বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলেছে যখন তখন হ্যারি নিম্নস্বরে বলল–ফ্রান্সিস কী ব্যাপার বলো তো?
কোন ব্যাপারে বলছো? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–একজন যোদ্ধা তোমার মুখের দিকে বারবার তাকাচ্ছে। হ্যারি বলল।
–হুঁ–ফ্রান্সিসও গলা নামিয়ে বলল–আমিও লক্ষ্য করেছি। তবে কেন এরকম করছে সেটা ঈশ্বরই জানে।
–ব্যাপারটা আমার ভালো ঠেকছে না। ওরা তরোয়ালও নিয়ে এসেছে। তুমি সাবধানে থেকো। ওর ওপর নজর রেখো। হ্যারি মৃদুস্বরে বলল।
–আরে যেতে দাও–ফ্রান্সিস তাচ্ছিল্যের ভঙ্গীতে বলল।
–উঁহু তুমি ব্যাপারটা এভাবে উড়িয়ে দিও না। হ্যারি বলল। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না।
বনভূমির মধ্যে দিয়ে হেঁটে সবাই লুভিনা পাহাড়ের নিচে এল। খুব একটা উঁচু পাহাড় নয়। আর খুব ছোটও নয়।
ফ্রান্সিস যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে বলল-আমাদের গুহাটার মুখে নিয়ে চলো।
–তাহলে পাহাড়ে উঠতে হবে। যোদ্ধাদের একজন বলল
–চলো। ফ্রান্সিস বলল।
দুজন এ পাথর সে পাথর কখনও ধরে কখনও ডিঙিয়ে ওপরের দিকে উঠতে লাগল। পেছনে লাইনে ফ্রান্সিসরাও উঠতে লাগল। মারিয়ার উঠতে দেরি হচ্ছিল। শাঙ্কো মারিয়াকে পাহাড়ে উঠতে সাহায্য করছিল।
একসময় গুহার মুখে এসে পৌঁছল সবাই। রোদের বেশ তেজ। আর জোর হাওয়া বইছিল। তাতে কষ্টটা কম হচ্ছিল। ফ্রান্সিস গুহার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল শাঙ্কো-মশাল জ্বালো। শাঙ্কো দুটো মশাল কোমরে ফেট্টিতে গুঁজে উঠেছিল। ও চকমকি পাথর লোহার টুকরো বের করল। ঠুকে ঠুকে মশাল জ্বালল। একটা মশাল ফ্রান্সিস অন্যটা হ্যারিকে দিল। শাঙ্কো মারিয়াকে হাত ধরে নিয়ে চলল।
কিছুটা এগোতেই নিকষ অন্ধকার। গুহার মেঝেয় পাথরের টুকরো ছড়ানো। একটু উঁচু নিচুও। চারদিক ধেকে দেখে হাঁটছিল। এবড়ো খেবড়ো পাথর এখানে ওখানে উঁচিয়ে আছে। বেশ কিছুটা যেতে গুহা পথের উত্তর মুখে ঢাল শুরু হল। এখানে গুহার অংশটা উঁচু। ফ্রান্সিস হাতের মশালটা উঁচু করে তুলে ওপরের দিকে তাকাল। দেখল এক খোদল মত ওপরের দিকেও উঠে গেছে। ওপরে কী আছে বোঝা গেল না। এবার উত্তরের ঢাল বেয়ে ওরা চলল। এরকম অভিযানে তো মারিয়া অভ্যস্ত নয়। ও ভাবছে কতক্ষণে গুহা থেকে বেরোবে। আর সবাই নির্বিকার হেঁটে চলেছে।
কিছু পরে ওদিককার গুহামুখ দেখা গেল। প্রায় গোল মুখ। যেমন একটা রোদ মাখানো গোলাকার কাপড় ঝুলছে। গুহা পথ শেষ। সবাই বাইরে উজ্জ্বল রোদে এসে দাঁড়াল। অন্ধকার থেকে এসে চোখে একটু অস্বস্তি হল। অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অস্বস্তিটা কেটে গেল।
উত্তরের বনের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস একটা ব্যাপার দেখে বেশ আশ্চর্য হল। এদিকে নিচে বেশ দূর পর্যন্ত টানা উধর মাটি। ঘাসের বা গাছের কোন চিহ্ন নেই বেশ কিছু দূর পর্যন্ত। যেন এই টানা জায়গাটা আগুনে পুড়ে গেছে। অথচ দু পাশে ঘাস গাছগাছালি। ফ্রান্সিস হ্যারিকে দেখাল সেটা। দেখেটেখে হ্যারি বলল–এখানে হয়তো দাবাগ্নি জ্বলেছিল।
–তেমনি কিছু হবে। ফ্রান্সিস বলল। ফ্রান্সিস ওপরের দিকে তাকাল। পাহাড়ের এবড়ো খেবড়ো গা উঠে গেছে সেই চূড়ড়া পর্যন্ত।
ফ্রান্সিস ফিরে যোদ্ধাদের বলল–মৃত্যু সায়রটা কোথায়?
–এদিক দিয়ে উঠেও যাওয়া যায় আবার ওদিক থেকেও উঠেও দেখা যায়। বলশালী যোদ্ধাটি বলল?
–আমরা এদিক দিয়ে উঠবো। ফ্রান্সিস বলল। এবার মারিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল–তুমি শাঙ্কোর সঙ্গে এখানে থাকো। পাহাড়ে উঠতে পারবে না।
–না আমি উঠতে পারবো। শাঙ্কো উঠতে সাহায্য করবে। মারিয়া বলল
–বেশ চলো। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই এপাথরের চাই ওপাথরের চাইয়ের পাশ দিয়ে কখনো চাই ডিঙিয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
বেশ সময় লাগল উঠতে। পাহাড়ের চূড়োর কাছাকাছি উঠে দেখল একটা মাত্র শুকনো আঁকাবাঁকা ডালওয়ালা গাছ। তার পাশেই একটা ছোট জলাশয়। বলিষ্ঠ যোদ্ধাটি বলল–এটাই মৃত্যু-সায়র।
ছোট জলাশয়। ফ্রান্সিস ঢাল বেয়ে জলাশয়ের একেবারে কাছে চলে এল। ভালো করে মৃত্যু সায়রটা দেখতে লাগল। হলদেটে রঙের জল। কেমন একটা নাক-চাপা গন্ধ। পাথরের গা থেকে নিশ্চয়ই বিষাক্ত কিছু বেরিয়ে এই জলে মেশে। তাতেই বিষাক্ত হয়ে গেছে এই জল।
হঠাৎ শাঙ্কোর উত্তেজিত ডাক শুনল ফ্রান্সিস। সেইসঙ্গে মারিয়ার ভয়ার্ত চিৎকার।
ফ্রান্সিস এক পাক খেয়ে ঘুরে দাঁড়াল। বলিষ্ঠ যোদ্ধাটি তখন দ্রুত ওর সামনে নেমে এসেছে। উদ্দেশ্য স্পষ্ট। ফ্রান্সিসকে ধাক্কা দিয়ে মৃত্যু-সায়রে ফেলে দেওয়া। ফ্রান্সিস তৎক্ষণাৎ শরীর ঘুরিয়ে সরে গেল। ঢালু পাথরে টাল সামলাতে পারল না যোদ্ধাটি। পাথরের নুড়িতে পা হড়কে মৃত্যু-সায়রে পড়ে গেল। একগাদা নুড়ি পাথরও সেইসঙ্গে জলে পড়ল। ঝপাৎ করে শব্দ হল। যোদ্ধাটি দু’হাত তুলে জলে ডুবে গেল। আর উঠল না। আস্তে আস্তে জলে ঢেউ বন্ধ হল।
মুহূর্তে ঘটে গেল সব। মারিয়া ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। অবধারিত মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে গেছে ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস একটু হাঁপাতে হাঁপাতে গাছটার কাছে উঠে এল। সঙ্গের যোদ্ধাটির মুখ তখন ভয়ে সাদা। এরকম অঘটন ও হয়তো কল্পনাও করেনি। ফ্রান্সিস ওর কাছে এল। বলল–তোমার যোদ্ধা বন্ধু আমাকে ঠেলে ফেলতে চেয়েছিল কেন? মাথা দুলিয়ে যোদ্ধাটি বলল-জানি না।
–ফ্রান্সিস? হ্যারি ডাকল।
