দূর থেকে শাঙ্কো বেশ কয়েটা দেশি নৌকা তীরে বাঁধা। ওরা ঘাটে এল। দেখল কিছু জেলেদের বাড়ি ঘর। কয়েকজন জেলে ঘরের বাইরে বসেছিল। সার্ভো ওদের একজনকে দেশীয় ভাষায় জিজ্ঞেস করল–
–তোমাদের কর্তা কোথায়? একজন আঙুল তুলে একটা ঘর দেখাল। সার্ভো আর শাঙ্কো সেই ঘরে ঢুকল। দেখল একজন কালো মানুষ মেঝের ঘাসপাতার বিছানার ওপর বসে আছে। সার্ভো বলল–কর্তা– তিনটে নৌকা চাই।
–নৌকা নিয়ে কী করবেন? কর্তা জানতে চাইল।
–এলুডার জাহাজ ঘাটায় একটা জাহাজ আছে। সেই জাহাজে যাবো।
—ভোরে মাছ ধরতে যাবো আমরা। তার আগেই নৌকা নিয়ে ফিরে আসা চাই। জেলে কর্তা বলল।
–আমরা সন্ধ্যের আগেই ফিরে আসবো। শার্ভো বলল।
–বেশ। কিন্তু ভাড়া লাগবে। জেলে কর্তা বলল।
সার্ভো শাঙ্কোর দিকে তাকাল। ভাড়ার কথা বলল। শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে একটা সোনার চাকতি বের করে কর্তাকেদিল। সোনা দেখে কর্তা খুব খুশি। বলল নৌকা চালানোর লোক লাগবে? সার্ভো শাঙ্কোকে সেই কথা বলল। শাঙ্কো বলল– বলো যে আমি একাই নৌকা বেঁধে নিয়ে যাবো। সার্ভো কর্তাকে বলল–সে কথা। কর্তা আপত্তি করল না। শুধু বলল–আজ রাতে জোয়ার আসবে? তার আগেই চলে আসে যেন। জোয়ারের সময় নৌকা চালানো কঠিন। সার্ভো শাঙ্কোকে সে কথা বলল। শাঙ্কো বলল- বলো যে আমরা ভাইকিং। নৌকা চালানোয় দক্ষ। সার্ভো কর্তা সে কথা বলল। কর্তা আর কিছু বলল না। শাঙ্কো সার্ভোকে বলল–কর্তাকে বল একগাছি দড়ি দিতে। সার্ভো তা বলল। কর্তা ঘরের কোনা থেকে দড়ি বের করে আনল।
সবাই ঘরের বাইরে এল। কর্তা ঘাটের দিকে চলল। পেছনে শাঙ্কোরা। কর্তা তিনটে নৌকা দেখাল। তার মধ্যে একটা নতুন নৌকা। শাঙ্কো সেই নৌকাটায় উঠল। পেছনে আরো দু’টো নৌকা দড়ি দিয়ে বেঁধে নিল। তারপর নৌকাগুলোর ঘাটে বাঁধা দড়ি খুলে দাঁড় হাতে নিল। সার্ভো দুটো নৌকা পেছনে বেঁধে নিল শাঙ্কো দাঁড় বাইতে লাগল। ও দ্রুত দাঁড় বাইতে লাগল। নৌকাগুলো দ্রুতই চলল। ফেরার তাড়া রয়েছে। কাজেই শাঙ্কো দ্রুত দাঁড় বইতে লাগল।
খাঁড়ির জলে ঢেউ কম। খাঁড়ি পার হতেই সমুদ্রের বড় বড় ঢেউয়ের মুখোমুখি হল। নৌকার ওঠাপড়া শুরু হল। সমুদ্রতীরের কাছ দিয়ে দিয়ে শাঙ্কো নৌকা বেয়ে চলল।
ওদের জাহাজের কাছাকাছিযখন পৌঁছাল তখন বিকেল হয়ে গেছে। মারিয়া তখন সূর্যাস্ত দেখার জন্যে জাহাজের রেলিং ধরেদাঁড়িয়েছিল। মারিয়া প্রথম শাঙ্কোকে দেখল। মারিয়া গলা চড়িয়ে বলে উঠল–দেখ-শাঙ্কো আসছে। ডেক-এর ওপর শুয়ে বসে থাকা কয়েকজন ভাইকিং বন্ধু শুনল কথাটা। রেলিংয়ের কাছে ভিড় করল সবাই। বিস্কো ছুটে গিয়ে দড়ি মই ঝুলিয়ে দিল। শাঙ্কো নৌকাগুলো জাহাজের গায়ে ভেড়াল। বিস্কো চেঁচিয়ে বলল–
–শাঙ্কো–ফ্রান্সিসরা ভালো আছে তো?
সবাই ভালো আছে। চিন্তার কোন কারণ নেই। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে বলল। এতক্ষণে মারিয়া হাসল–যা–ফ্রান্সিসের কোন বিপদ হয় নি।
শাঙ্কো দড়ির মই বেয়ে ডেক-এ উঠে এল। সবাই ওকে ঘিরে ধরল। শাঙ্কো তখন হাঁপাচ্ছে। হাঁপাতে হাঁপাতে সব ঘটনা বলল। তারপর বলল–তোমরা এখনই তৈরি হয়ে নাও। এক্ষুণি ফিরে যাবো। সন্ধ্যের আগেই রাজা প্রোফেনের দেশে পৌঁছতে হবে। ফ্রান্সিস আর দেরি করতে চাইছে না। আবার লড়াইয়ের ময়দানে নামব এই ভেবেই ওরা। খুশি। এভাবে জাহাজে অলস জীবন ওদের ভালো লাগে না। হাজার হোক-বীরের জাত। লড়াইটা ওরা ভালোবাসে।
অল্পক্ষণের মধ্যেই পোশাক পাল্টে কোমরে তরোয়াল গুঁজে ভাইকিং দল বেঁধে ডেক এ উঠে এল। তারপর একে একে দড়ির মই বেয়ে নৌকোগুলোয় উঠতে লাগল। নিজেদের নৌকাতেও অনেকে বসল। শুরু হল দাঁড় বাওয়া। একেবারে সামনে রইল শাঙ্কোর নৌকো। তার পেছনে পেছনে অন্য নৌকাগুলো চলল।
তখন সূর্যঅস্ত যায় যায়। পশ্চিম আকাশ জুড়ে লালচে আভাছড়িয়েছে। মারিয়া জাহাজের রেলিং ধরে একবার সূর্যাস্ত দেখছেআর একবারশাঙ্কোদেরচলন্ত নৌকাগুলো দেখছে।
সমুদ্রের তীরের কাছ দিয়ে এসে নৌকাগুলো খাঁড়িতে এল। বাঁক ঘুরে চলল রাজা প্রোফেনের দেশের দিকে।
জেলেদের নৌকার ঘাটে যখন নৌকাগুলো পৌঁছালো তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। চাঁদের আলো খুব উজ্জ্বল নয়। তবে চারদিকে মোটামুটি দেখা যাচ্ছিল জ্যোৎস্না পড়েছে জেলে পাড়ায় খাঁ ড়িতে ওপারের লুভিনা পাহাড়ে।
কর্তার ঘর থেকে সার্ভো বেরিয়ে এল। এতক্ষণ সার্ভো শাঙ্কোর ফিরে আসার জন্যে ঐ ঘরেই অপেক্ষা করছিল। ওর চিন্তা ছিল এই কাজটা শাঙ্কো একা পারবে কিনা। দেখল শাঙ্কো পেরেছে। এর থেকেই প্রমাণ হয় ভাইকিংরা বীরের জাত। সমুদ্রের নাড়ি নক্ষত্র ওরা চেনে।
ভাইকিংরা দল বেঁধে নৌকা থেকে নেমে এল। সবাই চলল সৈন্যবাসের দিকে। সবচেয়ে আগে শঙ্কো। তারপরে বন্ধুরা। বসতির পাশ দিয়ে যাচ্ছে তখন লোজন। ওদের দেখছে। এত বিদেশি দল বেঁধে কোথায় চলেছে?
তারপরই সবুজ ঘাসের প্রান্তর। প্রান্তর পার হয়ে ভাইকিংরা ফ্রান্সিসদের ঘরের সামনে এল। বিস্কো গলা চড়িয়ে বলল–ফ্রান্সিস আমরা এসেছি।
সবাই ঘরে ঢুকল। বেশ বড় ঘর। সবাই এঁটে গেল। ভাইকিংরা বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল-ভাইসব–শাঙ্কোর কাছে নিশ্চয়ই সব শুনেছো। আমরা কালকেই এক সর্দারের দেশ এলুডা আক্রমন করবো। রাজা প্রোফেনের সৈন্যরাও আমাদের সঙ্গে থাকবে। আক্রমন করবো শেষ রাতে। এবার সার্ভো বলবে আমরা কোথা দিয়ে অক্রমণ করবো। সার্ভো বলল–লুভিনা পাহাড় তোমরা আসার সময় দেখেছো। ঐ পাহাড়ের নিচেই গভীর জঙ্গল। খাঁড়ি পার হবো আমরা ওপারে যাবো। ওখানে তখন ভাঁটা চলবে। জল বড় জোর কোমর পর্যন্ত থাকবে। খাঁড়ি পার হয়ে জঙ্গলে ঢুকব। জঙ্গল এলুডার বসতি এলাকার খুব কাছে গিয়ে শেষ হয়েছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই আমরা বসতি এলাকায় ঢুকে পড়তে পারব। তারপর লড়াই কীভাবে করবে সেটা তোমরাই ঠিক করো। ফ্রান্সিস বলল–এবার একটু অন্যরকম ভাবে লড়াই করবো। এলুডাবাসী যোদ্ধারা বর্শা দিয়ে লড়াই করে। আমরাও প্রথমে বর্শা দিয়ে লড়াই করবো। তারপর তরোয়ালের লড়াই চালাবো।
