এক সময় রাজা রাজবাড়ি থেকে বেরিয়ে এলেন। সঙ্গে স্তিফানো। রাজা এসে আসনে বসলেন। পাশে সেনাপতি।
কড়া পাহারায় ফ্রান্সিস ও শাঙ্কোরা এল। একজন যোদ্ধা ফ্রান্সিসকে একটা তরোয়াল দিল। তরোয়াল নিয়ে ফ্রান্সিস রাজার সামনে গোল ফাঁকা জায়গাটায় এসে দাঁড়াল। এবার স্তিফানো এসে ফ্রান্সিসের সামনে দাঁড়াল। ঝনাৎশব্দে তারবারি কোষমুক্ত করল। বলল–
–আমাকে যে অপবাদ দিয়েছে। তার জন্যে সর্বসমক্ষে মাপ চাও।
–আমি মিথ্যে অপবাদ দিই না। যা বলেছি সত্যি বলেছি। ফ্রান্সিস বলল।
—তাহলে মরো। স্তিফানো বলল।
স্তিফানো তরোয়াল হাতে ফ্রান্সিসের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস দ্রুত মার ঠেকাল। দু’জনেই তরোয়াল চালাতে লাগল ঠং ঠং ধাতব শব্দ হতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই লড়াই জমে উঠল। স্তিফানো ভেবেছিল সহজেই ফ্রান্সিসকে কাবু করা যাবে। কিন্তু ফ্রান্সিসের নিপুণ তরোয়াল চালানো দেখে বুঝল এ বড় কঠিন ঠাঁই। সহজে হারানো যাবে না। দু’জনেই তীক্ষ্ণ চোখে পরস্পরের দিকে তাকাচ্ছে। তরোয়ালের মার কোনদিক থেকে আসছে আন্দাজ করে নিচ্ছে। দু’জনেই ঘন ঘন শ্বাস ফেলেছে। উপস্থিত রাজা প্রজারা, শাঙ্কোরা দুই যোদ্ধার দ্বন্দযুদ্ধ রুদ্ধশ্বাসে দেখছে। ফ্রান্সিস খুব বেশি আক্রমন করছিল না। ও স্তিফানোকে বেশি নড়া চড়া করতে বাধ্য করল। এতে স্তিফানো বেশি পরিশ্রান্ত হল। ফ্রান্সিস সেই সুযোগটা নিল। এবার স্তিফানোর মার ঠেকিয়ে এক লাফে এগিয়ে বাঁ দিক দিয়ে স্তিফানোর তরোয়ল প্রানপনে এক ঘা মারল। স্তিফানোর হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গেল। স্তিফানো বসে পড়ল। নিরস্ত্র স্তিফানে মুখ হাঁ করে হাঁপাতে লাগল। চোখে মুখে মৃত্যু-ভীতি। ফ্রান্সিস স্তিফানোর বুকের ওপর দিয়ে তরোয়ালের ডগা টেনে নিল। স্তিফানোর জামা বুকের দিকে কেটে গেল। দেখা গেল বুকে তরোয়ালের ঘা-এর ক্ষত। গভীর ক্ষত চিহ্ন। স্তিফানো তাড়াতাড়ি জামা টেনে বুক ঢাকল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–এবার তো বলবেন আমি মিথ্যে অপবাদ দিইনি। স্তিফানো কোন কথা বলল না। মাথা নিচু করে হাঁপাতে লাগল। ওর আশঙ্কা ছিল হয়ত ফ্রান্সিস ওর বুকে তরোয়াল বসিয়ে দেবে। ফ্রান্সিস তা করল না দেখে ওর মৃত্যু ভয়ে কেটে গেল। ও আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল।
উপস্থিত লোকেদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। ওরা কল্পনাও করেনি এই দ্বন্দ্বযুদ্ধে স্তিফানো হেরে যাবে। সার্ভো ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল।
রাজা আসন থেকে উঠে রাজবাড়ির দিকেচললেন। দর্শকদের ভিড় পাতলা হতে লাগল। স্তিফানোমাটি থেকে তরোয়াল তুলে কোষবদ্ধকরল। তারপর কোন কথা না বলে রাজবাড়ির, পেছন দিকে চলল। বোধহয় ওদিকেই মন্ত্রীর আবাস। ফ্রান্সিস শাঙ্কোদের কাছে এল।
চার পাঁচজন প্রহরী ছুটে এসে ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। ওদের কয়েদঘরের দিকে নিয়ে চলল। ফ্রান্সিসের শরীরও অক্ষত ছিল না। বাঁ বাহুতে তরোয়ালের খোঁচা লেগেছিল। রক্ত পড়ছিল। ক্ষতস্থান ডানহাতের চেটো দিয়ে চেপে ধরে হাঁটতে লাগল। একজন প্রহরী ফ্রান্সিসের হাত থেকেও তরোয়ালটা নিয়ে নিল।
কয়েদঘরের সামনে এল ওরা। প্রহরী ঢং ঢং শব্দে দরজা খুলল। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। একজন প্রহরীকে ডাকল।
প্রহরী ওর কাছে এল। শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে দেখিয়ে বলল
–ওর হাত কেটে গেছে। একজন বৈদ্যি ডাকো।
–মন্ত্রীমশায়ের হুকুম ছাড়া বৈদ্যি ডাকা যাবে না। প্রহরী বলল।
–ওর হাত দিয়ে রক্ত পড়ছে। ওর কষ্ট হচ্ছে। অথচ মন্ত্রীর হুকুম ছাড়া বৈদি আনাবে না। শাঙ্কো বেশ গলা চড়িয়ে বলল।
নিয়ম নেই। প্রহরীরও এক কথা।
বেশ মন্ত্রীকে গিয়ে ওর অবস্থার কথা বল। দেখা যাক মন্ত্রী কী বলে। শাঙ্কো বলল। প্রহরী কিছুক্ষণ পরে গেল।
কিছুক্ষণ পরে একজন বৃদ্ধকে নিয়ে এল। বৃদ্ধের হাতে কাপড়ের ঝোলা। বোঝা গেল বৈদ্যি। বৈদ্যি কয়েদঘরে ঢুকল। শায়িত ফ্রান্সিসকে ইঙ্গিতে উঠে বসতে বলল। ফ্রান্সিস উঠে বসল। একটু ক্লান্ত স্বরে বলল–ওষুধের দরকার নেই। এমনিতেই সেরে যাবে।
—-দেখছি। বৈদ্যি বিড় বিড় করে বলল।
বৈদ্যি ফ্রান্সিসদের জামার হাত সরিয়ে বেশ মনোযোগ দিয়ে কাটা জায়গাটা দেখলো। আস্তে আস্তে বলল–ঘা বিষিয়ে উঠতে পারে। শুনলাম তরোয়াল লড়াইয়ে তুমি মন্ত্রীমশাইকে হারিয়েছে। তুমি বাহাদুর–এটা বলতেই হবে।
ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না। বৈদ্যি কাপড়ের ঝোলা থেকে কয়েকটা কাঠের বোয়াম বের করল। বোয়ামগুলো থেকে আঙ্গুলের ডগায় কালো হলুদ সবুজ রঙের গলা কিছু বের করল। তারপর সব মিশিয়ে হাতের তালুতে ঘষে বড়ি বানাল। একটা হাতে পিষে ক্ষতস্থানে লাগাল। উঃ ফ্রান্সিস মুখে শব্দ করল। বোধহয় জ্বালা করে উঠেছে। একটু পরেই বোধহয় জ্বালা কমল। বৈদ্যি বড়ি গুলো হাতে নিয়ে শাঙ্কোর দিকে বাড়িয়ে ধরল। বলল–প্রতিদিন একটা বড়ি খাওয়াবে। ভয় নেই। সেরে যাবে।
বৈদ্যি কাঠের বোয়ামগুলো ঝোলায় ভরল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর উঠে। দাঁড়াল। দরজায় দাঁড়ানো প্রহরীদের দেখে নিয়ে ফিস্ ফিস্ করে বলল–মন্ত্রীমশাই লোক ভালো না। সাবধান। ফ্রান্সিসের ক্ষতস্থান দেখল। যাক্–রক্ত। পড়া বন্ধ হয়েছে। বৈদ্যিবুড়ো চলে গেল।
