কিছুক্ষণের মধ্যে শাঙ্কোরা বেলচা জাতীয় জিনিস নিয়ে ফিরে এল। সবাই দল বেঁধে বনভূমির দিকে চলল। বনভূমির কাছে পৌঁছে ওরা দেখল মৃতদেহ দুটিকে ঘিরে কয়েকজন বন্ধু বসে আছে। ফ্রান্সিসরা যেতেই ওরা উঠে দাঁড়াল।
ফ্রান্সিস মৃত সার্ভো আর বন্ধুর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। ওর দু’চোখ জলে ভরে উঠল। হাত দিয়ে চোখ মুছে বলল–বনের ভিতর মৃতদেহ নিয়ে চলো। কয়েক জন বন্ধু মৃতদেহ দুটি কাঁধে নিয়ে বনের মধ্যে ঢুকল। পেছনে ফ্রান্সিসরা। বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। বনের মধ্যে ঢুকে ফ্রান্সিস চারদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চলল। কিছুদুর যেতেই দেখল একটা বড় গাছে অজস্র ফুল ফুটে আছে। জংলা গাছ। কিন্তু বেগুনি রঙের ফুলগুলি দেখতে বড় সুন্দর। ফ্রান্সিস ডাক–শাঙ্কো। শাঙ্কো এগিয়ে এল।
–এই গাছের নীচেই কবর দেওয়া হবে। গর্ত কর। ফ্রান্সিস বলল। বন্ধুরা সেই জায়গা ঘিরে দাঁড়িয়ে রইল। সিনাত্রা মৃদুস্বরে দেশের গান গাইতে লাগল। শোকের গান, দুঃখের গান।
খুব বেশি সময় লাগল না। দুটো কবর খোঁড়া দেওয়া হল। মৃতদেহ দুটি আস্তে আস্তে কররে নামিয়ে দেওয়া হল। বন্দুরা সেই গাছে আর ধারে কাছের গাছগুলোয় উঠে দু’হাত ভরে ফুল নিয়ে এল। মৃতদেহের ওপর ছড়িয়ে দিল। ফ্রান্সিস গর্তে নামল। দুটো তরোয়াল নিয়ে মৃতদেহের বুকের ওপর রেখে দিল। বন্ধুরা হাত বাড়িয়ে ফ্রান্সিসকে ওপরে তুলে নিল। ভাইকিং বন্ধুরা মারা গেলে ভেনই শেষকৃত্য করে। কিন্তু ভেন জাহাজে। কাজেই শেষকৃত্য কিছু হল না। ফ্রান্সিস এক মুঠো মাটি মৃতদেহের ওপর ছড়িয়ে দিল। এবার সবাই মাটি ঢেলে কবর ভরাট করতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মাটিতে কবর ভরাট হয়ে গেল। ফ্রান্সিস ফিরে দাঁড়িয়ে বলল– চলো। বসতি এলাকার দিকে ফ্রান্সিস হাঁটতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুরাও চলল। তখন সেই জংলা গাছ থেকে টুপটুপ ফুল ঝরে পড়ছে কবরের ওপর।
ওরা রেজামে যখন এল তখন বিকেল হয়ে এসেছে। সেই খুঁটির কাছে সর্দার দাঁড়িয়ে ছিল। ফ্রান্সিসকে দেখে বলল–রান্না হয়ে এসেছে। একটু পরেই খাওয়া।
ভাইকিংরা রেজাম চত্বরে বসে পড়ল। সবাই ক্ষুধাত। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবার সামনে লম্বাটে পাতা পেতে দেওয়া হল। পরিবেশন করা হল একটু পোড়া রুটি আর আনাজের ঝোল। তারপর মাংস। ক্ষুধাত ভাইকিংরা চেটে পুটে খেতে লাগল। খাওয়া শেষ হল।
সন্ধ্যে হয়ে এল। ফ্রান্সিস চত্বরে বসেছিল। এবার উঠে দাঁড়াল। বলল–হ্যারি–সবাই কে বলো। আর এখানেনয়। আমরা এখন ফিরে যাব। এখনোবিস্কোর খোঁজ পেলাম না। ও নিশ্চয়ই একাই ফিরে গেছে। এখানে আর দেরি করবো না। হ্যারি উঠে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–উঠে পড়ো। আমরা এখন ফিরে যাবো। এখানে আর নয়।
সব ভাইকিংরা উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস বনভূমির দিকে হাঁটতে শুরু করল। পেছনে ভাইকিং বন্ধুরাও চলল। বন পার হয়ে খাঁড়ির কাছে এল। বোধহয় জোয়ার শুরু হয়েছে। জল একটু বেড়েছে। জলে নামল সবাই। জলের মধ্যে পা টেনে টেনে পার হল সবাই।
বসতি এলাকা পার হয়ে প্রান্তর আর রাজবাড়ির কাছে যখন এলো তখন হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস–রাজার সঙ্গে এখন দেখা করবে না?
-না। আগে দেখিবিস্কো ফিরল কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
প্রান্তর পার হয়ে ফ্রান্সিস দ্রুত এসে ওদের ঘরের দোরগোড়ায় দাঁড়াল। ঘর ফাঁকা। কেউ নেই। বিস্কো ফিরে আসে নি। ফ্রান্সিস চিন্তা হল। ও বিছানায় বসল। হ্যারি ওর কাছে এল। বলল–তাহলে বিস্কো ফিরে আসেনি।
তাইতো দেখছি। ওর কি হল কিছুই বুঝতে পারছি না। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে হয়তো জাহাজে ফিরে গেছে। হ্যারি বলল।
–কিন্তু এভাবে না বলে কয়ে? ফ্রান্সিস একটু অবাক হয়েই বলল।
-বলার মত কাউকে কাছে পায়নি হয়তো। কয়েকটা দিন অপেক্ষা করো। ও নিশ্চয়ই আসবে। হ্যারি বলল।
তখনই সেনাপতি এসে হাজির। দু’হাতে দুটো মশাল। মশাল দুটো ঘরের দেওয়ালের খাঁজে বসিয়ে দিল। হেসে বলল–
–অন্ধকারে বসে আছে। তাই মশাল নিয়ে এলাম।
—আপনি আনলেন কেন? শাঙ্কো বলল।
-না-না। তাতে কি। তা শুনলাম তোমরা লড়াইয়ে জিতেছো। সেনাপতি বলল।
–হ্যাঁ। আপনাদের কোন রকম সাহায্য ছাড়াই। হ্যারি বলল।
—আপনি তোআপনার সৈন্যদের পালিয়ে আসতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
-না। আমি আপনাদের পেছনে পেছনে যেতে নির্দেশ দিয়েছিলাম। সেনাপতি বলল।
–না। পালিয়ে আসতে বলেছিলেন। ফ্রান্সিস গলায় জোর দিয়ে বলল।
–আমি তো এদেশীয় ভাষায় নির্দেশ দিয়েছিলাম। তুমি বুঝলে কী করে? সেনাপতি বলল।
সেনাপতি এবার দরজার দিকে দেখে নিয়ে গলা নামিয়ে বলল–আসলে সৈন্যরা সব মন্ত্রীর নির্দেশ মানে। আমার নির্দেশ মানে না। হয়ত মন্ত্রীমশাই সেরকম কোন নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন।
–যাক এসব কথা। যা হয়ে গেছে হয়ে গেছে। হ্যারি বলল।
সেনাপতিআরোও কিছু বলতে চেয়েছিল। কিন্তু ফ্রান্সিসদের অনাগ্রহী দেখে আস্তে আস্তে চলে গেল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল হ্যারি–সবকিছুর মূলে ঐ মন্ত্রী স্তিফানো।
–আমারও তাই মনে হয়। হ্যারি বলল।
পরদিন সকালের খাবার খাওয়া হল। হ্যারি বলল
–ফ্রান্সিস রাজার কাছে তোমার একবার যাওয়া উচিত।
–কী আর বলবো রাজাকে গিয়ে। ফ্রান্সিস বলল।
–অন্তত বিশ্বাসঘাতকস্তিফানোর ব্যাপারটা যাচাই করতে পারবে। হ্যারি বলল।
