রাতের খাবার যোদ্ধা দু’জন দিয়ে গেল। ফ্রান্সিসরা পেট পুরে খেল। সারা দিন উপোবাসী থেকে বেশ দূর্বল লাগচ্ছিল শরীর। রাতে খেয়ে গায়ে একটু জোর পেল। খেতে খেতে ফ্রান্সিস বলল–একটু ঘুমিয়ে নাও। কয়েদঘরে কখনও কখনও হাত পা বাঁধা অবস্থায় থেকে ঘুমোন ফ্রান্সিসদের অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। তিনজনে ঐ অবস্থায় কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিল। ঘুম ভেঙে দেখল একজন পাহারাদার বর্শা হাতে পাহারা দিচ্ছে। — তখন শেষ রাত। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো ফ্রান্সিসের কাছে এগিয়ে এল। পাহারাদারদের চোখ এড়িয়ে ফ্রান্সিস শাঙ্কোর গলার কাছ দিয়ে বাঁধা দু’হাত ঢোকাল। তারপর আস্তে আস্তে ছোরাটা তুলল। শাঙ্কোর বাঁধা হাতে দিল। শাঙ্কো আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের হাতের বাঁধা লতা কাটতে লাগল। একটু সময় লাগল। বুনো লতাটা বেশ শক্ত। ফ্রান্সিসের হাতের লতা কেটে গেল। এবার ছোরাটা নিয়ে শাঙ্কোর হাতের বাঁধন কাটল। শাঙ্কো ছোরা নিল। সিনাত্রার হাতের বাঁধন কাটল। তারপর সকলেই পায়ের বাঁধন কাটল। সিনাত্রা চাপা স্বরে বলে উঠল-সাবাস শাঙ্কো।
তিনজনের খোলা হাত পা নিয়ে একটু বসে রইল। ফ্রান্সিস চোরা দৃষ্টিতে পাহারাদারদের দেখতে লাগল। পাহারাদাররা পায়চারি করছিল। একবার ঘুরে দাঁড়াতেই ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে একলাফে পাহারাদারের ঘাড়ের উপর গিয়ে পড়ল। পাহারাদার চিৎ হয়ে পড়ে গেল। হাত থেকে বর্শাটা ছিটকে গেল। ফ্রান্সিস একলাফে গিয়ে বর্শা তুলে নিল। ওদিকে শাঙ্কো হাতের ছোরাটা পাহারাদারের। পেটে ঢুকিয়ে দিল। পাহারাদারের মুখে মৃদু শব্দ উঠল–ওঃ। ততক্ষণে ফ্রান্সিস সর্দারের ঘরের দরজার কাছে ছুটে এসেছে। জোরে লাথি মেরে দরজা ভেঙে ফেলল। ঘরে মশালের আলোয় দেখল দরজা ভাঙার শব্দে সর্দার বিছানায় উঠে বসেছে। সর্দার আগে বুঝে ওঠার আগে ফ্রান্সিস বর্শাটা সর্দারের বুকে ঢুকিয়ে দিল। সর্দার দু’হাতে বেঁধা বর্শাটা ধরে চিৎ হয়ে বিছানায় পড়ে গেল। চিৎকার করে উঠল—আঁ–আঁ–।
ফ্রান্সিস এক লাফে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে চাপা স্বরে বলে উঠল–উত্তর দিকের বনের দিকে ছোটো। তিনজনে ঘাসের বনের দিকে ছুটল। কিন্তু দরজা ভাঙার শব্দে সর্দারের চিৎকারে অনেকেরই ঘুম ভেঙে গেল। যোদ্ধারা কয়েকজন সঙ্গে সঙ্গে বর্শা হাতে বেরিয়ে এল। এরা যোদ্ধার জাত। লড়াই করতে অভ্যস্ত। ওরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসে প্রথমে হকচকিয়ে গেল। কিন্তু কয়েক মূহুর্ত। চাঁদের অনুজ্জ্বল আলোতে ফ্রান্সিসদের ঘাসবনের দিকে ছুটতে দেখল। বন্দীরা পালাচ্ছে। মুখে থাবড়া দিয়ে উ–উশব্দতুলল। আরো যোদ্ধা বর্শা হাতে ঘরগুলো থেকে বেরিয়ে এল। সবাই ছুটল ফ্রান্সিসদের দিকে।
ততক্ষণে ফ্রান্সিসরা ঘাসের বনে ঢুকে পড়েছে। ঘাসের উচ্চতা বুক পর্যন্ত। তাও ফ্রান্সিসদের মাথা ঢাকা পড়ল না। ওদের মাথা দেখে যোদ্ধারা বর্শা হাতে ছুটে এল। শুকনো ঘাসের বনে ঢুকে পড়ল। ফ্রান্সিসদের ধাওয়া করল। ফ্রান্সিসরা হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটল। কিন্তু ঘাসের গোড়ায় পা জড়িয়ে যেতে লাগল। ফ্রান্সিসদের গতি কমে আসতে লাগল। অনেকটা কাছে এসে পড়ল যোদ্ধার দল। ফ্রান্সিস পিছনে ফিরে দেখল সেটা। ফ্রান্সিস হঠাৎ নিচু হয়ে এক মুঠো ধূলো তুলল। উড়িয়ে দেখল বাতাস দক্ষিণমুখী। অর্থাৎ যেদিক থেকে যোদ্ধারা ছুটে আসছে। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল– সিনাত্রা চকমকি পাথর লোহা আছে তো।
–কোমরে ফেট্টি তে গোঁজা। সিনাত্রা বলল।
ঘাসে আগুন লাগাও। জলদি। ফ্রান্সিস বলল।
সিনাত্রা বসে পড়ল। কোমর থেকে চকমকি পাথর লোহা বের করে হাঁপাতে হাঁপাতে ঠুকতে লাগল। চকমকি পাথর থেকে আগুনের ফুলকি ছিটকে শুকনো ঘাসে লাগল। দপ্ করে আগুন জ্বলে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে শুকনো ঘাসে আগুন লেগে গেল। উত্তরমুখী হাওয়া। ওদিক থেকে যোদ্ধারা ছুটে আসছিল। আগুনের ধোঁয়া ছুটল যোদ্ধাদের দিকে। যোদ্ধারা মরিয়া হয়ে বর্শা ছুঁড়ল। কিন্তু সে সব বর্শা আগুনের মধ্যে পড়ল। আগুন তখন হাওয়ায় ভর করে ওদের দিকে ছুটে আসছে। ওরা চিৎকার করতে করতে পিছনে ফিরে ছুটল। ফ্রান্সিসের সঙ্গে তখন ওদের আগুনের ব্যবধান। ফ্রান্সিসরা ততক্ষণ হাঁপাতে হাঁপাতে ঘাসের বনের বাইরে চলে এসেছে। সামনেই একটা জলাশয় মত। ওরা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জল গভীর নয়। কোমর পর্যন্ত। ওরা জল ঠেলে চলল। চাঁদের আলোয় অস্পষ্ট কিছু বাড়িঘর দেখল। ফ্রান্সিস পেছনে ফিরে দেখল সারা ঘাসের বনে আগুন আর ধোঁয়া। সামনের বাড়িঘর দেখে ফ্রান্সিস বলল–ওটা নিশ্চয়ই রাজা প্রোফেনের রাজত্ব। সর্দারের শত্রু রাজ্য। ওখানেই আশ্রয় নিতে হবে।
জলাশয়টার মাঝামাঝি এসে ফ্রান্সিস বাঁদিকে তাকাল। অনেক দুরের সমুদ্রের বিস্তার দেখে বুঝল এটা জলাশয় নয়। সমুদ্রের খাঁড়ি। এখানে নিশ্চয়ই জোয়ার ভাটা খেলে।
জল ঠেলে এগোতে সময় লাগছিল। ততক্ষণে চাঁদ নিভে গেছে। পূর্বদিকের আকাশে কমলা রং ধরেছে। ফ্রান্সিসরা ওপারে পৌঁছাল। তিনজনই বালির পারে বসে পড়ল। হাঁপাতে লাগল।
সূর্য উঠল। ফ্রান্সিস দেখল অনেক বাড়ি ঘরদোর। পশ্চিমদিকে তাকিয়ে দেখল, খাঁড়ি থেকে একটা উঁচু পাহাড় উঠে গেছে। পাহাড়টার নিচে বিস্তৃত বনভূমি।
