–ফ্রান্সিস–যে করেই হোক পালাতে হবে। শাঙ্কো বলল।
–ছক কষেছি। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
—তুমি মাথা গরম করে ফেললে–শাঙ্কো অনুযোগের সুরে বলল।
–কোন কারন নেই–আমাদের হত্যা করা হবে? এসব শুনলে কারো মাথার ঠিক থাকে। ফ্রান্সিস বলল। বেশ ভয়ার্তস্বরে সিনাত্রা বললতাহলে আমরা আর বাঁচবোনা?
নিশ্চয়ই বেঁচে থাকবো সিনাত্রা। ইচ্ছে করলে তুমি এখন গান গাইতে পারো।
–কী পাগলের মত কথা বলছো? মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে
–অত সহজে ফ্রান্সিস মৃত্যু মেনে নেয় না। শুধুসময় সুযোগেরঅপেক্ষা। ফ্রান্সিস বলল।
–সত্যি কি সর্দার আমাদের মেরে ফেলবে? সিনাত্রা বলল।
–ওর চোখের দৃষ্টিই বলছে। ও নরঘাতক। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে–সিনাত্রা বলতে গেল। ফ্রান্সিস ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল –ভয় পেওনা। মনে সাহস রাখো। সাহস হারিও না।
তারপর ওরা আর কোন কথা বলল না। ফ্রান্সিস পালানোর উপায় ভেবে চলল। শাঙ্কোর কেমন মনে হল বন্দী দু’জন নিশ্চয়ই রাজা প্রোফেনের যোদ্ধা। ধরা পড়ে এখন শাস্তির মুখে। শাঙ্কো নিশ্চিত হতে বলল–ভাই তোমরা কি রাজা প্রোফেনের দেশের যোদ্ধা? শাঙ্কোর সব কথা ওরা বুঝল না। কিন্তু রাজা প্রোফেন শুনে একজন মাথা ওঠা নামা করল। শাঙ্কো বুঝল ওর অনুমান ঠিক। এবার শাঙ্কো বলল–তোমাদের দেশ কোনদিকে? বার কয়েক বলার পর ওরা বুঝল। একজন দু’হাত তুলে শুকনো ঘাসের বনের দিকে দেখাল। ফ্রান্সিস এসব দেখছিল। বুঝল ঐ ঘাসের বনেরও পাশেই রাজা প্রোফেনের রাজত্ব। সন্দেহ নেই এই সর্দার রাজা প্রোফেনের শত্রু।
সন্ধ্যে হয়ে এল। ফ্রান্সিসরা দেখল যোদ্ধারা জঙ্গল থেকে শুকনো গাছডাল নিয়ে আসছে। আর একদল বড় বড় আঁটি বেঁধে শুকনো ঘাস নিয়ে আসছে। উঠোনের ওপাশে একটা গাছের নীচে সব জড়ো করছে। ঘাস ডালপাতার স্তূপ গাছটার নিচে কান্ডের চারিদিকে জড়ো করা হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে বেশ উঁচু হয়ে গেল শুকনো ঘাস গাছ ডালের স্তূপ। সিনাত্রা এসব দেখে বলল–এরা বোধহয় আগুন জ্বেলে নাচ গান করবে। শুধু ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–সিনাত্রা এখন এই সর্দারকে চেনোনি। শাস্তির ব্যবস্থা হচ্ছে।
বলো কি! শাঙ্কো বলে উঠল–তার মানে এই বন্দী দুজনকে–ফ্রান্সিস ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল–হ্যাঁ পুড়িয়ে মারা হবে।
–কী সাংঘাতিক! সিনাত্রা আঁৎকে উঠল।
এর আগেও কতজনকে এভাবে শাস্তি দিয়েছে কে জানে। কাজেই এই সর্দারের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। শুধু ভাবছি যা সন্দেহ করছি তা ঘটে কি না। ফ্রান্সিস মৃদু স্বরে বলল।
সন্ধ্যের পরেই ফ্রান্সিসদের, বন্দীদের খেতে দেওয়া হল। গোল গোল পাতায় পোড়া পোড়া রুটি আর আনাজের ঝোল।
একটু রাত হতেই সব নারীপুরুষ খেয়ে নিল। উঠোনে এসে সবাই জড়ো হতে লাগল। গাছটা ঘিরে লোকজন দাঁড়িয়ে গেল।
এবার বন্দী দুজনকে যোদ্ধারা বন্দী পায়ের বাঁধন খুলে গাছটার দিকে নিয়ে চলল। ফ্রান্সিস যা আশঙ্কা করছিল তাই ঘটতে চলল। বন্দী দু’জনকে সেই কাঠের স্কুপের ওপরে বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে তোলা হল। বুনো লতা দিয়ে গাছের সঙ্গে তাদের বেঁধে দেওয়া হল। উপস্থিত লোকজনরা উল্লাসে চিৎকার করে উঠল। বন্দী দু’জনে যোদ্ধাদের হাত ছাড়াবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু ওদের হাত এড়াতে পারল না। দু’জনে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল।
তখনই সর্দার ডানপাশের একটা বড় ঘর থেকে বেরিয়ে এল। যোদ্ধা কয়েকজন সর্দারের কাঠের আসনটা পেতে দিল। সর্দার গ্লাসে নেশার তরল পদার্থ নিয়ে আসনে বসল। যোদ্ধারা সর্দারের নির্দেশের অপেক্ষা করতে লাগল। একসময় গ্লাসে চুমুক দিয়ে সর্দার ডানহাত উঁচু করল। একজন যোদ্ধা চকমকি পাথর ঠুকে গাছের নীচে শুকনো ঘাসে আগুন জ্বালিয়ে দিল। আগুন দ্রুত জ্বলে উঠে ছড়িয়ে গেল। শুকনো কাঠে আগুন লেগে গেল। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। বন্দী দু’জনকে আগুন আচিরেই স্পর্শ, করল। বন্দী দু’জন উচ্চস্বরে কেঁদে উঠল। আর্ত চিৎকার শোনা গেল।
ফ্রান্সিস আর তাকিয়ে দেখতে পারল না। মুখ নিচু করে চুপ করে বসে রইল। মর্মান্তিক আর্তনাদ শুনতে শুনতে ফ্রান্সিসের চোখে জল এল। শাঙ্কো সিনাত্রাও মুখ নিচু করে বসে রইল। ওদিকে জড়ো হওয়া মানুষের মধ্যে উল্লাসের ধ্বনি উঠল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–কী নিষ্ঠুর এই মানুষেরা। বোঝাই যাচ্ছে এখানকার মানুষেরা এরকম দৃশ্য দেখতে অভ্যস্ত।
শাস্তি শেষ। ভোর হয়ে এল। সর্দার নিজের বড় ঘরটায় ঢুকে পড়ল। লোকজন নিজেদের ঘরে ফিরে গেল।
সেদিন দুপুরে দু’জন যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের খাবার দিতে এল। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে বলল–আমি খাব না। যোদ্ধা দু’জন অবাক। বার বার খাবারের পাতা এগিয়ে দিল। ফ্রান্সিস সরিয়ে দিল। শাঙ্কো আর সিনাত্রাও মাথা নেড়ে খেতে অস্বীকার করল। যোদ্ধারা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। ওরা খাবার নিয়ে ফিরে গেল। বোধহয় সর্দারকে গিয়ে সেকথা বলল।
কিছু পরে সর্দার এল। হাত নেড়ে বলল–খাও। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল। সর্দার কিছুক্ষণ চাপাচাপি করল। তারপর আর কিছু না বলে চলে গেল। তারপর থেকে ফ্রান্সিস একটি কথাও বলল না।
রাত হল। শাঙ্কো ডাকল ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস ওর দিকে ফিরে তাকাল।
–রাতেও খাবে না। শাঙ্কো জানতে চাইল।
রাতে খাব। পালাতে গেলে উপবাসী পেটে থাকা চলবে না।
