙ্কো অবাক হয়ে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। বলল তাহলে
–হ্যাঁ। রাজা মুস্তাকিমের গুপ্ত ধনভান্ডার। মশাল জ্বালো। আরো দেখতে পাবো। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো মশাল জ্বালল। ফ্রান্সিস জ্বলন্ত মশালটা মৃত্যু-সায়রে ছুঁড়ে ফেলল।
দপ করে মৃত্যু-সায়রের গন্ধকের স্তরে আগুন লেগে গেল। ফ্রান্সিস সরে যেতে যেতে বলে উঠল–বিষাক্ত ধোঁয়া বেরুবে। সরে এসো।
ওরা গাছটার কাছে উঠে এল। মৃত্যু-সায়র থেকে নীলচে ধোঁয়া বেরোতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যে ধোঁয়া কেটে গেল। মৃত্যু-সায়রের ধারে এসে দাঁড়াল দু’জনে। তখনও মৃত্যু-সায়রের তলদেশে অল্প আগুন জ্বলছিল। সেই আগুনের আলোয় দেখা গেল তলদেশে কত সোনার চাকতি হীরে মণিমানিক্য ছড়ানো। শাঙ্কো খুশিতে মৃদুস্বরে ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো।
