ফ্রান্সিস অন্তঃপুরের প্রহরীকে বলল
–একজন রাণির পরিচারিকাকে ডাকো। প্রহরী ভেতরে চলে গেল। একটু পরে একজন পরিচারিকা নিয়ে এল।
–আমরা অন্দরমহলে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–জানি। রাণিমা বলেছেন আপনারা আসবেন। পরিচারিকা বলল।
ফ্রান্সিসরা অন্তঃপুরে ঢুকল। ফ্রান্সিসরা চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। সুন্দর সাজানোগোছানো সবকিছু। ফ্রান্সিস পাথরের দেয়ালগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল যদি কোন চিহ্ন পাওয়া যায়। কিন্তু তেমন কিছুনজরে পড়ল না। পরিচারিকা ওদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব ঘরই দেখাল। একসময় রাণি হেসে মারিয়ার সঙ্গে কিছু কথাও বললেন।
এবার পরিচারিকা বলল–আর কী দেখবেন?
–গর্ভগৃহ। ফ্রান্সিস বলল–পূবদিকে।
–সেতো সাংঘাতিক জায়গা। পরিচারিকা বেশ ভীতস্বরে বলে উঠল।
–ঠিক আছে। তুমি নিয়ে চলো৷ ফ্রান্সিস বলল।
পরিচারিকা ফ্রান্সিসদের রাজবাড়ির পূর্ব অংশে নিয়ে এল। একটা ভেঙে পড়া ঘরের কাছে এসে মেঝের দিকে দেখাল। দেখা গেল একটা পাথরের চৌকোনো পাটাতন। তাতে একটা বড় লোহার কড়া গাঁথা।
–এটাই গর্ভগৃহ। পাটাতনের নিচে। পরিচারিকা বলল।
ফ্রান্সিস এগিয়ে এসে কড়াটা ধরে টানল। পাটাতনটা ভারি।
শাঙ্কো-পাটাতন তুলতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো এগিয়ে এল। দুজনে উবু হয়ে বসল। তারপর একসঙ্গে কড়াটা ধরে টানতে লাগল। কয়েকটা জোর হ্যাঁচকা টান পড়তে পাটাতনটা নড়ল। তারপর আরো কয়েকটা জোরে টান পড়তে পাটাতনটা উঠে এল। ভেতরে নিষ্প্রভ আলোয় দেখা গেল পাথরের সিঁড়ি নেমে গেছে।
–শাঙ্কো–মশাল জ্বালো। শাঙ্কো কোমরে গোঁজা চকমকি পাথর আর লোহার টুকরো বের করল। পাথর ঠুকে দু’টো মশাল জ্বালল।
ফ্রান্সিস জ্বলন্ত মশাল হাতে নামতে যাবে শাঙ্কো জামার তলা থেকে ওর ছোরাটা বের করে ফ্রান্সিসকে দিল। ফ্রান্সিস ছোরাটা কোমরে গুঁজে নিল। তারপর আস্তে আস্তে পাথরের সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল।
মশালের আলোয় ফ্রান্সিস চারদিকে তাকিয়ে দেখতে লাগল। নিরেট এবড়োখেবড়ো পাথরের ঘর। একপাশে একটা মাটির বড় জ্বালা। আরও একটা কী। কাছে এসে দেখল একটা ভাঙা কাঠের সিংহাসন। সিংহাসনটা সরাতে গেল। ওটা একেবারেই ভেঙে পড়ল। বেশ শব্দ হল।
–কী হল? ওপর থেকে মারিয়ার ভয়ার্ত গলা শোনা গেল।
–কিছু না। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল। ফ্রান্সিস মশাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক ভালোভাবে দেখতে লাগল। মাকড়সার জাল একটা নাক চাপা গন্ধ এসব নিয়ে পরিত্যক্ত ঘর। কে জানে কত বন্দীর দীর্ঘশ্বাস মিশে আছে এখানকার পরিবেশে। নাঃ। কোন হদিশ পাওয়া যাচ্ছে না।
ফ্রান্সিস সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে এল। উৎসুক মারিয়া জিজ্ঞেস করল–কিছু হদিশ পেলে? ফ্রান্সিস মাথা এপাশ ওপাশ করল।
মশাল নিভিয়ে ফ্রান্সিসরা রাজবাড়ির বাইরে চলে এল। যোদ্ধা দু’জনকেফ্রান্সিস বলল– আজকে আর কোন খোঁজাখুঁজি নয়। তোমরা চলে যেতে পারো। যোদ্ধারা চলে গেল।
ঘরে এসে ফ্রান্সিস বিছানায় বসল। হ্যারি বলল
–কোন সূত্র পেলে?
–নাঃ। ঐ গর্ভগৃহে গুপ্তধন রাখা হয়নি। এখন বাকি রইল লুভিনা পাহাড়। কালকে পাহাড়ে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–গুপ্তধনের ব্যাপারটাই গন্ডগোলে। মারিয়া মন্তব্য করল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–গুপ্তধন বলে কথা। ওসব বরাবরই গোলমেলে ব্যাপার।
-বনেজঙ্গলে দেখলে গর্ভগৃহে দেখলে কোথাও তো পেলে না। মারিয়া বলল।
–পাহাড়টাও দেখবো। ফ্রান্সিস বলল।
–যদি ওখানে না পাও। মারিয়া বলল।
–আমরা সব নতুন করে দেখবো।
–আবার? মারিয়া প্রায় চেঁচিয়ে উঠল।
ফ্রান্সিস হেসে উঠল। বলল–সত্যি তোমার ধৈর্যশক্তি খুবই কম। এত সহজে হাল ছেড়ে দিচ্ছো?
–না বাপু। জাহাজে ফিরে চলো। মারিয়া বলল।
–শাঙ্কো যাক–তোমাকে জাহাজে রেখে আসুক। ফ্রান্সিস বলল। মারিয়ার একটু অভিমানই হল। দেয়ালে হেলান দিতে দিতে বলল
–তাহলে ধৈর্য ধরতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
রাত হল। মারিয়া ফ্রান্সিসদের সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে রাজবাড়ি চলে গেল। বার বার বলে গেল–আমি তোমাদের সঙ্গে যাবো কিন্তু।
রাজকুমারী আপনাকে রেখে আমরা যাবো না। আপনি সকালেই চলে আসবেন। হ্যারি বলল।
পরদিন ভোরেই মারিয়া চলে এল। সকালের খাবার খেয়ে এসে ফ্রান্সিস বলল হ্যারি–দেরি করো না। রোদ চড়ে যাবে। এখনই চলল।
তখনই সেনাপতি এল। সঙ্গে গতকালের সেই দুই পাহারাদার যোদ্ধা। সেনাপতি হেসে বলল–শুনলাম কালকে রাজবাড়িতে তল্লাশী চালিয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছো?
-কে আর দু’হাত ভরে গুপ্তধন দেবে? ফ্রান্সিসও হেসে বলল।
–হদিশ পেলে কিছু? সেনাপতি বলল।
–সময়ের সদ্ব্যবহার কীভাবে করবো? খাবোদাবো ঘুমুবো? ফ্রান্সিস বলল।
–না–তা নয়–মানে–
–আমরাই সময়ের ঠিক সদ্ব্যবহার করছি। চিন্তাভাবনা করছি-বুদ্ধির গোড়ায় শান দিচ্ছি। বুদ্ধিকে শাণিত করছি। আলস্যে সময় কাটাচ্ছিনা। ফ্রান্সিস বলল।
–যাগে–যেমন তোমাদের মর্জি। চলি। সেনাপতি চলে গেল।
ফ্রান্সিসরা দ্রুত তৈরী হয়ে নিল। প্রান্তর পার হয়ে জেলেপাড়ার ঘাটের দিকে চলল। সঙ্গে যোদ্ধা দুজনও চলল।
যেতে যেতে ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল বেশ বলশালী যোদ্ধাটি মাঝে মাঝেইওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। নৌকোয় উঠেও সে ফ্রান্সিসের পাশে বসল। এতে দাঁড় টানতে ফ্রান্সিসের বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। কিন্তু ও কিছু বলল না ব্যাপারটা হ্যারিও লক্ষ্য করেছিল।
