ফ্রান্সিস হাসল। বললো–আমাদের বন্ধুদের মুক্তি।
–আমার হাতে তরোয়াল থাকতে সেটি হবে না। ফ্রান্সিস ওর কাছ থেকে এই ব্যবহার আশা করে নি। বললো–বেঞ্জামিন, তুমি আমাদের শত্রু। তবু বিশেষ করে তোমাকে শত্রু বলে কখনও ভাবি নি। আমি তোমার দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়াচ্ছি।
কথাটা বলে ফ্রান্সিস হাত বাড়াল। বললো–তুমি সাহায্য করো।
–না। বেঞ্জামিন রুখে দাঁড়াল–লা ব্রুশের নুন খেয়ে আমি বেইমানি করতে পারবো না।
ফ্রান্সিস বুঝে উঠতে পারল না কি করবে। বেঞ্জামিন এভাবে রুখে দাঁড়াবে ও স্বপ্নেও ভাবে নি। বললো–কিন্তু আমি তোমার সঙ্গে লড়বো না।
–কাপুরুষ। বেঞ্জামিন তাচ্ছিল্যের সঙ্গে মন্তব্য করল।
ফ্রান্সিসের চোখ দুটো রাগে জ্বলে উঠল। পরক্ষণেইও শান্তস্বরে বললো–বেঞ্জামিন আমি মিনতি করছি, আমার কাজ আমাকে করতে দাও।
–না। কথাটা শেষ করেই বেঞ্জামিন তরোয়াল উঁচিয়ে এগিয়ে এল। কোমর থেকে তরোয়াল খুলে ফ্রান্সিস বললো তুমি আমাকে লড়াইয়ে নামতে বাধ্য করলে।
বেঞ্জামিন তরোয়াল হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল ফ্রান্সিসের ওপর। ফ্রান্সিস খুব সহজে মার ঠেকাল, বেঞ্জামিন দ্রুতহাতে তরোয়াল চালাতে লাগলো। ফ্রান্সিস শুধু তরোয়ালের ১. ঘা ঠেকাতে লাগলো আর আত্মরক্ষা করতে লাগলো।
তরোয়াল যুদ্ধ চললো। জাহাজের দুলুনির মধ্যে দু’জনের পক্ষেই পা ঠিক রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তবু ঐ প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই লড়াই চললো। দু’জনেই হাঁপাতে লাগলো। এটা ঠিক যে ফ্রান্সিসের তরোয়ালের মারের মোকাবিলা বেঞ্জামিনকে করতে হচ্ছে না। ফ্রান্সিস শুধু আত্মরক্ষাই করে চলেছে। বেঞ্জামিনের মার ঠেকাচ্ছে, কিন্তু ফিরে আক্রমণ করছে না। এতে বেঞ্জামিনেরই পরিশ্রম হচ্ছিল বেশি। ফ্রান্সিস সে তুলনায় কম ক্লান্ত হলো। একসময় তরোয়াল চালানো বন্ধ করে বেঞ্জামিন দাঁড়িয়ে পড়ল। হাঁপাতে লাগলো। ফ্রান্সিস বললো–বেঞ্জামিন তোমাকে আমরা বন্ধু বলেই জানি। তুমি ওষুধ এনে দিয়ে আমাকে সুস্থ করেছিলে। তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। বিনীতভাবে বলছি, তুমি আমাকে বাধা দিও না। আমাকে চাবির গোছাটা দাও।
বেঞ্জামিন তার উত্তরে কোন কথা না বলে ফ্রান্সিসের ওপর নতুন উদ্যমে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস মার ঠেকাতে-ঠেকাতে পিছিয়ে যেতে লাগলো। পিছোতে-পিছোতে সিঁড়ির গোড়ায় এসে গেল। বেঞ্জামিন তরোয়াল চালাতে চালাতে ওপরে উঠতে লাগলো। আসলে ফ্রান্সিস চাইছিল ডেক-এ উঠে আসতে। তাহলে নড়াচড়া করবার পিছু হটবার অনেকটা জায়গা পাওয়া যাবে।
দু’জনেই আস্তে-আস্তে ডেক-এ উঠে এল। বাইরে বৃষ্টি কমছে তখন। কিন্তু ঝড়ো হাওয়ার দাপট সামনে চলেছে। ফ্রান্সিস ভাবল–এ ভাবে ও কতক্ষণ আত্মরক্ষা করবে? বোঝা যাচ্ছে, সুযোগ পেলেই বেঞ্জামিন ওকে আঘাত করতে দ্বিধাবোধ করবে না। বেঞ্জামিনকে রোখবার একটাই রাস্তা ওকে আহত করা। এ ছাড়া উপায় নেই কোন।
এবার ফ্রান্সিস আর পিছু না হটে রুখে দাঁড়াল। বেঞ্জামিনকে আক্রমণ করল। ফ্রান্সিসের আক্রমণের নিপুণ ভঙ্গী দেখে বেঞ্জামিন বুঝল, শক্ত লোকের পাল্লায় পড়েছে ও। এবার সত্যিকারের লড়াই শুরু হল। কেউই কম যায় না। দু’জনেরই ঘন-ঘন শ্বাস পড়ছে। এগিয়ে পিছিয়ে লড়াই চলল। ফ্রান্সিস সুযোগ খুঁজতে লাগল কি করে বেঞ্জামিনকে আহত করা যায়। ওর ডান হাতটাকে অকেজো করে দিতে হবে। ফ্রান্সিস হঠাৎ আক্রমণের চাপ বাড়িয়ে দিল। বেঞ্জামিন পিছু হটতে লাগল। ফ্রান্সিস আক্রমণের চাপ সমান রাখল যাতে বেঞ্জামিন বুঝতে না পারে, কোথায় যাচ্ছে, কিসে পা পড়ছে। ওর। ঠিক এ সময়ই বেঞ্জামিন সিঁড়ির মুখে চলে এসেছে। ফ্রান্সিস এত দ্রুত তরোয়াল চালাচ্ছিল, যে বেঞ্জামিন বুঝতেও পারে নি, আর এক পা পিছোলেই সিঁড়ি। নিচে নামবার সিঁড়ি। পিছোতে গিয়ে বেঞ্জামিনের পা নিচে সিঁড়ির খাঁজে পড়ে গেল। ও টাল সামলাল, কিন্তু ফ্রান্সিস ততক্ষণে বিদ্যুৎবেগে ওর ডান হাত লক্ষ্য করে তরোয়াল চালিয়েছে। একটা গভীর ক্ষত হয়ে গেল হাতে! ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। বেঞ্জামিন তরোয়াল ফেলে দিয়ে আহত হাতটা বাঁ হাতে চেপে বসে পড়ল। ফ্রান্সিস ওকে জোরে ধাক্কা দিল। বেঞ্জামিন উলটে ডেকের ওপর চিত হয়ে পড়ে গেল। একটা গোঙানির শব্দ বেরুলো ওর গলা থেকে। ও তখন মুখ দিয়ে শ্বাস নিচ্ছে। ফ্রান্সিস দ্রুতহাতে ওর কোমরের বেল্ট-এ এর কড়ার সঙ্গে আটকানো চাবির গোছাটা খুলে নিল। তারপর ছুটল সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে। কয়েদঘরের সামনে এসে যখন দাঁড়াল, তখন ভীষণ হাঁপাচ্ছে ও। তাড়াতাড়ি বড় আকারের তালাটা খুলে ফেলল। ভেতরে ফ্রান্সিসের বন্ধুরা অনেকেই, জেগে ছিল। কারণ তখনও রাতের খাওয়া হয়নি। বাকিরা শুয়ে-বসে-ঘুমিয়ে ছিল। যারা জেগেছিল, তারা দরজা খুলতে দেখে ভাবল, রাতের খাবার এসেছে। সেই প্রায় অন্ধকারে ওরা ফ্রান্সিসকে চিনতে পারল না। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল–হ্যারি।
হ্যারি জেগেই ছিল। ও চমকে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। এ কি! ফ্রান্সিস। হ্যারি প্রায় চিৎকার করে উঠলো–ফ্রান্সিস।
ফ্রান্সিস ছুটে এসে হ্যারিকে জড়িয়ে ধরল। আনন্দে হ্যারির চোখে জল এসে গেল। হ্যারিকে ছেড়ে দিয়ে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বললো–ভাইসব, আর এক মুহূর্ত দেরি নয়। আমাদের এক্ষুণি পালাতে হবে। কিন্তু কোন শব্দ নয়। আনন্দ-উল্লাসের সময় পরে পাওয়া যাবে। যারা জেগেছিল, তারা ঘুমন্ত আর তন্দ্রাচ্ছন্নদের ঠেলা দিয়ে বলল, এই ওঠ, ফ্রান্সিস এসেছে।
