আস্তে আস্তে কাটা জায়গার জ্বালা কমল। রক্ত পড়া বন্ধ হল। মেয়েটি তখন একটা মোটা কাপড়ের ন্যাকড়া নিয়ে এল। কাটা জায়গাটা বেঁধে দিল। বিস্কো অনেকটা আরাম বোধ করল।
মেয়েটি বয়স্ক লোকটিকে কী বলল, লোকটি বেরিয়ে গেল। মেয়েটি হাত নেড়ে বিস্কোকে অপেক্ষা করতে বলে পাশের ঘরে ঢুকে গেল। বিস্কো শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল ও তো দলছাড়া হয়ে গেল। চারপাশের শান্ত অবস্থা দেখে বুঝল লড়াই শেষ। আর এলুডা যোদ্ধাদের কু উ উ ডাক শোনা যাচ্ছে না। ওরা নিশ্চয়ই হেরে গেছে। ফ্রান্সিসরা ওর খোঁজ না পেয়ে নিশ্চয়ই চিন্তায় পড়েছে। বিস্কো ভাবল–এখানেই থাকি। সুস্থ হয়ে রাজা প্রোফেনের দেশে গিয়ে ফ্রান্সিসদের সঙ্গে যোগ দেব।
অল্প পরে মেয়েটি পাশের ঘর থেকে এ ঘরে এল। হাতে দুটো কাঠের বাটি। একটা বাটি বিস্কোর দিকে এগিয়ে ধরল। বিস্কো বাটিটা নিল। দেখল বাটিতে আনাজপত্রের ঝোলমত। মেয়েটি নিজেও একটা বাটি নিয়ে চুমুক দিয়ে খেতে লাগল। বিস্কোও খেতে লাগল। বেশ সুস্বাদু। খেতে খেতে বিস্কো বলল–তোমার নাম কি? প্রোমা। মেয়েটি হেসে বলল।
তখন সকাল হয়ে গেছে। বাইরে লোকজনদের কথাবর্তা শোনা যাচ্ছে। প্রোমা বাটি নিয়ে ভেতরের ঘরে চলে গেল।
ওদিকে ফ্রান্সিসরা খুব চিন্তায় পড়ে গেছে। বিস্কোকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তবে কি বিস্কো লড়াইএ মরে গেল? তিনচারজন ছুটল বিস্কোকেখুঁজতে। ওরা নিরাশ হয়ে ফিরে এল।
ভোরের আলো ফুটল। ফ্রান্সিস সর্দারের বাড়ির সামনে এল। মোটামুটি কাঠের ভালো দরজা জানালা।
–সিনাত্রা–দরজায় ধাক্কা দাও তো। ফ্রান্সিস বলল। সিনাত্রা এগিয়ে গিয়ে দরজায় জোরে ধাক্কা দিল। বার কয়েক ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেল। সেই মোটামত লোটা এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসকে দেখেই চিনল। বলল–তোমরা-হত্যা-সর্দার। ফ্রান্সিসও লোকটাকে আগে দেখেছিল।
তাই তো তুমি সর্দার হতে পারলে। যাগে–তোমরা হেরে গেছ। এই এলুডা দেশ এখন আমাদের দখলে। তবে আমরা এখানে থাকবো না। তোমাদের দেশ এখন তোমরাই রাজত্ব করবে। কিন্তু এই দেশ জয় করার পিছনে আমাদের একটা উদ্দেশ্য আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–কী? নতুন সর্দার বলল।
–এখানে অপরাধী যে কোন রকম অপরাধ করুন না কেন তাকে জ্যান্ত পোড়াননা চলবে না। এই প্রথা চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। এই শর্তে তোমাকে সর্দার রেখে এ দেশ ছেড়ে আমরা চলে যাব। কী–রাজি? ফ্রান্সিস বলল।
–এবার তোমাদের একটা উঠোনমত আছে যেখানে খুঁটির সঙ্গে তোমাদের বিবেচনায় যে বা যারা অপরাধী তাদের বেঁধে রাখো। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। রেজাম। সর্দার বলল।
তার মানে ঐ উঠোনের নাম। সর্দার মাথা ওঠা নামা করল।
–কিছুক্ষণের মধ্যে ঐ রেজামে দেশবাসীদের যোদ্ধাদের একত্র কর। তাদের উদ্দেশে আমার কিছু বলার আছে। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ। খবর-হবে। সর্দার বলল।
–তাহলে আমরা রেজামে যাচ্ছি। তুমি এর মধ্যে খবর দাও। সবাইকে একথাও বলল যে আমরা কারোও কোন ক্ষতি করবো না। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ। তবে–পুড়িয়ে মারা–বিরোধী–আমি–সর্দার তাড়িয়ে আমাকে–মাপ–ফিরেছিলাম। সদার বলল।
–হুঁ। ঠিক আছে। তুমি সবাইকে ডাকো। আমি তোমাদের কিছু বলতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
সর্দার চলে গেল।
দুপুরের আগে থেকেই রেজামে লোক জড়ো হতে লাগল। অনেক যোদ্ধাও এল। রেজাম ভরে গেল লোকে।
ফ্রান্সিস সেই জমায়েতের সামনে এসে দাঁড়াল। সর্দারকে ওর কাছে ডাকল। বলল আমার সব কথা তো সবাই বুঝবেনা। তুমি আমার কথা ওদের ভাষায় বুঝিয়ে দাও। সর্দার ফ্রান্সিসের পাশে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলতে লাগল–এলুডার-ভাই বোনেরা–আমরা এদেশ জয় করেছি। কিন্তু আমরা এখানে থাকব না। তোমাদের দেশ তোমাদের সর্দারই শাসন করবে। স্বাধীন ভাবে। মাত্র একটা উদ্দেশ্যেই আমরা এই দেশ জয় করেছি। এখানে অপরাধীকে পুড়িয়ে মারার প্রথা প্রচলিত আছে। আমাদেরও বন্দী করে পুড়িয়ে মারার চেষ্টা করা হয়েছিল। এখানে এই অমানবিক ভয়াবহ প্রথা বন্ধ করতে হবে। তোমাদের সর্দারকে সেই নির্দেশ দিয়েছি। আমাদের কাজ শেষ। আমরা আমাদের এক মৃত বন্ধুকে কবর দিয়ে রাজা প্রোফেনের দেশে ফিরে যাব। রাজা প্রোফেনকে অনুরোধ করব তিনি যেন তোমাদের সঙ্গে সদ্ভাব রাখেন। তোমরাও রাজা প্রোফেনের দেশের সঙ্গে সদ্ভাব রাখবে–এইঅনুরোধ। আমার আর কিছু বলার নেই। ফ্রান্সিস থামল। সর্দার দেশীয় ভাষায় ফ্রান্সিসের বক্তৃতা গলা চড়িয়ে বলল। উপস্থিত জনতা বেশ সমর্থন জানাল। সভা ভেঙে গেল। সবাই চলে যেতে লাগল।
তখনই শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে ছুটে এল। বলল–ফ্রান্সিস আমাদের এক আহত বন্ধু মারা গেল। ফ্রান্সিস মাথা নিচু করল। সখেদে বলে উঠল–ওদের চিকিৎসা পর্যন্ত করাতে পারলাম না। যাক গে–চল–ওদের কবরের ব্যবস্থাটা আগে করি।
কিন্তু ফ্রান্সিস–আমরা সবাই খুব ক্ষুর্ধাত। সিনাত্রা বলল।
–না। ওদের কবর না দিয়ে আমরা কেউ খাবো না। ফ্রান্সিস বলল।
—পরে খাবারের ব্যবস্থা করি। শাঙ্কো বলল।
–বেশ সর্দারকে বলো আমাদের এখানেই খাবারের বন্দোবস্ত করুক। ফ্রান্সিস বলল।
–কোথায় কবর দেবে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–ঐ এলুডা পাহাড়ের নীচের বনভূমিতে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর বলল–মাটিতে গর্ত খোঁড়ার জন্য বেলচা জাতীয় কিছু জোগাড় কর। শাঙ্কো চলে গেল। সঙ্গে দু’তিনজন … বন্ধুও গেল।
