কিছু পরে বন শেষ। হাত পঞ্চাশেক দুরে এলুডার বসতি এলাকা শুরু হয়েছে। বন থেকে বেরিয়ে ফ্রান্সিস আক্রমনের জন্যে তৈরি। হঠাৎ পেছনে সেনাপতি উঁচু গলায় দেশীয় ভাষায় কী বলে উঠল। ফ্রান্সিস বুঝল না সেটা। ভাবল সার্ভোকে জিজ্ঞেস করবে সেনাপতি কী আদেশ দিল। পেছন ফিরে দেখল সার্ভোরা তখনও জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসেনি। ওদিকে নিস্তদ্ধ রাতে সেনাপতির নির্দেশের শব্দ বেশ জোরালো হল। কাছেই বসতি এলাকার লোকদের কানে পৌঁছাল সেই কথা। সঙ্গে সঙ্গে এসব ঘর থেকে কোন যোদ্ধার তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এল-কু-উ-উ-উ। সঙ্গে সঙ্গে আশে পাশে ঘর গুলো থেকে বর্শা হাতে যোদ্ধারা বেরিয়ে আসতে লাগল। এরা যোদ্ধার জাত। সবসময় লড়াই-এর জন্যে তৈরী থাকে। কু-উ-উ ধ্বনি চলল।
ফ্রান্সিস বুঝল এখন লড়াই ছাড়া উপায় নেই। ও পেছনে ফিরে তাকাল। সেনাপতি বা তার সৈন্যদের চিহ্নমাত্র নেই। ও ভাবল হয় তো আসতে দেরি হচ্ছে। কিন্তু এক্ষণি তো লড়াই শুরু করতে হবে। তখনই সার্ভো ছুটে ফ্রান্সিসসের কাছে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–সেনাপতি তার সৈন্যদের পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
-বলো কি। ফ্রান্সিস ভীষনভাবে চমকে উঠল। কিন্তু এখন আর পিছু ফেরা যাবে না। এলুডার যোদ্ধারা অনেক কাছে চলে এসেছে। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল– আক্রমন কর। ভাইকিংরা ছুটে গেল এলুডার যোদ্ধাদের দিকে। মুহূর্তে লড়াই শুরু হল।
প্রথম সংঘর্ষেই দুতিনজন ভাইকিং যোদ্ধা অল্পবিস্তর আহত হল বর্শার ঘায়ে। অন্যেরা আগুপিছু বর্শা চালাতে লাগল। এলুডার যোদ্ধারা বর্শা ছুঁড়তে লাগল। একটা বর্শা উড়ে এসে সার্ভোর বুকে বিঁধে গেল। ফ্রান্সিস দেখল সেটা। ও ছুটে গিয়ে বর্শাটা সার্ভোর বুক থেকে টেনে বের করল। রক্ত পড়তে লাগল। সার্ভো ম্লান হাসল। তারপর আস্তে আস্তে চোখ বুজল। সার্ভো মারা গেল। তখনই একটা বর্শা উড়ে এসে ফ্রান্সিসের মাথার ওপর দিয়ে সামনে মাটিতে গেঁথে গেল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তারপর বর্শা ছুঁড়ে মারল এলুডার যোদ্ধার দিকে। একজন যোদ্ধার কাঁধে গেঁথে গেল সেই বর্শা।
ততক্ষণে এলুডার অনেক যোদ্ধার হাতে বর্শা ছুঁড়ে মারার আর কোন অস্ত্র নেই। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল
–তরোয়াল-আক্রমন। বর্শা ফেলে ভাইকিংরা তরোয়াল বের করে ছুটল নিরস্ত্র যোদ্ধাদের দিকে। নিরস্ত্র যোদ্ধারা তখন অসহায়। প্রাণভয়ে ওরা পালাতে করল। যাদের হাতে বর্শা ছিল তাদেরও পরাস্ত করল ভাইকিংরা।
কিছুক্ষণের মধ্যে মাঠের মধ্যে পড়ে রইল আহত এলুডার যোদ্ধারা। ফ্রান্সিসের নির্দেশে আহত ভাইকিং কজন বনের আড়ালে চলে গেল।
ফ্রান্সিস এবার নিরস্ত্র যোদ্ধাদের তাড়া করল। বাকিযেযাদ্ধারা পালাতে লাগল। ফ্রান্সিস বসতি এলাকায় ঢুকে পড়ল।
বাড়ি ঘরে আড়াল পড়ে যাওয়ায় বিস্কো একা পড়ে গেল। এপথ ওপথ ঘুরে ও সেই উঠোনের মত জায়গাটায় এল। এক কোণে দুটো মশাল জ্বলছে। মশালের আলোয় দেখল উঠোনের মাঝখানে একটা বড় কাঠের খুঁটি। খুঁটির সঙ্গে পা বাঁধা তিনজনের দু’জন পুরুষ আর একটি মেয়ে। বিস্কো ঠিক করল ওদের মুক্তি দেবে। বিস্কো আস্তে আস্তে ওদের কাছে গেল। বিস্কোকে খোলা তরোয়াল হাতে ওদের দিকে আসতে দেখে মেয়েটি ভয়ার্ত চিৎকার করে উঠল। বিস্কো হেসে হাতের তেলো দেখিয়ে মেয়েটিকে আশস্ত করল। তারপর নিচু হয়ে তরোয়াল দিয়ে পোঁচ দিয়ে দিয়ে ওদের পায়ে বাঁধা শুকনো লতার বাঁধন কেটে দিল। বাঁধন কাটতেই পুরুষ দু’জন ছুটে পালিয়ে গেল। মেয়েটিও পালাত। কিন্তু পালাল না যখন দেখল একটা ঘরের আড়াল থেকে একজন সি এলুডার যোদ্ধা একটা বর্শা ছুঁড়ে মারছে আর বিস্কো সাবধান হবার আগেই বর্শা বিস্কোর বাঁ কাঁধে কেটে দিয়ে মাটিতে পড়ে গেল। বিস্কো উঃ শব্দ করে বাঁ কাধ চেপে ধরল। রক্ত বেরিয়ে এল। বিস্কো উঠে দাঁড়াল। ততক্ষণে যোদ্ধাটি পালিয়ে গেছে। মেয়েটির শুকনো মুখ। মাথার চুল অবিন্যস্ত। ওর আর পালানো হল না। ও বিস্কোর ডান হাত ধরল। ইঙ্গিত করল ওর সঙ্গে হাঁটার জন্যে। বিস্কো মাথা নাড়ল। মেয়েটি করুণ চোখে বিস্কোর দিকে তাকিয়ে দেশীয় ভাষায় কিছু বলল। বিস্কো কিছু বুঝল না। মেয়েটি বার বার ওর কাটা জায়গাটা দেখতে লাগল। বিস্কো বুঝল যে ও যে আহত সেটাই মেয়েটা বোঝাতে চাইছে। দেখা যাক মেয়েটি ওকে কোথায় নিয়ে যায়। বিস্কো ওর পাশে এসে দাঁড়াল। মেয়েটি একসঙ্গে হাঁটার জন্যে ইঙ্গিত করল। তারপর হাঁটতে লাগল।
তখন লড়াই শেষ। এলুডার যোদ্ধারা হেরে গেছে। বিস্কো তার কিছুই জানে না। ও মেয়েটির পেছনে পেছনে হেঁটে চলল। বসতি এলাকায় এসে একটা ঘরের সামনে মেয়েটি এসে দাঁড়াল। পাথর বালি মাটির ঘর। ছাউনি শুকনো ঘাসপাতার। ঘরের এড়ো খেবড়ো কাঠের দরজা। মেয়েটি দরজা খুলে ফেলল। ঘরে একজন বয়স্ক লোক মেঝের বিছানায় শুয়ে ছিল। মেয়েটিকে দেখে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে এসে মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। বিস্কো তো জানেনা কী ভয়ানক শাস্তি থেকে ও মেয়েটিকে বাঁচিয়েছে।
মেয়েটি ঐ অবস্থায়ই বিস্কোকে দেখিয়ে বার বার কী বলল। বয়স্ক লোকটি বিস্কোকেও জড়িয়ে ধরল। তখন লোকটি কাঁদছে। এবার কান্না থামিয়ে বিস্কোকে ঘাসের বিছানায় বসতে ইঙ্গিত করল। বিস্কো বিছানায় করল। রক্ত পড়ায় বিস্কো নিজেকে বেশ দুর্বল মনে করছিল। ও একটু বসে থেকে শুয়ে পড়ল। লোকটি পাশের ছোট ঘরটায় ঢুকল। একটা হলুদ রঙের গলা ডেলা নিয়ে এল। বিস্কোর কাঁধের জায়গায়টায় ঐ ডেলাটা চেপে ধরল। ক্ষতস্থানটা যেন জ্বলে উঠল। বিস্কোর মুখ থেকে কাতরোক্তি বেরিয়ে এল– আহ। মেয়েটি একটু হেসে হাতের তেলো দেখিয়ে ওকে অপেক্ষা করতে ইঙ্গিত করল। এবার মেয়েটির সঙ্গে লোকটির কিছু কথাবার্তা চলল। বিস্কো কিছুই বুঝল না। তবে এটা বুঝল লোকটি মেয়েটির বাবা। বোধহয় মা নেই।
