ফ্রান্সিস এসব কথা ভুলল না। ও প্রথমেই শক্ত ভঙ্গিতে শর্তের কথা তুলল আমি মুক্তো এনে দেবো কিন্তু একশর্তে।
–কি শর্ত?
–আমাকে আর আমার বন্দী বন্ধুদের সঙ্গে সঙ্গে মুক্তি দিতে হবে। আমাদের জাহাজ ফিরিয়ে দিতে হবে।
–বেশ তো ভালো কথা। কিন্তু হীরে দুটো আমার ক্যারাভেল-এ রেখে যেতে হবে। ফ্রান্সিস একটু ভাবল। ভেবে দেখল, এ ছাড়া উপায় নেই। হীরে উদ্ধারের কথা পরে ভাববো। বলল–বেশ! এবার আর একটা শর্ত।
–বলো।
-–আমি একবার ডুব দেবো। আমার ডান হাতের মুঠোয় যে ক’টা মুক্তো আঁটে, সে কটাই পাবেন।
লা ব্রুশ একটু হতাশার ভঙ্গিতে বলল–সে আর ক’টা। বড় জোর তিনটে।
–ঐ তিনটে পেয়েই আপনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে।
লা ব্রুশ একটুক্ষণ ভেবে দাড়িতে হাত বুলিয়ে তারপর বললো–বেশ, তাই হবে। ফ্রান্সিস একটু হেসে বললো–অবশ্য আপনার মত খুনে নরঘাতক যে কতটা শর্ত অনুযায়ী চলবেন, তাতে আমার সন্দেহ আছে।
তাহাতে বড় সর্দার খোলা তরোয়াল হাতে ছুটে এলো। লা ব্রুশ হাত তুলে ওকে থামিয়ে দিয়ে খুকখুক করে হেসে বললো–যাও খেয়ে নাও গে, আমরা এক্ষুণি বেরুবো।
পাশের ঘরটাতে রসুইখানা করা হয়েছে। বড়সর্দারই ফ্রান্সিসকে ওখানে এনে বসালো। লম্বা-লম্বা সুস্বাদু রুটি, প্রচুর মাংস, মাছ এসব খেতে দিল। কয়েদ ঘরে জঘন্য খাদ্য খেয়ে-খেয়ে খিদেটাই যেন মরে গেছে। এটাও একটা কারণ, আর একটা কারণ বন্ধুদের শুকনো ক্ষুধার্ত মুখগুলো ভেসে উঠলো চোখের সামনে। ফ্রান্সিস আর খেতে পারলো না। একপাশে খাবার সরিয়ে রেখে উঠে পড়লো। বড় সর্দার হাঁ-হাঁ করে ছুটে এল–করো কি করো কি, পেট পুরে খেয়ে নাও। অনেকক্ষণ জলে থাকতে হবে।
–আমি আর খাবো না। ফ্রান্সিস শান্তস্বরে বললো।
***
বনের মধ্যে দিয়ে মুক্তোর সমুদ্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু হ’ল। প্রায় সব ক’জন জলদস্যুকেই সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। এটা দেখে ফ্রান্সিস লা ব্রুশকে জিজ্ঞেস করল–এত লোক কি হবে? আমরা তো যুদ্ধ করতে যাচ্ছি না।
লা ব্রুশ খুকখুক করে হাসলো। বললো–বিপদ-আপদের কথা কি বলা যায়।
মুক্তোর সমুদ্রের কাছাকাছি পড়ল অগ্নি-প্রবালের স্তর। সেটা দ্রুতপায়ে পেরোল সবাই। আমি ঠিক দুপুরবেলা ওরা মুক্তোর সমুদ্রের ধারে এসে পৌঁছল। ফ্রান্সিস দেখলো জল শান্ত। হাওয়ায় শিরশির ঢেউ উঠছে। দূরে ঢাকা কাঁচ পাহাড়ের কালো প্রাচীর! ডানদিকে খাড়া উঠে গেছে। প্রকৃতি যেন সুরক্ষিত করে রেখেছে এই মুক্তোর সমুদ্রকে। অবশেষে মুক্তোর সমুদ্র আজ ফ্রান্সিসের চোখের সামনে। কিন্তু বন্ধুরা কেউ দেখতে পেলো না। ফ্রান্সিস মুক্তোর সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে এসব সাতপাঁচ ভাবছে, লাব্রুশতাড়া দিল কই!নামো শিগগির।
ফ্রান্সিস জলে নামল। তারপর সাঁতরাতে সাঁতরাতে মাঝখানটায় এসে চারদিক একবার তাকিয়ে নিয়ে ডুব দিল। একটু নামতেই দেখল, আলোর উৎস সেই অপূর্ব সুন্দর মুক্তোগুলো। ফ্রেদারিকো ঠিকই বলেছিল, তলাটা অমসৃণ। তাতে বড়-বড় আকারের ঝিনুক। কোনটার মুখ খোলা, কোনটা বন্ধ। কোনো-কোনো ঝিনুকের খোলা মুখের মধ্যে মুক্তো রয়েছে। জায়গাটার অপরূপ সৌন্দর্য, মানুষের কল্পনাতেও বোধহয় আসবে। , এমনি অপার্থিব সেই সৌন্দর্য। একটা গভীর বেগুনে নীল আলো জায়গাটাতে আলোকিত করে রেখেছে। হঠাৎ গা ঘেঁষে কি একটা চলে যেতেই ফ্রান্সিস সম্বিত ফিরে পেলো। দেখল, মুক্তোর সমুদ্রের বিভীষিকা, লাফ মাছ। পিঠের ছুঁচলো কাঁটাগুলো উঁচিয়ে আছে। বেগুনে নীল আলো লেগে গায়ের আঁশগুলো চকচক করে উঠলো। ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি কোমরে গোঁজা আয়নাটা বের করে অমসৃণ তলাটায় রেখে দিলো। বেশ জোরালো আলো প্রতিবিম্বিত হ’ল। লা মাছটাকে ওদিকে দ্রুত যেতে দেখলো। দম ফুরিয়ে এসেছে। ফ্রান্সিস জল ঠেলে উপরে ভেসে উঠলো। ওদিকে ভেসে উঠতে দেখে জলদস্যুরা হৈ-হৈ করে উঠলো। লা ব্রুশের মুখেও হাসি।
ফ্রান্সিস আবার ডুব দিলো! এক ডুবে সোজা নীচে নেমে এলো। ছড়িয়ে থাকা মুক্তো থেকে তিনটে মুক্তো তুললো। তখনই লক্ষ্য করলো অনেক ক’টা লাফ মাছ আয়নাটার কাছে জড়ো হয়েছে। কয়েকটা মাছ আয়নাটায় ফুঁ দিয়ে যাচ্ছে। ঐ জায়গায় জলটা রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। মাছগুলোর মুখ নিশ্চয়ই ফেটে গিয়ে রক্ত বেরুচ্ছে। ফ্রান্সিস পায়ে জলের ধাক্কা দিয়ে ওপরে উঠে এল। জলদস্যুরা ওকে জীবিত দেখে আবার চীৎকার করে উঠল। ফ্রান্সিস সাঁতরাতে-সাঁতরাতে তীরে এসে উঠল। লা ব্রুশ খোঁড়াতে খোঁড়াতে ছুটে এলো। ফ্রান্সিস জল থেকে উঠতে যাবে, লা ব্রুশ ছুটে এসে বললো–উঠো না–উঠো না–আর তিনটে দাও।
ফ্রান্সিস কঠোর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকালো। বললো–একমুঠোয় যে ক’টা আঁটে তাই এনেছি, দু’বার নামবার তো কথা ছিল না।
লা ব্রুশ খুকখুক করে হাসলো–আর তিনটে ব্যাস্।
ফ্রান্সিস বুঝল, যুক্তি শোনার মানুষ নয় লা ব্রুশ। আর তিনটে মুক্তো পেলে যদি সন্তুষ্ট হয়, তাহলে সেটা এখনই দেওয়া সম্ভব। কারণ লা মাছগুলো এখন আয়নাটায় টু দিতে ব্যস্ত।
ফ্রান্সিস আবার সাঁতরে মাঝখানের দিকে চলল। লা ব্রুশ বড় সর্দারকে ইশারায় ডাকল। ফিসফিস করে বললো সবাইকে তীর বরাবর ছড়িয়ে দাঁড়াতে বলো। ও যেন কিছুতেই উঠে না আসতে পারে। যত মুক্তো আছে, সবই আমার চাই।
বড় সর্দার ঘুরে দাঁড়িয়ে সবাইকে তাই বললো। তীর বরাবর সবাই তরোয়াল আর বর্শা হাতে দাঁড়িয়ে পড়লো। ফ্রান্সিসের আর তীরে উঠে আসার উপায় রইলো না।
