লা ব্রুশ মৃত সর্দারের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর চেঁচিয়ে হুকুম দিল–ক্যারাভেল-এ যত লোক আছে, সবাইকে এখানে জড়ো কর। ক্যারাভেল-এ শুধু বেঞ্জামিন থাকবে, পাহারা দেবে। আর গোলাঘর পাহারা দেবার জন্য দু’জন থাকবে। আর কাল সকালেই পাহাড়ী এলাকার দিকে তল্লাসীতে বেরুবে। কোন ভাজিম্বাকে দেখলেই হত্যা করবে।
লা ব্রুশ ছোট সর্দারকে বড় সর্দারের দায়িত্ব দিল। এই সর্দার ছিল একটু রোগাঢ্যাঙা। সে পরদিন সকালেই নৌকো চড়ে ক্যারাভেল-এ এলো। সমস্ত পাহারাদারকে নৌকো কি করে সবাইকে দ্বীপে নিয়ে এল। তারপর রাজবাড়িতে এনে জড়ো করল। ক্যারাভেল-এ রইল শুধু বেঞ্জামিন। আর দু’জন গোলাঘর পাহারাদার।
সব জলদস্যু বড় সর্দারের নেতৃত্বে খোলা তরোয়াল হাতে বন-জঙ্গল চষে ফেলল। কোন ভাজিম্বাকেই ধরতে পারল না। দুপুরের পরে শুরু করল, পাহাড়ী এলাকায় তল্লাসী; একজন ভাজিম্বা পাথরের আড়াল থেকে পালাতে গিয়ে ওদের নজরে পড়ে গেল। বড় সর্দার সবার আগে তরোয়াল উঁচিয়ে ছুটল ভাজি যুবকটিকে ধরতে। কিন্তু বেগতিক বুঝে ভাজি যুবকটি উঁচু খাড়া পাহাড় থেকে মুক্তোর সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সাঁতরে চললো পারের দিকে। কিছুদূর সাঁতরাবার পর যুবকটি হঠাৎ হাত-পা ছেড়ে আস্তে আস্তে জলে ডুবে গেল, আর উঠল না।
খাড়া পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে জলদস্যুরা এসব দেখছে। তখনই পেছন থেকে আর একটা বর্শা তীব্র বেগে ছুটে এল। লাগল একটি জলদস্যুর মাথায়। সে তাল সামলাতে না পেরে খাড়া পাহাড়ের গা বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নীচে মুক্তোর সমুদ্রে এসে পড়ল। বারকয়েক সাঁতরাবার ব্যর্থ চেষ্টা করে সেও জলের নীচে তলিয়ে গেল।
সন্ধ্যে হবার আগেই জলদস্যুর দল রাজবাড়িতে ফিরে এল।
লা ব্রুশ হাত-পা ছড়িয়ে কাঠের সিংহাসনে বসেছিল। পাশেই শেকলে বাঁধা চিতাবাঘের বাচ্চাটা। ঢ্যাঙা সর্দারের মুখে সব শুনে লা ব্রুশের গম্ভীর মুখ আরো গম্ভীর হলো। সে হাতীর দাঁতে বাঁধানো তরোয়ালের হাতলটায় অস্থিরভাবে হাত বুলোতে লাগল।
নিজের জাহাজের মাস্তুলের আড়ালে লুকিয়ে ফ্রান্সিস সবই দেখলো! জলদস্যুরা সব দল বেঁধে তাদের দ্বীপে চলে গেল কেন, বুঝল না। তবে এটা বুঝল যে, ওখানে নিশ্চয় কোন গন্ডগোল হয়েছে, যে জন্যে সবাইকে তলব করা হয়েছে! তাহলে বোধহয় শুধু বেঞ্জামিন ক্যরাভেল-এর পাহারায় রইল। কারণ ঐ দলে ও বেঞ্জামিনকে দেখে নি।
সেদিন সন্ধ্যে হ’তেই বাতাস পড়ে গেল। আকাশের দক্ষিণ-পূর্ব কোন থেকে মেঘ উঠে আসছে, এটা ফ্রান্সিস লক্ষ্য করে নি। ও কেবিন ঘরে পায়চারি করছিল আর ভাবছিল, এই সুযোগ হাতছাড়া করা চলবে না। বন্ধুদের মুক্ত করতে হলে এই সুযোগ! বেঞ্জামিন একা। ও হয়তো বাধা নাও দিতে পারে। ও ফ্রেদারিকোকে ভালোবাসত। ওর কথা শুনত। সেই সূত্রে ফ্রান্সিসদের সঙ্গে ও ভালো ব্যবহার করত। মাঝে-মাঝে যে দুর্ব্যবহার না করেছে তা নয়, তবে তার জন্যে ওকে দোষ দেওয়া যায় না। লা ব্রুশের হুকুমেই এরকম ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছে। বেঞ্জামিন বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। তাই যদি হয়, তাহলে বন্ধুদের মুক্ত করতে কোনো অসুবিধেই নেই।
একটু রাত বাড়লেই হঠাৎ হাওয়ার প্রবল ঝাঁপটায় জাহাজটা যেন কেঁপে উঠল। শুরু হ’ল প্রচন্ড ঝড়-বৃষ্টি। অন্ধকার সমুদ্র ভয়াবহ রূপ নিল। আকাশে মুহুর্মহু বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল। সঙ্গে বাজপড়ার গম্ভীর শব্দ। ফ্রান্সিস খুশির চোটে দু’বার বিছানায় গড়াগড়ি খেয়ে নিল। যে সুযোগের আশায় ও দিন গুনেছে, সেই সুযোগ আজ উপস্থিত। ও তাড়াতাড়ি কিছু খেয়ে নিল। পোষাক পাল্টাল। কোমরে তরোয়াল গুজল। তারপর ওপরে ডেকে উঠে এল। জাহাজটা ভীষণ দুলছে। সেই সঙ্গে ঝড়ো বাতাসের ঝাঁপটা আর বৃষ্টির অবিরল ধারা। ও টাল সামলাতে-সামলাতে চললো জাহাজের মাথার দিকে। এই মাথার দিকেই ক্যারাভেলের সঙ্গে জাহাজটাকে বাঁধা হয়েছে। ফ্রান্সিস জাহাজের না মাথায় পা ঝুলিয়ে ধরল। তারপর কাছিটার হাত দিয়ে ধরে-ধরে ক্যারাভেল-এর ওপর উঠে এল। ডেক-এ কেউ নেই! নিচে কেবিনটায় নামবার সিঁড়ির মুখে একটা কঁচটাকা আলো ঝড়ো ঝাঁপটায় দোল খাচ্ছে। ও পায়ে টাল সামলে ডেক পেরোল। নিচে নামবার সিঁড়ির কাছে এলো। তারপর সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে চললো। কয়েকটা আলো ঝুলছে বটে, কিন্তু তাতে অন্ধকার কাটে নি। সারা গা জলে ভিজে গেছে, যেন স্নান করে উঠেছে। নামতে নামতে ও কয়েদঘরের কাছে চলে এল। কয়েদঘরের সামনে মাথার কাছে যে আলো জ্বলছে, সেই আলোয় দেখলো, খোলা তলোয়ার হাতে বেঞ্জামিন দরজার সামনে পাহারা দিচ্ছে। বাতিটা ও ক্যারাভেল দুলছে, সেই সঙ্গে কাঠে কাঁচ কাঁচ শব্দ উঠছে। ও দেখলো, বেঞ্জামিন একা। অন্য কোন পাহারাদার নেই।
ফ্রান্সিস কয়েক পা এগিয়ে ডাকল–বেঞ্জামিন।
বেঞ্জামিন প্রথমে ডাকটা শুনতে পেল না। ফ্রান্সিস আর একটু গলা চড়িয়ে ডাকল–বেঞ্জামিন।
এবারের ডাকটা কানে গেল। বেঞ্জামিন দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল। ঐ স্বল্প আলোয় ও ফ্রান্সিসকে চিনতে পারল না। ফ্রান্সিস আলোর দিকে এগিয়ে এলো, এবার ফ্রান্সিসকে চিনতে পেরে ও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। ফ্রান্সিস! মুক্তোর সমুদ্র থেকে বেঁচে ফিরে এসেছে। কিন্তু এক মুহূর্তমাত্র, তারপরই বেঞ্জামিন সতর্ক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞাসা করল–এখানে কি চাও?
