ফ্রান্সিস মাঝখানটায় এসে ডুব দিল। ফ্রেদারিকো ঠিকই বলে ছিল। গভীরতা বেশি নয়। খুব তাড়াতাড়ি তলায় পৌঁছে গেল। আর তিনটে মুক্তো তুলতে পারলেই মুক্তি আমাদের সকলের। কিন্তু এ কি? ফ্রান্সিসের মাথাটা ঘুরে উঠলো। আয়নার আলোর প্রতিফলন তো দেখা যাচ্ছে না! কোথায় গেল আয়নাটা? হয়তো উলটে গেছে। আর এক মুহূর্ত দেরি করা চলবে না। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে হাতে-পায়ে জল ঠেলে, জলে কয়েকটা ধাক্কা দিয়ে ওপরে ভেসে উঠলো। তীরের দিকে সাঁতরাতে যাবে, তখনি দেখলো সারা তীর জুড়ে জলদস্যুরা তরোয়াল, বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে। ওকে ভেসে উঠতে দেখে সবাই অস্ত্র উঁচিয়ে হৈ-হৈক’রে উঠল। শয়তান লা ব্রুশ! তোমার মতলব আমার কাছে পরিষ্কার! ফ্রান্সিস মনে-মনে বলল। তারপর এক মুহূর্ত দেরী না করে প্রাণপণে কাঁচ পাহাড়ের দিকে সাঁতার কাটতে লাগল। ফ্রেদারিকো একটা সুড়ঙ্গমত পথ পেয়েছিল সেটা কোথায়? এই রহস্যটুকু ভেদ করার মধ্যে ওর জীবন-মৃত্যু নির্ভর করছে। ও কাঁচপাহাড়ের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে সাঁতার কাটতে লাগল। হঠাৎ বিদ্যুৎ তরঙ্গের মত একটা চিন্তা ওকে নাড়া দিয়ে গেল। ঐ যে কাঁচ পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু মাথাটা, ওটা বাঁদিকে কাত হয়ে ভাঙা কাঁচের মত উঁচিয়ে হুঁচালো হয়ে আছে না? ফ্রেদারিকোর আয়নাটাও সোজা করে ধরলে ঠিক এমনি–বাঁকা ছুঁচালো একটা দিক ছিল। গলায় ঝোলাবার দড়ি পরবার জন্যে ঠিক ছুঁচলো মাথার নীচে বরাবর ছিল ফুটোটা কি শুধু দড়ি পরাবার জন্য ছিল?–না—না–ভীষণ ভাবে চমকে উঠে ফ্রান্সিস প্রায় চীৎকার করে উঠলো–ওটাই সুরঙ্গ পথের ইঙ্গিত। আর এক মুহূর্ত দেরী নয়। শেষ রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে!
শরীরের সমস্ত শক্তি একত্র করে ফ্রান্সিস কাঁচপাহাড়ের চূড়ো লক্ষ্য করে সাঁতার কাটতে। লাগল। একটু পরেই নীচে একটা জলের টান অনুভব করল। আর একটু এগোতেই প্রচন্ড জলের টানে ও তলিয়ে গেল। কিছু স্পষ্ট চোখে পড়ছে না। শুধু দেখলো একটা অন্ধকার গহ্বরের মধ্যে দিয়ে ও প্রচন্ড বেগে ছুটে চলেছে জলের টানের সঙ্গে সঙ্গে। হঠাৎ অন্ধকার কেটে গেল। এখানে আলো আছে। জলের টান আর নেই। হাতে-পায়ে জল ঠেলে ফ্রান্সিস ওপরে ভেসে উঠলো। পেছনে তাকিয়ে দেখলো, কাঁচপাহাড় টানা চলেছে সোফালা বন্দরের দিকে। সামনে অসীম সমুদ্র। আঃ–মুক্তির উল্লাস ও জলের মধ্যে দুটো পাক খেল।
ফ্রান্সিস গা ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ দম নিলো। তারপর আস্তে-আস্তে সাঁতার কেটে চলল সোফালা বন্দরের দিকে।
সোফালা বন্দরের কাছাকাছি এসে একটা পাথরের আড়ালে ও হাঁপাতে লাগল। পশ্চিমদিকে তাকিয়ে দেখল সূর্য অস্ত যেতে দেরি আছে। দূরে লা ব্রুশের ক্যারাভেল আর ওদের জাহাজটা দাঁড়িয়ে আছে। আকাশ, সমুদ্রতীরের দিকে সামুদ্রিক পাখিগুলো উড়ে বেড়াচ্ছে, আর তীক্ষ্মস্বরে ডাকছে। ও বিমুগ্ধ চোখে তাকিয়ে মুক্ত প্রকৃতির রূপ দেখতে লাগল। কতদিন এই আকাশ, মাটি, পাখি, সমুদ্র দেখিনি। কতদিন? হঠাৎ হ্যারি আর অন্য বন্ধুদের বন্দী জীবনের কথা মনে পড়তে ওর মনটা খারাপ হয়ে গেল।
পশ্চিমদিকের আকাশ আর সমুদ্রে গভীর লাল রং ছড়িয়ে সূর্য অস্ত গেল। কিন্তু তখনই অন্ধকার নেমে এল না। চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসার জন্যে ফ্রান্সিসকে বেশ কি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো।
রাত্রি নেমে আসতেই ফ্রান্সিস ওদের জাহাজটার দিকে সাঁতরে চলল। জাহাজের কাছে পৌঁছে ও নোঙর বাঁধা মোটা কাছিটা বেয়ে-বেয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এল। লা ব্রুশ এই জাহাজে কোন পাহারাদার রাখে নি। ওকে আর লুকিয়ে কেবিনঘরে আসতে হলো না। কেবিনঘরে আসার সময় ও আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে দেখল, ক্যারাভেল-এ দু’জন পাহারাদার জলদস্যু ঘুরে বেড়াচ্ছে। ও ভেবে নিশ্চিন্ত হলো যে ওদের জাহাজটা অন্ততঃ নিরাপদ। এখানে নির্বিবাদে আশ্রয় নেয়া চলবে।
নিজের কেবিনে ঢুকে ফ্রান্সিস ভেজা জামাকাপড় ছাড়ল। ভীষণ খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে হয়। রসুইঘরে গিয়ে ঢুকল। উনুন ধরিয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে গরম-গরম রুটি আর সুপ তৈরি করল। পেট ভরে খেয়ে কেবিনঘরে ফিরে এসে শুয়ে পড়ল। অনেক চিন্তা মাথায়। কি করে বন্ধুদের মুক্তি করা যাবে? কি করে হীরেসুদ্ধ জাহাজটা নিয়ে পালানো যাবে? ও যে মুক্তি পেয়েছে, এটা বন্ধুদের জানানো প্রয়োজন। কিন্তু কি করে জানাবে?
দু’তিনদিন কেটে গেল। ফ্রান্সিস ওদের জাহাজেই লুকিয়েই রয়েছে। খায়-দায় আর ভাবে, কি করে বন্ধুদের মুক্ত করা যায়। ওদিকে লা ব্রুশ-এর ক্যারাভেল-এ যথেষ্ট সংখ্যক জলদস্যুরা রয়েছে, ওদের দৃষ্টি এড়িয়ে বন্ধুদের মুক্ত করা অসম্ভব। ফ্রান্সিস সুযোগের প্রতীক্ষায় রইল।
ওদিকে বড় সর্দার কয়েকজন জলদস্যুকে নিয়ে পলাতক ভাজিম্বাদের খোঁজে বন জঙ্গল তোলপাড় করছিল। রাজা, মন্ত্রী, সেনাপতি তো দূরের কথা কোনো সাধারণ ভাজি যোদ্ধাকেও ওরা খুঁজে বের করতে পারল না।
একদিন বিকেলের দিকে পাহাড়ী এলাকায় বড় সর্দার দলবল নিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে, হঠাৎ একটা পাথরের আড়াল থেকে একটা বর্শা ছুটে এসে বড় সর্দারের পিঠে বিধে গেল। বড় সর্দার উবু হয়ে পাথরের ওপর পড়ে গেল। বর্শাটা পিঠ ভেদ করে বুক পর্যন্ত চলে এসেছে। বড় সর্দার মাটিতে পড়ে কাতরাতে লাগল। দুতিনজন জলদস্য মিলে বর্শাটা খুলে ফেলল। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। আহত বড় সর্দারকে কাঁধে নিয়ে ওরা রাজবাড়িতে নিয়ে আসার পথে বড় সর্দার মারা গেল। বড় সর্দারের সঙ্গীরা অবশ্য যে পাথরের আড়াল থেকে বর্শাটা ছুটে এসেছিল, সেখানে তন্ন-তন্ন করে খুঁজল, কিন্তু কারোর দেখা পেল না। ওদের মনে বেশ ভয়ও ঢুকেছিল। আবার কখন কোন পাথরের আড়াল থেকে বর্শা ছুটে আসে। ওরা সন্ধ্যে হবার আগেই ঐ তল্লাট ছেড়ে চলে এল।
