ফ্রান্সিসরা ফিরে আসার জন্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে তখনই স্তিফানো বলে উঠল–কিন্তু সার্ভো কয়েদঘরে থাকবে। ফ্রান্সিস ঘুরে দাঁড়াল। বলল–মান্যবর রাজা-সার্ভোকেও আমাদের সঙ্গে থাকতে দিন। সার্ভো এখানকার সব জায়গা ভালোভাবে চেনে জানে। ওকে নিয়ে খোঁজাখুঁজি করতে আমাদের সুবিধে হবে। রাজা একবার স্তিফানোর দিকে নিয়ে তাকিয়ে বলল–সার্ভোর দায়িত্ব তুমি নিচ্ছো?
–হ্যাঁ। সার্ভো পালালে আমাকে যা শাস্তি দেবার দেবেন। ফ্রান্সিস বলল। স্তিফানো আর কোন আপত্তি করলো না। বোধহয়, ভাবল সার্ভো পালালে ফ্রান্সিসকে চিরদিনের জন্যে কয়েদঘরে আটকে রাখা যাবে। সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না।
ফ্রান্সিসরা সেনাপতির সঙ্গে সঙ্গে রাজবাড়ির বাইরে চলে এল। সেনাপতি সৈন্যবাসের দিকে চলল। সৈন্যবাসের কাছে এসে কয়েকটা ঘর পার হয়ে একটা বড় লম্বাটে ঘরের সামনে এল। দরজা ভেজানো ছিল। সেনাপতি দরজা খুলল। খালি ঘর। বলল–এই ঘরে তোমরা থাকবে। কিন্তু পালাবেনা। পালাবার চেষ্টা করলে বাঁচবেনা।
জানি। আর একটা অনুরোধ–আমাদের একজন বন্ধু আপনার সঙ্গে যাবে। কয়েদঘরে সার্ভে নামে একজন বন্দী হয়ে আছে। তাকে মুক্ত করে এই ঘরে পাঠিয়ে দিন। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ। আমার সঙ্গে কে আসবে এসো। সেনাপতি বলল।
–চলুন। শাঙ্কো এগিয়ে এল।
দু’জনে কয়েদঘরের দিকে চলল। কয়েদঘরের সামনে এসে সেনাপতি প্রহরীর দিকে তাকিয়ে বলল–একজন বন্দী আছে। ওকে ছেড়ে দাও। প্রহরীদের মধ্যে একজন লোহার দরজা ঢং ঢংশব্দ খুলে ডাকল–ওহে–বাইরে এসো। তোমাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
সার্ভো দু’লাফে কয়েদঘর থেকে বেরিয়ে এল। শাঙ্কো বলল–আমার সঙ্গে চলো। সেনাপতি চলে গেল। সার্ভো দাঁড়িয়ে রইল। ও তখনও ওর মুক্তির ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। শাঙ্কো হেসে বলল–আবার কয়েদঘরে ঢোকার ইচ্ছে নাকি?
না না– সার্ভো বলল–ভাই তোমরা আমার মুক্তির ব্যবস্থা করে দিলে। আমি তোমাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ রইলাম।
ঠিক আছে। এখন চলল। শাঙ্কো বলল।
সার্ভোকে নিয়ে শাঙ্কো ওদের ঘরে নিয়ে এল। সার্ভো প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল–ভাই তোমার জন্যেই আমি মুক্তি পেলাম। ফ্রান্সিস বলল
–এখনও তুমি সম্পূর্ন মুক্ত নও। তবে আমি তোমাকে সম্পূর্ন মুক্ত করবো। কিন্তু একটা কথা। তোমার পক্ষে এখন পালানো খুব সহজ। কিন্তু আমার অনুরোধ পালাবার চেষ্টা কর না। যদি তুমি পালিয়ে যাও আমাদের সারা জীবন ঐ কয়েদঘরে পচতে হবে। আশা করি তুমি সেটা করবে না।
না-না। ফ্রান্সিস–ভাই তুমি আমাকে যা বলবে আমি তাই করবো। সার্ভো বলল।
–কথাটা মনে থাকে যেন। ফ্রান্সিস বলল।
ঘরের মেঝেতে শুকনো ঘাস পাতারই বিছানা। তবে সেসব দড়ি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা। তার ওপর পরিষ্কার মোটা কাপড়ের বিছানা পেতে দিয়ে গেছে। ফ্রান্সিস শুয়ে– পড়তে পড়তে বলল–একটু আরাম করা যাক। কয়েদঘরে যেভাবে দিনরাত কেটেছে। শাঙ্কোও আধশোয়া হল। সিনাত্রা আর সার্ভো বসে রইল।
তখন দুপুর। সৈন্যবাসের রাঁধুনি ওদের খেয়ে নিতে ডাকল। সৈন্যবাসের লাগোয়া। খাবার ঘরে ফ্রান্সিসরা খেতে গেল। মেঝেয় টানা খাবারের জায়গা করা হয়েছে। সৈন্যদের সঙ্গে ফ্রান্সিসরাও.খেতে বসল। খেতে দেওয়া হল তেলে ভাজা রুটি আর পাখির মাংস। ফ্রান্সিস হেসে বলল–আমরা তাহলে জাতে উঠেছি। ঐরকম মাংস খেয়ে বুদ্ধি আর শক্তি দুটোকেই কাজে লাগানো যায়।
-যা বলেছো। শাঙ্কোও হেসে বলল। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল
–এখন চিন্তা হল বন্ধুদের কী করে এখানে আনা যায়। ফ্রান্সিস বলল।
–এটা তো সমস্যাই। এলুডা রাজ্যের মধ্যে দিয়ে যাওয়া যাবেনা। ওরা আমাদের কাউকে পেলে পুড়িয়ে মারবে। ওদেরনজর এড়িয়েও যাওয়া আসা করা যাবেনা। শাঙ্কো বলল।
একমাত্র উপায় খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে সমুদ্রে পৌঁছানো কিন্তু তার জন্যে নৌকা তো চাই। নৌকা পাবো কোথায়? ফ্রান্সিস বলল।
সার্ভো খেতে খেতে ওদের কথা শুনছিল। এবার বলল–তোমাদের নৌকা চাই?
–হ্যাঁ। তুমি জানো এখানে কোথায় নৌকা পাবো? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–লুভিনা পাহাড়ের এপারে জেলেদের নৌকার ঘাট আছে। সেখানে নৌকা পাবে। এপারেই জেলেদের নৌকা রাখার ঘাট।
–তুমি শাঙ্কোকে নিয়ে যেতে পারবে? ফ্রান্সিস বলল।
–কেন পারবো না। আমি এই রাজ্যের সব জায়গা ভালভাবেই চিনি। সার্ভো বলল।
–তাহলে খাওয়া সেরে শাঙ্কোকে ওখানে নিয়ে যাও।
বেশ তো। সাভো বলল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোর দিকে তাকিয়ে বলল—
–শাঙ্কো-খাঁড়ির মধ্যে দিয়ে নৌকা চালিয়ে সমুদ্রে গিয়ে পড়বে। ওখান থেকে সমুদ্রের ধারে ধারে গিয়ে জাহাজ ঘাটায় আমাদের জাহাজে যেতে পারবে।
খুব সহজেই যাওয়া যাবে। এলুডা রাজ্যের মধ্যে দিয়ে যেতে হবেনা। শাঙ্কো বলল।
–তিনটে নৌকা নিয়ে যেও। আমাদের দুটো নৌকা রয়েছে। মারিয়া আর ভেন বাদে সবাইকে এক ভাবে নিয়ে আসতে পারবে। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। শাঙ্কো উঠে দাঁড়াল। বলল–সার্ভো চলো। সার্ভোও উঠে দাঁড়াল।
খাওয়া শেষ। শাঙ্কোদের ফ্রান্সিস বলল–চেষ্টা করবে সন্ধ্যের আগেই চলে আসতে। আমি বেশি দেরি করতে রাজি নই।
শাঙ্কো আর সার্ভো সৈন্যবাস থেকে সামনের প্রান্তরে নামল। সার্ভো আগে আগে চলল। পেছনে শাঙ্কো।
বসতি এলাকায় এল। এপথ সেপথ দিয়ে ওরা খাঁড়ির কাছে এল। সার্ভো আগে আগে চলল। পেছনে শাঙ্কো।
