তার জন্যে আমাদের তো বর্শা চাই। শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। আমি কাল সকালে রাজসভায় যাচ্ছি। আমরা আমাদের জন্যে বর্শা চাইবো। কীভাবে আমরা লড়াই করতে চাই সেটা সেনাপতিকে বুঝিয়ে বলবো। কেউ কিছু বলবে? কেউ কোন কথা বলল না। বোঝা গেল লড়াইয়ের জন্যে ফ্রান্সিসের পরিকল্পাই মেনে নিল সবাই।
পরদিন ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে রাজদরবারে গেল। তখন রাজদরবারের কাজকর্ম চলছিল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি একপাশে অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে কাজকর্ম শেষ হল। উপস্থিত প্রজারা বেরিয়ে গেল। রাজা প্রোফেন ইঙ্গিতে ফ্রান্সিসকে ডাকল। ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। একটু মাথা নুইয়ে সম্মান জানিয়ে বলল–মান্যবর রাজা–আমরা কাল গভীর রাতে খাঁড়ি পার হয়ে এলুডা আক্রমন করবো স্থির করেছি। আমার বন্ধুরা এসে গেছে। এবার আপনার সেনাপতিকে দয়া করে নির্দেশ দিন তিনি যেন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে আমাদের সঙ্গে যান।
রাজা প্রোফেন যথারীতি স্তিফানোর দিকে তাকালেন। স্তিফানো বলল–ঠিক আছে সেনাপতি প্রান্তরে সৈন্য সামাবেশ করবেন। তখন তোমরা যাবে। সেনাপতি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে তোমাদের পেছনে পেছনে যাবে।
-বেশ। তবে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–কী সমস্যা? রাজা জানতে চাইলেন।
–আমাদের তো বর্শা নেই। আমাদের সবাইকে বর্শা দিতে হবে।
–কেন? স্তিফানো একটু বিরক্তির ভঙ্গীতে বলল। ফ্রান্সিস সেই বিরক্তি গায়ে মাখল না। বলল–এলুডার যোদ্ধারা বর্শা দিয়ে লড়াই করবে। ওদের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে বর্শাও চাই।
–তোমরা কীভাবে লড়াই করতে চাও? সেনাপতি জিজ্ঞেস করল।
–আমরা প্রথমে বর্শা দিয়ে লড়াই করে ওদের আহত করবো। আমরা হত্যাটা যথাসাধ্য এড়িয়ে চলি। তারপর তরোয়াল দিয়ে লড়াই করবো। ফ্রান্সিস বলল। সেনাপতির সঙ্গে কথা বলে।
নিজেদের ঘরে ফিরল ফ্রান্সিস আর হ্যারি। বন্ধুরা সব জানতে চাইল। ফ্রান্সিস রাজা ও স্তিফানের সঙ্গে যা যা কথা হয়েছে সেসব বলল। আর বলল সন্ধ্যের সময় আমরা বর্শাগুলো পেয়ে যাবো।
দুপুরে সৈন্যবাসের খাবার ঘরে ফ্রান্সিসরা যখন খাচ্ছে তখনই সেনাপতি এল। ফ্রান্সিসের কাছে এসে বলল–
কী? তোমরা তৈরি তো?
–হ্যাঁ-হ্যাঁ। ফ্রান্সিস মাথা কাত করে বলল।
–কখন রওনা হবে তোমরা? সেনাপতি জানতে চাইল।
–একটু বেশি রাতে। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা আগে প্রান্তরে জমায়েত হবে। তোমরা এলে আমাদের সৈন্যরা আসবে। সেনাপতি বলল।
–ঠিক আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–ঐ, বন্দী ছিল–সার্ভো–ও-ও কি যাবে? সেনাপতি জানতে চাইল।
–হ্যাঁ–ওকে দরকার পড়বে। আমার কিছু বলার থাকলে সার্ভো এদেশীয় ভাষায় আপনার সৈন্যদের বোঝাতে পারবে। ফ্রান্সিস বলল।
–সব নির্দেশ আমিই দেব। সেনাপতি গলায় একটু জোর দিয়েই বলল।
–সে অধিকার আপনার নিশ্চয়ই আছে। তবে সময় বিশেষে আমার নির্দেশও আপনার সৈন্যদের মানতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–না। শুধু আমার নির্দেশই সবাইকে মানতে হবে। সেনাপতি বলল।
তখন হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস উনি সেনাপতি। কী ভাবে আমরা লড়াই করবো সেটা তো উনিই বলবেন।
–বেশ। ও কথাই রইল। তবে কখনো আমি কোন নির্দেশ দিলে আপনার অনুমতি নিয়েই সেই নির্দেশ দেব। এতে আপনি রাজি তো? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। এতে আমার আপত্তি নেই! সেনাপতি বলল। তারপর চলে গেল।
সন্ধ্যের কিছু আগে। ফ্রান্সিস নিজেদের ঘরে শুয়ে বসে আছে এমন সময় কয়েকজন যোদ্ধা বর্শা নিয়ে এল। বর্শা রেখে ওরা চলে গেল। ফ্রান্সিসদের পাঁচটা বর্শা কম পড়ল। ফ্রান্সিস বলল ঠিক আছে যা পেয়েছি তাই নিয়ে লড়বো।
রাতের খাবার বেশ তাড়াতাড়িই খাওয়া হল।
ফ্রান্সিসরা সবাই শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়তে পড়তে বলল–কেউ ঘুমুবে না। বিশ্রাম নাও।
রাত বেড়ে চলল। এক সময় ফ্রান্সিস উঠে বসল। গলা চড়িয়ে বলল–সবাই উঠে পড়। বাইরের প্রান্তরে গিয়ে দাঁড়াও। রাজার সৈন্যরা ওখানেই আসবে।
সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে এল। সার্ভো বলল
–ফ্রান্সিস–আমি আর যাবো না।
–না। তুমিও চলো। তোমাকে লড়াই করতে হবে না। আমাদের সঙ্গে থাকবে শুধু। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই তৈরি হয়ে প্রান্তরে এসে দাঁড়াল। আজকে চাঁদের আলো বেশ উজ্জ্বল। চারিদিকভালোই দেখা যাচ্ছে।
কিছু পরে রাজা প্রোফেনের সৈন্যরা দল বেঁধে এল। সেনাপতি এল। উঁচু গলায় বলল–সবাই জেলেপাড়ার দিকে চলো। ওখান দিয়েই আমরা খাঁড়ি পার হবো।
ফ্রান্সিসরা আগে পেছনে চলুল রাজার সৈন্যরা। তাদের সঙ্গে সেনাপতি।
এত লোকেরা যাচ্ছে। শব্দ হল। জেলেপাড়ার লোকেদের কারো কারো ঘুম ভেঙে গেল। জানালা দিয়ে সৈন্যদের যেতে দেখে বুঝল ওরা লড়াই করতে যাচ্ছে। ফ্রান্সিসদের দেখে ভাবল তাহলে এই বিদেশীরাও সৈন্যদের সঙ্গে চলেছে লড়াই করতে।
জেলেপাড়ায় ঘাট দিয়ে সবাই জলে নামল। অগভীর খাঁড়ি। জল হাঁটুর ওপর উঠল না। কিন্তু জল ঠেলে যাওয়ার শব্দ হতে লাগল। ফ্রান্সিস জল ঠেলে সেনাপতির কাছে এল। বলল
–জলে যাতে বেশি শব্দ না হয় সেটা আপনার সৈন্যদের বলুন। সেনাপতি একটু গলা চড়িয়ে দেশীয় ভাষায় বলল সে কথা। এবার জলে কম শব্দ হতে লাগল।
খাঁড়ি পার হল সবাই। জনা পাঁচেক বাদে ফ্রান্সিসদের সবার হাতে বর্শা। সেনাপতি ও সৈন্যদের কোমরে তরোয়াল। খাঁড়ি থেকে উঠে সামনেই বনভূমি। খুব ঘন বন নয়। ছাড়া ছাড়া গাছ গাছালি। সবাই বনের মধ্যে দিয়ে চলল। ভাঙা ভাঙা জ্যোৎস্না পড়েছে। বনের এখানে ওখানে। গাছের গুঁড়ি এড়িয়ে সবাই চলল।
