দু’জনে মইটা নামিয়ে ধরে ধরে গুহা থেকে বেরিয়ে এল। তারপর বনভূমিতে ঢুকল। একটা ঝাকড়াপাতার গাছের আড়ালে মইটা লুকিয়ে রাখল। জায়গাটা ভালো করে দেখে রাখল ফ্রান্সিস। পরে যাতে খুঁজে পাওয়া যায়।
বনভূমি থেকে বেরিয়ে এল। প্রান্তর রাজবাড়ির ছায়ায় ছায়ায় পার হয়ে নিজেদের ঘরের দরজায় টোকা দিল। হ্যারি দরজা খুলে দিল। হ্যারির হাতে পাথরের ফলকটা নিয়ে ফ্রান্সিস বলল–এটাতে কুঁদে কিছু লেখা আছে। দেখতে পড়তে পারো কিনা।
-কোথায় পেলে এটা? হ্যারি জানতে চাইল।
–সব বলছি। তার আগে লেখাটা পড়তে পারো কিনা দেখ। ফ্রান্সিস একটু হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। তারপর বিছানায় বসে পড়ল। হ্যারি ঘরের মশালের আলোর কাছে নিয়ে ফলকের লেখাটা পড়বার চেষ্টা করতে লাগল।
ফ্রান্সিস চোখ বুজে শুয়ে পড়ল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে রাজার বাগানের গাছগাছালিতে পাখির ডাক শোনা গেল। বাইরে ভোর হল।
হ্যারি পাথরের ফলকটা বিছানায় রাখতে রাখতে বলল–পড়তে পারলাম না। তবে মনে হয় প্রাচীন স্পেনীয় ভাষায় কিছু লেখা।
এখন কাকে দিয়ে পড়াবো তাই ভাবছি। অথচ এই শব্দের অর্থ জানাটা খুবই জরুরী। ফ্রান্সিস বলল।
–সেনাপতিকে একবার বলে দেখতে পারো। হ্যারি বলল।
–অন্যভাবে বলতে হবে। এই ফলকের কথা বলা চলবে না। ফ্রান্সিস বলল।
–সেনাপতিকেই অন্যভাবে বলল। হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস বলল
শাঙ্কো একবার সেনাপতিকে ডাকো। শাঙ্কো চলে গেল। তখনই মারিয়া এল। মৃদুস্বরে বলল–কিছুহদিশ করতে পারলে?
–অনেকটা এগিয়েছি। ফ্রান্সিস বলল। তারপর পাথরের ফলকটা বিছানার তলায় লুকিয়ে রাখতে রাখতে বলল–এই ফলকটা পেয়েছি। এটার মধ্যে কিছু লেখা আছে। সেটার পাঠোদ্ধার করতে পারলেই গুপ্তধনের হদিশ পেয়ে যাবো।
সেনাপতি শাঙ্কোর সঙ্গে এল। বলল কী ব্যাপার?
–আপনাদের বৈদ্যি আমাকে একটা ওষুধ দিয়েছিল। তার নামটা মনে পড়ছে না। বৈদ্যিকে যদি একবার ডেকে দেন তাহলে খুবই ভালো হয়। ফ্রান্সিস বলল।
–বৈদ্যিবুড়োর কথা বলছে। ও তো পুরনো আমলের লোক। ওর চিন্তাভাবনা সবই, পুরোনোআমলের। এমন সব ওষুধের নাম বলে যার অর্থই আমরা বুঝিনা। সেনাপতি বলল।
–তাই বলছিলাম যদি বৈদ্যিকে একবার ডেকে দেন। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। তোক পাঠাচ্ছি। সেনাপতি চলে গেল।
ফ্রান্সিসদের এক চিন্তা–বৈদ্যিবুড়ো কি শব্দটা পড়তে পারবে? অর্থটা বলতে পারবে?
কিছুক্ষণ বাদেই বৈদ্যিবুড়ো কাঠের বোয়াম ঝোলায় নিয়ে এল।
কার কী হয়েছে? বৈদ্যিবুড়ো বিছানায় বসল।
–সব বলছি। তার আগে একটা কথা। আপনি তো পুরোনো আমলের লোক। পুরোনো স্পেনীয় শব্দের অর্থ বলতে পারবেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–কী শব্দ? আমি প্রাচীন স্পেনীয় ভাষা মোটামুটি জানি। বৈদ্যি বলল।
আর একটা কথা অতীতের রাজা মুন্তাকিম কি স্পেনীয় ভাষা মানে–প্রাচীন ভাষা জানতেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
কী যে বলো। রাজা মুন্তাকিম বিদেশেও ব্যবসার কাজে যেতেন। স্পেনীয় পোর্তুগীজ ইংরেজি ভালো জানতেন। বেশ খেয়ালি মানুষ হলেও যথেষ্ট জ্ঞানী ছিলেন। বৈদ্যি বলল।
এবার ফ্রান্সিস বিছানার তলা থেকে পাথরের ফলকটা বের করল। বিছানায় ফলকটা পেতে বলল–এই পাথরের ফলকে কিছু কুঁদে লেখা আছে–দেখুন তো আপনি এর অর্থ বোঝেন কিনা।
–এই পাথরের ফলক কোথায় পেলে? বৈদ্যি জানতে চাইল।
–সামনের প্রান্তরের পূর্বকোনায় মাটির নিচে। ফ্রান্সিস মিথ্যে করে বলল।
–ও দেখি তো। বৈদ্যিবুড়ো মাথা নিচু করে বেশ কিছুক্ষণ লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল। বিড়বিড় করে বলল–প্রাচীন স্পেনীয় শব্দ। যতদূর বুঝতে পারছি কথাটা হল–এ বিয়ের্তো ইনন্দার।
তার মানে। ফ্রান্সিস সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল।
–মুক্ত ধারা। বৈদ্যিবুড়ো বলল। ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ বৈদ্যিবুডোর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উচ্ছ্বাস গোপন করে বলল–
–ঠিক আছে। আমাদের কারো অসুখ করেনি। আপনি যেতে পারেন। বৈদ্যিবুড়ো ঝোলা হাতে বেরিয়ে যেতেই ফ্রান্সিস লাফিয়ে উঠে চাপাস্বরে বলে উঠল–হ্যারি রাজা মুস্তাকিমের গুপ্ত ধনভান্ডার হাতের মুঠোয়। শাঙ্কো মারিয়া কেউই ফ্রান্সিসের কথা থেকে কিছুই বুঝল না। শুধু হ্যারি বলল
সাবাস ফ্রান্সিস।
এবার ফ্রান্সিস শান্ত হয়ে বিছানায় বসল। তারপর চাপাস্বরে বলল–আজ রাতে আবার লুকিয়ে লুভিনা পাহাড়ে যেতে হবে। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না। শুয়ে পড়ে চোখ বুজল। কী করতে হবে তাই ভাবতে লাগল।
গভীর রাত তখন। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। চাপাস্বরে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো ঘুম ভেঙে উঠে দাঁড়াল। দুটো মশাল নিয়ে তৈরি হলো। ফ্রান্সিস কুড়ুলটা নিল।
দুজনে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে উজ্জ্বল জোৎস্না। রাজবাড়ির ছায়ার আড়ালে আড়ালে বসতি এলাকায় ঢুকল। নৌকোয় উঠে খাঁড়ি পার হয়ে বনভূমিতে ঢুকল। একটু খুঁজতেই মাটিতে শুইয়ে রাখা মইটা পেল। শাঙ্কো মই কাঁধে চলল।
গুহার মুখ দিয়ে ঢুকলো দু’জনে। ফ্রান্সিস সেই খোঁদলের কাছে এসে মই পাতল। শাঙ্কো চকমকি পাথরে লোহা ঠুকে আগুন জ্বালল। দু’টো মশালে। ফ্রান্সিস বলল–এবার শাঙ্কো–তুমি গুহার দক্ষিণদিকে গিয়ে গুহা থেকে বেরিয়ে গিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করো। সাবধান। উত্তরে চালের দিকে যাবে না আর বাইরে গিয়ে মশাল নিভিয়ে ফেল।
