সকলেই উঠে বসল, কেউ-কেউ দাঁড়িয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস গোছা থেকে চাবি বের করে সবাইকে একে একে মুক্ত করল। বললো–আস্তে-আস্তে সিঁড়ি দিয়ে উঠে সবাই কাছি বেয়ে-বেয়ে আমাদের জাহাজে চলে যাও। কোনরকম শব্দ করো না।
সবাই সিঁড়ি বেয়ে উঠে চলে গেল। হ্যারিকে সঙ্গে নিয়ে ফ্রান্সিস সবার শেষে ডেক এ এল। দেখলো, বেঞ্জামিন তখনও শুয়ে আছে। তবে গোঙাচ্ছে না। হ্যারি বলে উঠল–এ যে বেঞ্জামিন। এত রক্ত ও কি মারা গেছে?
–না। ফ্রান্সিস বলল–ওর গায়ে তরোয়াল না চালিয়ে উপায় ছিল না। ফ্রান্সিস নিচু হয়ে বসল। বললো–হ্যারি–দু’একজনকে ডাকোতো। বেঞ্জামিনকে আমার কাঁধে তুলে দাও।
দু’চারজন তখনও ওখানে দাঁড়িয়ে আহত বেঞ্জামিনকে দেখছিল। দু’জন এগিয়ে এল। হ্যারিও এসে হাত লাগাল। ওরা বেঞ্জামিনকে ধরাধরি করে ফ্রান্সিসের কাঁধে চাপিয়ে দিল। বেঞ্জামিন আবার গোঙরাতে শুরু করল। অত ভারী শরীরটা বয়ে নিয়ে যেতে ফ্রান্সিসের বেশ কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু ও দাঁত চেপে শরীরটাকে বয়ে নিয়ে চলল। কাছিটার কাছে এসে পা বাড়িয়ে আস্তে-আস্তে কাছিটায় ঝুলে পড়বার সময় বলল–বেঞ্জামিন, বাঁ হাতে শক্ত করে আমাকে ধরে থাকো।
বেঞ্জামিন তাই করল। ঝড়ো বাতাসে দু’টো জাহাজই দুলছে। ওরই মধ্যে দড়ি বেয়ে-বেয়ে ফ্রান্সিস ওকে ওদের জাহাজের মুখের কাছে নিয়ে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো–বেঞ্জামিনকে ধরো। ওকে নিয়ে গিয়ে ওষুধ-টষুধ দাও। আমি আসছি।
দু’চারজন ভাইকিং বেঞ্জামিনকে ধরে তুলে নিল। ফ্রান্সিস দড়ি ধরেধরে আবার ক্যারাভেল-এ ফিরে এল। দেখল—হ্যারি আর আরো কয়েকজন ভাইকিং দাঁড়িয়ে। ফ্রান্সিস বলল–হ্যারি, শিগগির আমাদের জাহাজে চলে যাও। আমি একটু পরেই আসছি।
ওরা চলে গেল। ফ্রান্সিস সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছুটলো গোলাঘরের দিকে। গোলাঘরের সামনে পৌঁছে দেখলো দু’জন পাহারাদার গোলাঘর পাহারা দিচ্ছে। এত যে ব্যাপার ঘটে গেছে, তা ওরা কিছুই জানে না। ফ্রান্সিস বুঝল, ঝড়বৃষ্টির শব্দের জন্যেই ওরা কোন শব্দ পায় নি।
ও চারদিকে তাকাতে লাগল। দেখল গোলাঘরে ঢোকার দরজার ডানদিকে অনেকগুলো কাঠের পাটাতন সাজিয়ে রাখা। ওগুলোর পেছনটা ফাঁকা। ঘুরঘুটি অন্ধকার ওখানে। ফ্রান্সিস পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা কাঠের টুকরো ঐ অন্ধকার জায়গাটা লক্ষ্য করে ছুঁড়ল। কাঠের টুকরোটা সশব্দে ঐ জায়গাটায় পড়লো। দু’জন পাহারাদারই দাঁড়িয়ে পড়ল। তার মধ্যে একজন তরোয়াল উঁচিয়ে পা টিপেটিপে ঐ অন্ধকার জায়গাটায় গিয়ে ঢুকল। কাঠের জড়োকরা পাটাতনের আড়ালে পড়ে গেল ও। ফ্রান্সিস দ্রুতপায়ে ছুটে এসে অন্য পাহারাদারটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। লোকটা কিছু বোঝবার আগেই ওর হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গেল লোকটা চিত্ হয়ে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস এক মুহূর্ত দেরি না করে ওর বুকে তরোয়ালটা ঢুকিয়ে দিল। মনে মনে বলল–অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছ তোমরা। তোমাদের ওপর দয়া দেখানো অর্থহীন। ও দ্রুতহাতে লোকটার কোমরের বেল্ট থেকে চাবিটা খুলে নিল। গোলাঘরের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। দেখলো, অনেকগুলি কাঠের বাক্সে টাই করা কামানের গোলা। একটা বন্ধ বাক্স, সেটায় বোধহয় পিস্তলের গুলি। দেয়ালে সারি সারি টাঙানো তরোয়াল, কুঠার বর্শা। ফ্রান্সিস মুখ ফিরিয়ে দেখলো অন্য পাহারাদারটা ছুটে আসছে। ও এক হ্যাঁচকা টানে কেরোসিন তেলের কাঁচের আলোটা খুলে কামানের গোলাগুলোর ওপর ছুঁড়ে মারল। কঁচটা ভেঙে চারিদিকে ছিটিয়ে পড়লো। কাঠের বাক্সগুলোর কেরোসিনের আগুন ছিটকে পড়ে আগুন লেগে গেল।
আলো নিভে যাওয়াতে দরজার কাছটা অন্ধকার হয়ে গেছে তখন? পাহারাদারটা অন্ধকারেই তরোয়াল চালাল। ফ্রান্সিস তৈরিই ছিল ও মারটা ফিরিয়ে তরোয়াল দিয়ে ঐ লোকটার তরোয়াল চাপ দিয়ে ওকে প্রচন্ড জোরে একটা ধাক্কা দিল। লোকটা প্রায় ছিটকে পড়ে গেল। সেই ফাঁকে ফ্রান্সিস সিঁড়িটার দিকে লক্ষ্য করে ছুটল। পাহারাদারও উঠে ওর পিছু নিল। ফ্রান্সিস দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল। পাহারাদারও উঠতে লাগল। দু’জনকেই প্রায় অন্ধকার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হচ্ছিল। কাজেই কেউই কাউকে ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছিল না। ফ্রান্সিস হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে ঘুরে দাঁড়াল। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে তরোয়াল তুলল। ফ্রান্সিস ঠিক তখনই লোকটার চোয়াল লক্ষ্য করে একটা ঘুষি মারলো। লোকটা ছিটকে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে নীচে পড়ে গেল। ফ্রান্সিস সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত উঠতে লাগল।
ডেক-এ উঠেই ও ছুটলো ক্যারাভেল-এর পেছন দিকে। ও যখন ওদের জাহাজের সঙ্গে বাঁধা কাছিটায় ঝুলে পড়ল, তখনই প্রচন্ড শব্দে গোলাঘরে প্রথম গোলাটা ফাটলো। সমস্ত ক্যারাভেলটা কেঁপে উঠল। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি দড়ি বেয়ে নিজেদের জাহাজে চলে এল। তারপর কাছিটার ওপর তরোয়াল চালাতে লাগল। তরোয়ালের কয়েকটা কোপ পড়তেই কাছিটা কেটে গেল। ক্যারাভেলটা আস্তে-আস্তে কিছুদূর সরে গেল। ওদিকে ক্যারাভেল-এর গোলাঘরে তখন একটার পর একটা গোলা ফাটছে।
ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে কেবিনঘরগুলোর দিকে ছুটলো। তখনই হ্যারির সঙ্গে দেখা। ফ্রান্সিস বললো–শিগগির, আমাকে বেঞ্জামিনের কাছে নিয়ে চলো।
একটা কেবিন ঘরে হ্যারি ওকে নিয়ে এল। দেখল বেঞ্জামিন শুয়ে আছে। ছেঁড়া কম্বল দিয়ে ওর ডানহাতে একটা ব্যান্ডেজমত বাঁধা। ফ্রান্সিস ওর পাশে বসে হাঁপাতে । লাগল। একটু দম নিয়ে ডাকল–বেঞ্জামিন।
